passportpassportচট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের সাতটিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন মহাজোটের প্রার্থীরা। ভোট ছাড়াই বিজয়ী হওয়ার এমন অভূতপূর্ব সুযোগ পেয়ে তাঁরা কতটা উচ্ছ্বসিত জানি না, কিন্তু এ অঞ্চলের ভোটাররা যে নির্বাচনী-উৎসবের উত্তাপবঞ্চিত হয়ে প্রচণ্ড হতাশ, তাতে সন্দেহ নেই। একদিকে এই হতাশা, অন্যদিকে এই জেলার কিছু কিছু অঞ্চলে জামায়াত-শিবিরের লাগামহীন তাণ্ডবের কারণে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। ভীতি-আতঙ্কে পর্যুদস্ত তাদের জীবন ও জীবিকা। অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির বিরাট পরিসংখ্যান না দিয়েই শুধু উল্লেখ করি, পর্যটকহীন কক্সবাজারে গত ২৭ দিনে ৩০০ হোটেলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৭ কোটি টাকা। কর্মচ্যুত হয়েছেন এসব হোটেলের অন্তত ছয় হাজার কর্মচারী। এই রাজনৈতিক ডামাডোলে কার কানে পৌঁছাবে এই ছয় হাজার পরিবারের অন্তত ২৪-২৫ হাজার সদস্যের অর্ধাহার-অনাহারের করুণ কাহিনি?
শুধু কক্সবাজার কেন, এই চিত্র আজ প্রায় সারা দেশের। মানুষ পুড়ছে, মানুষ মরছে, প্রতিদিন ভীতি-আতঙ্কে নিদ্রাহীন রাতযাপন করছে বহু মানুষ। দুটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কতটা তা বোঝার জন্য জরিপের প্রয়োজন হয় না, কিন্তু বিরোধের বলি হতে যাচ্ছে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে সংসারের বোঝা বহন করা সাধারণ মানুষকেই। জামায়াত-শিবির এই ক্ষমতার লড়াইয়ে নেই। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন হারিয়ে এ বিষয়ে তাদের আগ্রহ থাকার কথাও নয়। কিন্তু নাশকতার কাজে দলটিই সবচেয়ে সক্রিয়। গত নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী যে দুটি সংসদীয় আসনে নির্বাচিত হয়েছিল, তার দুটিই চট্টগ্রামে। মহেশখালী-কুতুবদিয়ায় তেমন সহিংস হয়ে ওঠেননি এ দলের নেতা-কর্মীরা। কিন্তু সাতকানিয়া ও আশপাশের এলাকায় তাঁরা সৃষ্টি করেছেন ত্রাসের রাজত্ব। কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর সাতকানিয়ায় দুই শতাধিক ফাঁকা গুলি এবং পাঁচ শতাধিক ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভীতি-আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছেন তাঁরা। পার্শ্ববর্তী বাঁশখালীতে খুলে নিয়েছেন তিনটি বেইলি সেতুর পাটাতন।
প্রশ্ন উঠতে পারে, মহেশখালী-উখিয়ার জামায়াত-অধ্যুষিত এলাকা তুলনামূলক শান্ত থাকলেও সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় এই তাণ্ডব কেন? উদ্দেশ্য একটাই, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কটিকে অচল করে রাখা, যাতে কক্সবাজারের বিরাট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে স্থবির করে দেওয়া যায়।
দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দেওয়া যে জামায়াত-শিবিরের পরিকল্পনার অংশ, তা বোঝা যায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক এবং সীতাকুণ্ডে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তাদের কর্মযজ্ঞ দেখলে।
আগেই বলেছি, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে পর্যটননগর কক্সবাজারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে দিয়েছে জামায়াত। একইভাবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সারা দেশের পণ্য আনা-নেওয়ার মধ্যে যে দেশের অর্থনীতির প্রাণ প্রবহমান, সেই প্রবাহটি রুদ্ধ করে দিতে চায় তারা।
সাতকানিয়ায় বারবার ব্যর্থ হয়েছে পুলিশের অভিযান। ধ্বংসাত্মক কাজের সঙ্গে গ্রামবাসীর বড় একটি অংশকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছে জামায়াত। সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে বলে গুজব ছড়িয়ে যেমন উত্তেজিত করা গেছে এই সরলবিশ্বাসী গ্রামবাসীকে, তেমনি জামায়াতের কর্মসূচিতে অংশ নিলে এমনকি ‘শাহাদত’ বরণ করলেও মিলবে ‘বেহেশতের পাসপোর্ট’, এমন আজগুবি ধারণাও দেওয়া হয়েছে এখানকার কিশোর-তরুণ থেকে শুরু করে বয়স্কদের মনেও। শিবিরের আস্তানাগুলোতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ বারবার বোমা তৈরির সরঞ্জাম যেমন পেয়েছে, তেমনি পেয়েছে কিছু বইপত্র।
সম্প্রতি ঢাকার কল্যাণপুরের একটি বাসা থেকে বোমা তৈরির কারিগর দুই ভাই খালিদ ও সাজিদকে গ্রেপ্তারের পর সেখানে পুলিশ পেয়েছে ‘পরকালের পাসপোর্ট’ নামের একটি বই। জনৈক মো. জিল্লুর রহমানের লেখা ৮০ পৃষ্ঠার এ বইয়ে ৩৬টি অধ্যায় রয়েছে। বইয়ের একটি অধ্যায়ের নাম ‘বেহেশতের ভিসা’। সেখানে বলা হয়েছে, যেকোনো দেশে ঢুকতে যেমন পাসপোর্ট-ভিসা প্রয়োজন, তেমনি বেহেশতে ঢুকতেও ভিসা ও অনুমতিপত্র প্রয়োজন। ভিসা বা অনুমতিপত্রের জন্য আগে থেকে প্রস্তুতি থাকতে হবে। কী ধরনের ‘প্রস্তুতি’ তা বুঝতেও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কল্যাণপুরের যে বাড়ি থেকে এ বই পাওয়া গেছে, সেই বাড়ি থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে ছয় কেজি গান পাউডার ও বোমা তৈরির ৬০ কেজি সরঞ্জাম। সুতরাং সাজিদ ও খালিদরা কীভাবে এবং কতভাবে প্ররোচিত হয়েছেন বা হচ্ছেন, তার একটি সূত্র যেন এখানে পাওয়া যায়। এ ধরনের বইয়ের বিষয়বস্তুকে ইসলাম আদৌ অনুমোদন করে কি না, তা ভেবে দেখার মতো অনুসন্ধিৎসাও এসব তরুণের মধ্যে আছে বলে মনে হয় না। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের জমিয়তুল ফালাহ মসজিদের খতিব অধ্যক্ষ আল্লামা মোহাম্মদ জালালউদ্দিন আল কাদেরী বলেছেন, ‘কোরআন শরিফ ও হাদিসের মধ্যে পরকালের পাসপোর্ট বা ভিসা নামের কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। ইসলামের ভিত্তি কোনো কাল্পনিক বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াসই ইসলামের ভিত্তি।’ নিজেদের স্বার্থে অপপ্রচার ও কুসংস্কারের বীজ বুনে জামায়াত-শিবিরসহ ধর্মান্ধ গোষ্ঠী প্ররোচিত করছে সরল ধর্মপ্রাণ মানুষকে।
আগেই বলেছি, ভোট ছাড়াই সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার ঘটনায় হতাশ এসব সংসদীয় এলাকার মানুষ। এসব হতাশা থেকে ক্ষোভের সঞ্চার হতেই পারে। কিন্তু শত শত মূল্যবান গাছ ‘অভূতপূর্ব নৈপুণ্যে’ কেটে ফেলা, খেটে খাওয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ট্রাকচালককে পুড়িয়ে মারা, এমনকি সাধারণ যাত্রী ও পথচারীদের জীবন বিপন্ন করার সঙ্গে সাধারণ বিক্ষুব্ধ মানুষের সম্পৃক্তি নেই।
সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে হামলা হয়েছে। আগুনে পুড়েছে ঘরবাড়ি-উপাসনালয়। এখনো এসব এলাকার নারী-পুরুষনির্বিশেষে কাটাচ্ছেন নির্ঘুম রাত। কার কাছে প্রতিকার চাইবে এই ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখানে ব্যর্থ। না সরকার, না বিরোধী দল কেউ আশ্বস্ত করতে পারছে না তাদের।
এই তো কিছুদিন আগে সীতাকুণ্ডে একজন ট্রাকচালকের কাছ থেকে ৩৭ হাজার টাকা কেড়ে নিয়ে তাঁর গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়েছেন জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। বার্ন ইউনিটে মৃত্যুপথযাত্রী সেই চালক সংবাদমাধ্যমের কাছে বলেছেন, তাঁর হাতে সঞ্চিত সব টাকা তুলে দিয়েও রেহাই পাননি তিনি। এটা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এই অঞ্চলটিতে বারবার এ রকম আক্রমণের শিকার হয়েছেন চালকেরা। দুর্বৃত্তদের হাতে পুড়েছে কোটি কোটি টাকার রপ্তানিযোগ্য পণ্য। গণছিনতাই, লুটপাট, এমনকি নারীদের শারীরিক লাঞ্ছিত করা পর্যন্ত হেন কোনো দুষ্কর্ম নেই, যা এখানে ঘটাননি তাঁরা। এসব দুষ্কর্মের সঙ্গে আন্দোলনের সম্পর্ক কতটুকু? সাধারণ মানুষের জান-মাল রক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকাই বা কী?
একদিকে আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে নানা ধরনের নাটক মঞ্চায়ন করে চলেছে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা। অন্যদিকে কর্মীদের নিয়ে মাঠে থাকার বদলে একের পর এক হরতাল-অবরোধ দিয়ে দায় সারছেন বিএনপির নেতারা। আওয়ামী লীগের আন্দোলনের সময় মতিয়া চৌধুরী, সোহেল তাজ, সাবের হোসেন চৌধুরী, আসাদুজ্জামান নূরকে দেখেছি রাজপথে পুলিশের লাঠির আঘাত মোকাবিলা করতে, এখন বিএনপির নেতাদের কেউ গ্রেপ্তার হচ্ছেন উত্তরার গোপন অবস্থান থেকে, কেউ বা চট্টগ্রামের বিমানবন্দর থেকে। নেতাদের এই রাজপথবিমুখতা কীভাবে সাহস জোগাবে কর্মীদের? রাজনৈতিক কর্মীদের হাত থেকে তাই আন্দোলন চলে যাচ্ছে পেশাদার সন্ত্রাসীদের হাতে। সাম্প্রতিককালে রাজনৈতিক সহিংসতায় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার দেখে এই ধারণার ভিত্তি পাওয়া যায়।
জামায়াতের কিছু নেতা এসব সন্ত্রাসীকে অর্থ জোগান দিচ্ছেন বলে সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন নগর পুলিশের উপকমিশনার এস এম তানভীর আরাফাত। অভিযোগ অস্বীকার করে নগর জামায়াতের প্রচার সম্পাদক মোহাম্মদ উল্লাহ বলেছেন, ‘জামায়াত-শিবির অস্ত্রের রাজনীতি করে না।’ কিন্তু গত ৩০ নভেম্বর অলংকার মোড়ে মুখে-মাথায় গামছা বাঁধা যে যুবকটি পুলিশের দিকে প্রকাশ্যে অস্ত্র তাক করেছেন, তাঁকে শিবির ক্যাডার ওয়াসিম বলে শনাক্ত করার পর তাঁর এই বক্তব্য কি ধোপে টেকে?
চট্টগ্রাম নগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল আলম বলেছেন, ‘রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অস্ত্রের প্রকাশ্য ব্যবহার শুরু হয়েছে। দুর্বৃত্তরা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছ থেকে একে-৪৭ রাইফেলও সংগ্রহ করেছে বলে আমরা জেনেছি। এ কারণে অস্ত্র ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠিন ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ আছে।’
এই নির্দেশ কতটা পালন হচ্ছে বা আদৌ পালনের সামর্থ্য এই মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আছে কি না জানি না। তবে সাধারণ মানুষ আশ্বস্ত হতে পারছে না। সরকার ও বিরোধী দল নিজেদের অবস্থানে অনড়। তাহলে যাদের হাতে ‘পরকালের পাসপোর্ট,’ তাদের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করবে কে?

বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here