farukinewsসুপ্রিম কোর্ট জামে মসজিদের খতিব ও টেলিভিশনের উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী খুনের ঘটনায় পুলিশ গতকাল পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। শনাক্ত করা যায়নি ঘাতকদের। অপরদিকে একটি সূত্র দাবি করেছে, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয় কাওরান বাজার এলাকায়। কাওরান বাজারের একটি ভবনে হত্যার ব্যাপারে বৈঠক হয়েছিল বলে ঐ সূত্রটি দাবি করেছে। সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় হত্যাকাণ্ডের সাত দিন আগে। ঐ বৈঠকে ফারুকীকে ‘বেদাত’ আখ্যা দিয়ে তাকে প্রতিরোধের আহ্বান জানানো হয় এবং বলা হয় সবাই এক সঙ্গে থাকলে ফারুকীকে পা দিয়ে পিষে মেরে হত্যা করা যাবে। ফারুকী হত্যার পর আটক তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। মামলার তদন্তভার শেরেবাংলা নগর থানা থেকে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) দফতরে ন্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে সারাদেশে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।

গতকাল শুক্রবার বাদ জুম্মা জাতীয় ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে ফারুকীর লাশ দাফনের জন্য তার গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।

মামলার তদারকি কর্মকর্তা তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। তবে বলার মত কোন অগ্রগতি হয়নি। ঘটনায় আটক তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, চারটি কারণকে মাথায় রেখে তদন্ত চলছে। ফারুকীর ধর্মীয় মতাদর্শ নিয়ে বিরোধিতা, পারিবারিক সমস্যা, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও হজ্বে লোক পাঠানো নিয়ে কোন বিরোধ ছিল কী না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে হত্যাকাণ্ডের ধরন দেখে ধারণা করা হচ্ছে, গোপীবাগে সিক্স হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তারাই এ ঘটনা ঘটাতে পারে।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ উপ-কমিশনার শেখ নাজমুল আলম বলেন, থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি পুলিশও ঘাতকদের শনাক্ত ও গ্রেফতার অভিযানে কাজ করছে।

র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, পুলিশের পাশাপাশি র্যাবও তার নিজস্ব নেটওয়ার্ট অনুযায়ী তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তবে গতকাল পর্যন্ত খুনীদের ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

রহস্যময়ী নারী

নিহত ফারুকীর ছেলে ফয়সাল ফারুকী জানান, ঘটনার দিন বিকালে ভক্ত পরিচয়ে মধ্য বয়সী এক নারী বাসায় এসেছিল। ধারণা করা হচ্ছে খুনীদের সঙ্গে  ঐ নারীর যোগাযোগ থাকতে পারে।  ঐ নারী বাসায় ঢুকে মওলানা ফারুকীর কাছে কাজ চায়। মাওলানা ফারুকী ঐ নারীর কথা শুনে তাকে তার স্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দেন। কিছু সময় পর ঐ নারী বাসার ঘরগুলো ঘুরে দেখে বেরিয়ে যায়। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ঐ নারী বোরখা পরে বের হয়। ফারুকীর এক নাতি ঐ নারীকে বাড়ির সামনে গুলিস্তান যাওয়ার কথা বলে একটি রিকশায় উঠিয়ে দেয়। তিনি আরো জানান, ঐ নারী বাসা থেকে বের হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ৬/৭ জন যুবক বাসায় ঢুকে তার বাবাকে গলা কেটে হত্যা করে। সন্দেহের কারণ সম্পর্কে ফয়সাল জানান, সাধারণত বাসায় কোন ভক্ত এলে তারা ড্রইং রুমে বসেন। কিন্তু মহিলা কাউকে কিছু না বলে গোটা বাসা ঘুরে দেখেন। রহস্যময়ী নারি যাতায়াতের ব্যাপারে উপ-কমিশনার (ডিবি) শেখ নাজমুল আলম  বলেন, রহস্যময়ী নারী কী না এ ব্যাপারে পুলিশের কাছে কোন তথ্য নেই। তবে নিহতের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে সবগুলোই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শী মারুফের বর্ণনা : নুরুল ইসলাম ফারুকীকে গলা কেটে হত্যার ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী তার শ্যালকের ছেলে মারুফ হোসেনের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেছে পুলিশ। মারুফের এই জবানবন্দিকে সামনে রেখে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে। জবানবন্দিতে মারুফ বলেন, হত্যার আগে দুই যুবক আগেও ঐ বাসায় এসেছিল। সোমবার সন্ধ্যায় ঐ দুই যুবক বাসায় এসে ফারুকীর সঙ্গে দেখা করেন। এই দুই যুবকের বয়স আনুমানিক ২৫ বছর। পরনে ছিল জিন্স প্যান্ট ও টি-শার্ট। তাদের মধ্যে একজনের গায়ের রঙ ফর্সা। তার চোখে কালো চশমা ছিল। এ সময় তারা জানায়, তাদের ভাইসহ আত্মীয়রা হজ্বে যাবেন। আরেকটি হজ্ব এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়ার কথা ছিল। বুধবার সন্ধ্যায় ঐ দুই যুবক আবার ফারুকীর অফিসে আসে। এ সময় ফারুকী তার ড্রইংরুমে বসেছিলেন। তিনি হজ্বে গমনেচ্ছুদের নিয়ে আসার কথা বলেন। জবাবে যুবকরা জানায়, তারা যানজটে আটকে পড়েছে। কিছু সময়ের মধ্যেই চলে আসবে। এভাবে প্রায় ১৫ মিনিট সময় কেটে যায়। তারপর দরজায় কড়াঘাতের শব্দ পেয়ে মারুফ দরজা খুলে দেন। ৬/৭ জন যুবক দেখে ভেতরে থাকা ঐ দুই যুবক জানায়, এরা তাদের লোক। তারা ঘরের ভিতরে ঢুকে চেয়ার ও বিছানায় বসে। এই যুবকদের পরনে প্যান্ট-শার্ট বা টি-শার্ট ছিল। তাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। এদের মধ্যে বসার জায়গা না পেয়ে একজন ছিল দাঁড়িয়ে। এসময় ফারুকী একটি চেয়ার আনার জন্য মারুফকে বলেন। মারুফ পাশের ঘর থেকে চেয়ার এনে দেখেন, যুবকদের একজন ফারুকীর গলায় চাপাতি ও অন্যজন তার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে রেখেছে। মারুফ ভয় পেয়ে চিত্কার করলে তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে ধমক দেয় তারা। এরপর বিছানার চাদর ছিঁড়ে তার ও ফারুকীর হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। এ সময় দরজায় আবারও কড়াঘাতের শব্দ পেয়ে দরজা খুলে দেয় যুবকদের একজন। তখন ফারুকীর তিন ভক্ত ভিতরে ঢুকলে তাদেরও হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। এর মধ্যে তারা একটি বেডরুমে থাকা ফারুকীর শাশুড়ি জয়গুন নেসা ও গৃহকর্মী শরীফাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। সেখানে ছিলেন ফারুকীর দ্বিতীয় স্ত্রী লুবনা কুলসুম ও ফারুকীর দুই নারী ভক্ত। তাদের সবাইকে ঐ কক্ষে হাত-পা বেঁধে জিম্মি করে রাখা হয়। এরপর ফারুকীকে পাশের খাবার ঘরে নিয়ে যায় তারা। দরজা বন্ধ করে দেয়ায় তারা তেমন কোনো শব্দ শুনতে পাননি। যুবকরা চলে যাওয়ার পর লুবনা নিজের হাতের বাঁধন খুলতে সক্ষম হন। পরে তিনি অন্য নারীদের বাঁধন খুলে দেন। এরপর ঘর থেকে বের হতেই খাবার ঘরে স্বামীকে গলা কাটা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে চিত্কার দেন।

ঈদগাহে জানাযার পর লাশ পঞ্চগড়ে : জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে শুক্রবার বাদ জুম্মায় নুরুল ইসলাম ফারুকীর চতুর্থ জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদের খতিব অধ্যাপক মাওলানা সালাহউদ্দিন আহমেদ। জানাযায় উপস্থিত ছিলেন প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন, হজ্ব এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’র (হাব) সভাপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম বাহার এবং নিহতের ছেলে আহমেদ রেজা ফারুকী, ফয়সাল ফারুকীসহ হাজার-হাজার ভক্ত ও শুভাকাঙ্খী। পরে ফারুকীর মরদেহ দাফনের জন্য গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। নিহতের ছেলে ফয়সাল ফারুকী জানান, শনিবার সকাল ১১টায় পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার নাওতারি গ্রামে আরেকটি জানাজার পর পারিবারিক কবরস্থানে মায়ের পাশে দাফন করা হবে। এদিকে, ঈদগাহ প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে লাশ নিয়ে যাওয়ার পর ইসলামী ফ্রন্টের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা কদম ফোয়ারা মোড়ে প্রায় ১৫ মিনিট সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এতে ঐ সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়ে যানজটের সৃষ্টি হয়।

হরতালের সমর্থনে মিছিল : ফারুকী হত্যার প্রতিবাদ, খুনিদের গ্রেফতার  ও রবিবার হরতালের সমর্থনে মিছিল করেছে ইসলামী ছাত্র সেনা। গতকাল শুক্রবার বাদ জুম্মা জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে থেকে মিছিলটি বের হয়। মিছিলটি বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে শুরু হয়ে পল্টন মোড় ও জাতীয় প্রেসক্লাব হয়ে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে শেষ হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, গাজীপুর, খাগড়াছড়ি, লক্ষ্মীপুর, পঞ্চগড়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছেন ফারুকীর সমর্থকরা।

এছাড়া চট্টগ্রাম, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর (বোদা পঞ্চগড়), হবিগঞ্জ, আটোয়ারী (পঞ্চগড়)সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও শাস্তি দাবি করা হয়।

রাজধানীর ১৭৪, পূর্ব রাজাবাজারের বাসার দোতলায় বুধবার রাতে চ্যালেন আইয়ের ইসলামিক অনুষ্ঠান ‘ হজ্ব কাফেলা’ ও‘ শান্তির পথে’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় নিহত ফারুকীর ছেলে ফয়সাল ফারুকী অজ্ঞাত আট-নয়জনকে আসামি করে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। মামলায় ফারুকীকে হত্যা করে বাসা থেকে ৬ লাখ ৩ হাজার টাকা লুট হওয়ার অভিযোগ আনা হয়।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here