newবাংলা ভাষা এবং এই ভাষাভাষীদের বৈষম্যের শিকার করতেই পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এ ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে চায়নি। এ জন্য তারা ষড়যন্ত্র শুরু করে এবং প্রথম আঘাত হানে শিক্ষাক্ষেত্রে। এ ষড়যন্ত্রের জবাবও দিতে শুরু করে বাংলার ছাত্র-আন্দোলনকারীরা। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রথম ছাত্রসভা এবং সরকারি অফিসে ধর্মঘট পালিত হয়।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে একই বছরের ১৪ নভেম্বর প্রাদেশিক সরকারের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত ঘটায় তমদ্দুন মজলিস। কিন্তু পরদিনই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সচিব গুড ইনের স্বাক্ষরিত একটি প্রজ্ঞাপন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। প্রজ্ঞাপনে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় নয়টি ভাষাসহ ৩১টি বিষয় থাকবে বলে জানানো হয়। কিন্তু এর মধ্যে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা ছিল না। এর তীব্র প্রতিবাদ জানান অধ্যাপক আবুল কাসেম। তাকে সমর্থন করে ৩০ ডিসেম্বর ইত্তেহাদ পত্রিকায় ‘অবিশ্বাস্য’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখেন পত্রিকাটির সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ। ২৭ নভেম্বর করাচিতে শুরু হওয়া পাকিস্তানের প্রথম শিক্ষা সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান উর্দুকে দেশের ‘লিংগুয়া ফ্রাংকা’ (সাধারণ ভাষা) করার প্রস্তাব করেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার ষড়যন্ত্র স্পষ্ট হয়ে উঠে। এর প্রতিবাদে ৪ ডিসেম্বর মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির কাছে হাজার হাজার লোকের স্বাক্ষর সম্বলিত স্মারকলিপি পেশ করে তমদ্দুন মজলিস। ৫ ডিসেম্বর অধ্যাপক আবুল কাসেমসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপক ও ছাত্র মিছিল নিয়ে পূর্ব-পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনের বাসভবনে যান। সেখানে তখন মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক চলছিল। ঐ বৈঠকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান তারা। সন্ধ্যায় আলোচনাশেষে প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সভাপতি মাওলানা আকরাম খাঁ ঘোষণা করেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ছাড়া অন্য কোন ভাষা চাপানোর চেষ্টা হলে পূর্ব-পাকিস্তান বিদ্রোহ ঘোষণা করবে এবং আমি সে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেব। (পূর্ব-পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলন ও তত্কালীন রাজনীতি; প্রথম খণ্ড; বদরুদ্দীন উমর; ঢাকা)।

৬ ডিসেম্বর ‘মর্নিং নিউজ’ পত্রিকায় শিক্ষা সম্মেলনের সংবাদ প্রকাশিত হয়। ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ সঞ্চারিত হয়। এ দিন দুপুরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলতলায় তত্কালীন ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (ঢাকা কলেজ), জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজসহ (জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) বিভিন্ন কলেজের ছাত্ররা প্রতিবাদ সভা করে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে এটিই প্রথম সাধারণ ছাত্রসভা। আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক এ কে এম আহসান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ভিপি ফরিদ আহমদ, আবদুর রহমান চৌধুরী, কল্যান দাসগুপ্ত, এস আহমদ প্রমুখ। সভাশেষে প্রায় তিন হাজার লোকের একটি মিছিল সেক্রেটারিয়েটের দিকে যায়। সেখানে কয়েকজন মন্ত্রী আন্দোলনকারীদের কথা শোনেন। পরে সেখান থেকে মিছিলটি মর্নিং নিউজ পত্রিকার সামনে যায় এবং ভাষা আন্দোলনের প্রশ্নে পত্রিকাটির ভূমিকার নিন্দা জানিয়ে স্লোগান দেয়। (ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস; বশির আল-হেলাল; বাংলা একাডেমী)।

১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ‘পূর্ব-পাকিস্তানের শিক্ষা সমস্যা’ শীর্ষক সভায় আকরাম খাঁ উর্দুর সাথে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে বক্তব্য রাখেন। এরই মধ্যে ১২ ডিসেম্বর এক দল লোক বাস ও ট্রাকে চড়ে উর্দুর পক্ষে স্লোগান দিতে দিতে মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের (বুয়েট) ছাত্রাবাসে হামলা চালায়। এর প্রতিবাদে মিছিল করেন বাংলা ভাষা আন্দোলনকারীরা। তারা শিক্ষামন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও করেন এবং পলাশী ব্যারাকের কাছে পথসভা করেন। দাবির মুখে শিক্ষামন্ত্রী মিছিলে শরীক হন এবং দাবি মেনে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে হামলার প্রতিবাদে ও অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৩ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের সকল সরকারি অফিসে ধর্মঘট পালিত হয়। স্বাধীন পাকিস্তানে সরকারি অফিসে এটিই প্রথম ধর্মঘট। ঐ দিন থেকে ১৫ দিনের জন্য ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে সরকার। এমনকি ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১৫ দিনের জন্য পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদ, অমৃত বাজার, যুগান্তর, আনন্দবাজারসহ ভাষা আন্দোলনের পক্ষের পত্রিকাগুলোকে পূর্ব-বাংলায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। (দৈনিক আজাদ; ১৩ ও ১৬ ডিসেম্বর; ১৯৪৭)।

সরকারি বাধা ও অপপ্রচারের মুখে আন্দোলনের এ পর্যায়ে এসে একে আরো দৃঢ় সাংগঠনিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন মজলিস সংগঠকরা। ৩০ ডিসেম্বর রশিদ বিল্ডিংয়ে তমদ্দুন মজলিসের সভায় ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে পৃথক একটি সংগঠন গড়ে তোলার প্রস্তাব করেন অধ্যাপক আবুল কাসেম। তার প্রস্তাব অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক নুরুল হক ভুঁইয়াকে সভাপতি করে ‘তমদ্দুন মজলিসের রাষ্ট্রভাষা সাব-কমিটি’ গঠিত হয়। পরবর্তীতে এটিই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নামে পরিচিত হয়।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here