আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে আগামী নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটকে পুনরায় বিজয়ী করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই দেশের উন্নয়ন হয়, মানুষ শান্তিতে থাকে। আর বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানেই সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ, দুর্নীতি, খুন ও নির্যাতনের রাজত্ব কায়েম। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় গেলে শুধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত নয়, দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যকর করার জন্য আরেকবার সুযোগ চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সুযোগ পেলে বিরোধীরা যতই চেষ্টা করুক, রায় কার্যকর করা হবেই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামীবার নির্বাচনে বিজয়ী হলে সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার করব। বিরোধীদলীয় নেত্রী যতই তাদের বাঁচাতে চেষ্টা করেন না কেন যে কোন মূল্যেই বিচার বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বাঁচাতে চেয়েছিলেন পারেননি। আমরা এর বিচার করেছি। একইভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে পারবেন না। যুদ্ধাপরাধীদের যাদের বিচারের রায় বেরিয়েছে তাদের রায় বাংলার মাটিতে কার্যকর হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার বিকেলে কুষ্টিয়া সরকারী কলেজ মাঠে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থেকে বিদ্যুত উৎপাদন বাড়াতে পারেনি বরং উৎপাদন কমিয়েছে। আর আওয়ামী লীগ জনগণের কথা ভাবে এবং জনগণের জন্য রাজনীতি করে বলেই দেশবাসীর স্বার্থে বর্তমান সরকার বিদ্যুত উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। তিনি বলেন, সাড়ে চার বছরে আমরা দেশে ৯ হাজার ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করেছি। এবার ভারত থেকে পাঁচ শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুত আমদানি করলাম। এ ছাড়াও বাগেরহাটের রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থারমাল পাওয়ার প্রকল্প ও ভেড়ামারায় নতুন আরও একটি ৩৬০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুত কেন্দ্রের ভিত্তিফলক স্থাপন করলাম। তিনি বলেন, ২০২১ সালে এদেশে বিদ্যুত উৎপাদন হবে ২০ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি।
এর আগে জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ‘বাংলাদেশ-ভারত বিদ্যুত সঞ্চালন কেন্দ্র’র নির্মিত বিশেষ হেলিপ্যাডে অবতরণ করে শনিবার সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে। হেলিপ্যাড থেকে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি চলে যান সাবস্টেশনের সুইচ রুম পরিদর্শনে। পরিদর্শন শেষে সকাল ১১টা ৩২ মিনিটে সেখান থেকে দিল্লীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর সঙ্গে যৌথভাবে ভিডিও কনফারেন্স করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রী প্রায় ৯ মিনিট শুভেচ্ছা বক্তব্য শেষে ভেড়ামারা টু বহরমপুর ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন ও সাবস্টেশন উদ্বোধন এবং বাগেরহাটের রামপাল ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এছাড়াও শেখ হাসিনা এখানে আরও একটি ৩৬০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুত কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
এরপর ভেড়ামারা থেকে প্রধানমন্ত্রী সড়ক পথে সোজা চলে যান কুষ্টিয়া সার্কিট হাউসে। সেখানে জোহরের নামাজ ও মধ্যাহ্ন বিরতি শেষে বিকেল সাড়ে ৩টায় তিনি যোগ দেন কুষ্টিয়া সরকারী কলেজ মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায়। এখানে তিনি জনসভায় বক্তৃতা ছাড়াও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য হোস্টেল নির্মাণ (৩৭ ইউনিট), কুষ্টিয়া জেলা সার্ভার স্টেশন ভবন, কুষ্টিয়া সরকারী মহিলা কলেজের চারতলা বিশিষ্ট একাডেমিক ভবন, কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন এবং কুমারখালী উপজেলায় সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার স্মৃতি মিউজিয়ামসহ কুষ্টিয়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উন্নয়নমূলক কাজের ৯টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও ১৩টিসহ মোট ২২টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
জনসভায় বিকেল চারটা ৯ মিনিটে প্রধান অতিথির বক্তব্য শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী। মোট ১৭ মিনিটের বক্তৃতায় শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাকে ক্ষমতায় দেখতে চান না বলে বিভিন্ন সভায় মিথ্যা কথা বলে বেড়াচ্ছেন। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট ওরাই গ্রেনেড হামলা করে আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। আল্লাহর রহমতে আমি বেঁচে গেলেও আইভি রহমানসহ অনেক নেতাকে ওরা হত্যা করেছে। ওরাই আমার বাবা, মা, ভাই, পরিবার-পরিজনকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। সেদিনটি আমি শোক পালন করলেও বেগম খালেদা জিয়া কেক কেটে নিজের জন্মদিন পালন করেন। যদিও সেদিনটি তাঁর জন্মদিন নয়। জিয়াউর রহমান জাতীয় নেতার খুনী রশিদকে এমপি বানিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। উপস্থিত জনতা ও দেশবাসীর প্রতি এসব অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, বিএনপি নেত্রী মিথ্যাবাদী। গত ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের সময় বিএনপি নেত্রী বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে মসজিদে আজানের বদলে উলুধ্বনি শোনা যাবে। তিনি উপস্থিত জনগণের প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেন, আপনারাই বলুন, মসজিদে আপনারা আজান শোনেন নাকি উলুধ্বনি শোনেন? দেশে কি মসজিদে আজান হচ্ছে না? মানুষ কি নামাজ পড়ছে না? তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উন্নয়ন করেছে। আর বিএনপি নেত্রী দলীয় ক্যাডার লেলিয়ে, জামায়াত-শিবির আর হেফাজতকে নিয়ে শত শত কোরান শরীফ পুড়িয়েছে। বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে শেখ হাসিনা আরও বলেন, তারা বঙ্গবন্ধুর খুনী ও একাত্তরে গণহত্যায় জড়িতদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা। তাই তারা ক্ষমতায় এলে জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ আবার ফিরে আসবে। বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে তারা এদেশের জনগণের ওপর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর মতো হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন চালিয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই দেশের জনগণ খাদ্য, আশ্রয়, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার সুযোগসহ উন্নয়ন পায়। অন্যদিকে বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে খাদ্য উৎপাদন কমে, মানুষের আয়ু কমে যায়। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পুনর্নির্বাচিত হলে দেশের প্রতি উপজেলায় একটি করে স্কুল ও কলেজ সরকারীকরণ করার প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী। জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি জুলফিকার আলী আরজুর সভাপতিত্বে বিশাল এ জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহাবুব-উল-আলম হানিফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য পূরণে মুক্তিযুদ্ধের বন্ধুদের সহায়তা কামনা করে বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া দেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় বন্ধ করতে সহায়ক হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছে। এ প্রক্রিয়া আমাদের নিজ নিজ ভূমিকা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের সুযোগ করে দিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করাতে তার দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারীদের চার দশকের বেশি সময় পরে বিচারের সম্মুখীন করা একটি খুবই কঠিন কাজ। তবে আমরা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ এবং এ কাজ শেষ করার জন্য আমরা আপনাদের সমর্থন চাই।
বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সরকার আমলের শিক্ষা ক্ষেত্রের অগ্রগতি উল্লেখ করে বলেন, নারী শিক্ষার জন্য ৪০ লাখ ছাত্রীকে উপবৃত্তি দিয়েছি এবং বিনা টাকায় বই দেয়ার ব্যবস্থা করেছি। গরিব ছাত্রদের জন্য উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এজন্য শিক্ষা ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২৬ হাজার ২শ’ স্কুল জাতীয়করণ করেছি। আগামীতে ক্ষমতায় এলে প্রত্যেক উপজেলাতে একটি স্কুল ও কলেজ জাতীয়করণ করা হবে। এজন্য তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। আমরা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছি, তার কারণ হচ্ছে বাংলাদেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে হলে আন্তর্জাতিক উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে ইসলাম রক্ষার নামে মদ-জুয়ার লাইসেন্স দিয়ে ইসলামের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করেছে। বঙ্গবন্ধু মদের লাইসেন্স বাতিল করে জেলায় জেলায় ইসলামী ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করেছিলেন।netri

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here