52986764dbc4b-_PA_3863
সৈ্যদ কামরুল হাসানঃ জনতার নিউজ

খুব ভোরবেলা মা দরজা ধরে নাড়া দিলেন, বুঝতে বাকি ছিল না যে কোন খারাপ খবর পেয়েছে মা। দরজা খোলার পর মা বললেন বাবু ৪ টার সময় মারা গেছেন, মায়ের চোখের কোনে জল। ছোট ভাই রানার বন্ধু বাবু, ঢাকা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র। শাহবাগে গাড়িতে বোমায় অগ্নিদগ্ধ ১৯ জন হতবাগার একজন ছোটভাই বাবু। প্রায় দেখা করতে চাইতেন বাবু, মাঝে মাঝে বিরক্তও হতাম। আর বাবু কল দিয়ে বলবে না, ভাইয়া কোথায় আছেন, আপনাকে একটু জরুরী দরকার। খুব স্নেহ করতাম বাবুকে, কথা বেশি বলার জন্য মাঝে মাঝে বিরক্ত হতাম বটে। গাজীপুরের মনির সারাদেশের রাজনীতিবিদের বিবেকে লাথি মেরে যখন দুনিয়া ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তখন মনে হয়েছিল হয়ত বন্ধ হবে মরন মরন খেল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এই খেলা সহজে শেষ হবার নয়, জনতার কাতারে যারা দাঁড়ানো তাদের জীবনের মূল্য নেই। জনতার কাতারে দাঁড়ানো মানুষগুলোর জীবন হতে পারে আন্দোলন তীব্রতর হবার অন্যতম উপাদান। আন্দোলনের জন্য লাশ চাই, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লাশ চাই, তবে সেই লাশ হতে হবে সাধারণ মানুষের লাশ। গত কয়েকদিনে ইতিমধ্যে আগুনে পুড়ে মেরে ফেলা হয়েছে ১১ জনকে। প্রতিদিন ৫-১০ জন মানুষের জীবন দিতে হয় চলমান আন্দোলনকে গতিশীল করতে। শত শত লোকের ইতিমধ্যে অঙ্গহানী হয়েছে বোমার আঘাতে। রাজনৈতিক সন্ত্রাস এতটাই মাথাচাড়া দিয়েছে যে, যেকোনো সময় বিপন্ন হতে পারে যে কোন লোকের জীবন। ছোটভাই বাবুর বাবা গতকয়েক মাস আগে নিখোঁজ হয়ে যান, ঢাকার রাজপথে নিখোঁজ বাবাকে খুঁজে বেড়াতেন বাবু। মাঝে মাঝে কল দিয়ে জিজ্ঞাস করতেন কি করব ভাইয়া? অনেক চেষ্টা করার পরও কোন সন্ধান দিতে পারেনি প্রশাসন। বাবুর মুখে হতাশা ছিল, কিন্তু চোখে ছিল প্রত্যয়। আমাকে বলত বাবাকে খুঁজে বের করতেই হবে ভাইয়া, প্রয়জনে যা যা করা লাগে তাই করব আমি। বাবু আর খুঁজতে পারবে না তার নিখোঁজ বাবাকে, বাবু আজ আমাদের মাঝে নেই। আমাদের ফাঁসান হৃদয় হয়ত কাঁদবে না বাবুর জন্য, আমরা আলোচনার টেবিলে বাবুদের পরিণতির কথা কখনোই আনবনা, আমাদের জাতীয় নেতারা শুধু আলোচনা করবে ক্ষমতায় থাকার আর ক্ষমতায় যাওয়ার পন্থা নিয়ে। সকাল বেলা বাবুর চলে যাওয়ার কথা শুনে নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারলাম না। টি ভি পর্দায় চোখ রাখতে দেখি রেল নাশকতায় ৫ জন নিহত, আহত ৫০ জন। লম্বা হচ্ছে লাশের মিছিল, বিপন্ন আজকে মানবতা। আর কত মানুষের প্রান দরকার রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য, আর কতজনকে প্রান দিতে হবে সরকার পতনের জন্য? কতগুলো মানুষ আগুনে পুড়লে রাজনীতির জটিল সমীকরণ সরল হবে? জীবন্ত মানুষগুলোকে কাবাব বানিয়ে কার পেট পুরাতে চায় এই দেশের রাজনৈতিক নেতারা? যেই রাজনীতি মানুষের কল্যাণ দিতে পারছে না, যেই রাজনীতি মানুষকে পুড়িয়ে কাবাব বানাচ্ছে সেই রাজনীতির জন্য জনগণের কোন আগ্রহ আছে কিনা জানি না? একদিকে রাজপথে রাজনৈতিক সন্ত্রাস আর অন্যদিকে বসে বসে প্রতিবাদ। একদিকে মানুষকে পুড়িয়ে মারছে আর অন্যদিকে মারার প্রতিবাদ করছে। এই লোকদেখানো প্রতিবাদে মানুষের কি আসে যায়? হাতে হাতে বোমা, অস্র, গানপাউডার এই দায় কি সরকার এড়াতে পারবে? মানুষের নিরাপত্তা দিতে সন্ত্রাস দমনে কার্যকর পদক্ষেপ সরকারকেই নিতে হবে। কথায় নয় কাজের মাধ্যমে আমরা দেখতে চাই, রাজনীতির বলি সাধারণ জনগণ নয়। বাবু, মনির, নজরুল ভাইয়ের মত যারা আগুনে পুড়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন তাদের কাছে আমরা মাফ চাইতেও পারব না। বেঁছে থাকলে আবার লিখব, মরে গেলে মাফ করে দিবেন সবাই।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here