রোহিঙ্গাদের ঠকিয়ে রমরমা বাণিজ্য করছে কিছু দেশি-বিদেশি এনজিও। এর পাশাপাশি কিছু এনজিওর বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী প্রচারণা, জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে দ্বিতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া, রোহিঙ্গা শিশুদের বাংলা ভাষায় পাঠদানসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম করায় এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন গত ৪ জানুয়ারি এনজিওগুলোর ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম নিয়ে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক বরাবর এক প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন।

বেশ কয়েকটি এনজিওর নাম উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এনজিওগুলো কেবল আর্থিকভাবেই অনিয়ম করছে না, তারা এখতিয়ার বহির্ভূত কার্যক্রমও পরিচালনা করছে। দোষী এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছেন তিনি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছেও প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে ত্রাণ বিতরণে সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল, অগ্রযাত্রা বাংলাদেশ, কাতার চ্যারিটি, আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশন, সোশ্যাল এজেন্সি ফর ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট ইন বাংলাদেশ (ছওয়াব), প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, নেটওয়ার্ক ফর ইউনিভার্সেল সার্ভিসেস অ্যান্ড রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট (নুসরা), দুস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ইউনাইটেড সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্টের (ঊষা) বিরুদ্ধে অনিয়ম পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর মধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয় খোলাবাজার থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে ডাল কিনে প্যাকেটে ভরে রোহিঙ্গাদের দিয়ে প্রতি কেজি ডালের প্যাকেজিং খরচ দেখানো হচ্ছে ৯৩ টাকা! তদন্তদল হিসাব করে দেখেছে, এনজিওটি শুধু ডাল প্যাকেজিংয়ে বেশি খরচ দেখিয়ে ১৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ ছাড়া এনজিওটি জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই চাইল্ড রিক্রিয়েশন সেন্টার নির্মাণ করেছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের তিন হাজার টাকা দামের ডিগনিটি কিট্স (মেয়েদের পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য পরিচর্যার জন্য নানা উপাদান সম্বলিত প্যাকেট)  দেওয়ার কথা থাকলেও জেলা প্রশাসনের তদন্ত দল সরেজমিনে গিয়ে ৯০০ টাকার ডিগনিটি কিট্স পায়। এই অবস্থায় জেলা প্রশাসন থেকে ডিগনিটি কিট্স সরবরাহের ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক।

কাতারভিত্তিক এনজিও কাতার চ্যারিটির কথা উল্লেখ করা টেলিফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে নুসরা, দুস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ঊষা সম্পর্কে বলা হয়েছে, এরা এনজিও বিষয়ক ব্যুরো থেকে কোন ধরনের ত্রাণ সরবরাহের বরাদ্দপত্র পাচ্ছে বা কোন ধরনের ত্রাণ সরবরাহ করছে সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনকে কিছুই জানাচ্ছে না।

ছওয়াব নামের একটি এনজিওর ১১ লাখ টাকার ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার কথা। কিন্তু জেলা প্রশাসন থেকে সরেজমিনে গিয়ে সেখানে মাত্র চার লাখ টাকার ত্রাণসামগ্রী দেখা যায়। তখন চার লাখ টাকার ত্রাণ ছাড় করেনি জেলা প্রশাসন। পরে এনজিওটি বাকি সাত লাখ টাকার ত্রাণ নিয়ে আসে।

আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের নামে ১৮টি বরাদ্দপত্র পায় তদন্ত দল। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিওটির কার্যক্রম সম্পর্কে প্রথম দিকে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে তথ্য জানানো হতো। তবে কিছুদিন ধরে এনজিওটি তা আর জানাচ্ছে না। এ ছাড়া এনজিওটি মধ্যরাতে গ্যাস সিলিন্ডারের ট্রাক নিয়ে নিয়ম বহির্ভূতভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঢোকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক ৯টি এনজিওর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। সাতটি এনজিওর বিতর্কিত কার্যক্রমের প্রমাণ গোয়েন্দা নজরদারিতে পাওয়ার পর তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোতে আরো একটি সুপারিশ পাঠানো হয়। প্রতিবেদনে এসব এনজিও’র কার্যক্রমের বিষয়েও জানানো হয় ব্যুরোকে।

প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের হাকিমপাড়ায় রোহিঙ্গাদের মাঝে কাজ করে এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সার্ভিস (ইডিএএস) নামে একটি এনজিও। কিন্তু ওই এনজিওটি সেবার আড়ালে সরকারবিরোধী প্রচারণা এবং জামায়াত-শিবিরের প্রচারণা ও রোহিঙ্গা জঙ্গিদের সংগঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে তথ্য মিলেছে। পাশাপাশি সরকারি নির্দেশনা অমান্য করাসহ নানা অভিযোগে সেভ দ্য চিলড্রেন, মোয়াস (এমওএএস), এমডিএস, কোডাক (সিওডিইসি), এসআরপিবি, শেড’র কার্যক্রমের ওপরও নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন মনে করে এ নিয়ে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে ব্যুরোতে।

আরো জানা যায়, কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) মাধ্যমে তাদের কাজের সমন্বয় করার ব্যবস্থা থাকলেও খাদ্য, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন ও খাবার পানির ব্যাপারে যথাযথ জবাবদিহি করছে না কোনো এনজিও। অপরিকল্পিতভাবে অগভীর নলকূপ ও স্যানিটেশন স্থাপন হওয়ায় পরিবেশ দূষণ হচ্ছে মারাত্মকভাবে। এ কারণে সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবেরও শঙ্কা বেড়ে গেছে বহুগুণ। আবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) সমন্বয়ে কর্মরত এনজিওগুলো রোহিঙ্গাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার দিকে নজর না দিয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। অন্যদিকে মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও ইরান সরকার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হাসপাতাল তৈরি করছে, যার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসন অবহিত নয়।

প্রতিবেদন সূত্রে আরো জানা যায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কোনো ক্যাম্প নেই। ফলে ১০ লাখ রোহিঙ্গার নিরাপত্তা ও তাদের কার্যক্রম, গতিবিধি, চলাচল, নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা, তা সহজে জানার উপায় নেই।

এ বিষয়ে কক্সবাজার পুলিশ সুপার ড. এ কে এম ইকবাল হোসাইন বলেন, কিছু এনজিও বিতর্কিত কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এদের তদারকি দরকার। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতিক্রমে খুব দ্রুত সেখানে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হবে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, এনজিওগুলোর কার্যক্রমের ওপর প্রতিবেদন তৈরি করে ব্যুরোতে পাঠানো হয়েছে ৪ জানুয়ারি। প্রতিবেদনে সাতটি এনজিও’র কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। যেসব এনজিও বিতর্কিত কাজে জড়াবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here