জনতার নিউজ

মৌলভীবাজারে দুই আস্তানা থেকে গ্রেনেড ছুড়ছে জঙ্গিরা

সিলেটের শিববাড়ির জঙ্গি আস্তানার পর এবার মৌলভীবাজারে সন্ধান মিলেছে দু’টি জঙ্গি আস্তানার। যেখান থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর গ্রেনেড ছুড়েছে জঙ্গিরা। এ ঘটনার পরই কুমিল্লায় আরো একটি আস্তানার খোঁজ পাওয়া গেছে। ওই আস্তানাটিও ঘিরে রেখেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। কুমিল্লায় আজকের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর ওই আস্তানায় অভিযান শুরু করা হবে।

সর্বশেষ গতকাল সন্ধ্যায় মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের নাসিরপুরের আস্তানায় ‘অপারেশন হিট ব্যাক’ নামে অভিযান শুরু করেছে সোয়াত। অভিযান শেষ হলে মৌলভীবাজার পৌরসভার বড়হাটে অভিযান চালানো হবে। নাসিরপুর গ্রামে থাকা জঙ্গি আস্তানার কেয়ারটেকার (তত্ত্বাবধায়ক) জঙ্গিদের পরিচয় জানতে চাওয়ার পরই গ্রেনেড ছুড়ে মারে। লন্ডন প্রবাসী সাইফুর রহমানের বাড়ির কেয়ারটেকার জুয়েল মিয়া একথা জানিয়েছে। গত মঙ্গলবার রাত থেকেই বাড়ি দু’টি ঘিরে রেখেছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সদস্যরা। দুই জায়গাতেই থেমে থেমে বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ঢাকায় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দুটি বাড়িতে জন দশেক জঙ্গি থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। সোয়াত সদস্যরা ইতোমধ্যে মৌলভীবাজারে রওনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেছেন, প্রয়োজনে সেনাবাহিনীও সম্পৃক্ত হবে। অভিযান শেষ হওয়ার আগে কিছু বলা যাবে না।

বাড়ির কেয়ারটেকার জুয়েল বলেন, আমার মালিকের আরেকটি বাড়ি পৌরসভার বড়হাট এলাকায়। গতকাল ভোররাতে ওই বাড়ির কেয়ারটেকার আমাকে ফোন করে জানায়, ওখানে নাকি জঙ্গি আছে। পুলিশ রেড দিয়েছে। এই বাড়ির ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে ওই বাড়ির ভাড়াটিয়াদের যোগাযোগ ছিল। পরে রাতেই পুলিশ এখানে আসে। পুলিশ আমাকে দিয়ে ভাড়াটিয়াদের দরজায় নক করায়। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করি, আপনারা কি জঙ্গি? একথা শুনেই তারা দরজা বন্ধ করে দেয়। এরপর জানালা দিয়ে গ্রেনেড ছুড়ে মারে।

অপর বাড়িটির অবস্থান সদর উপজেলার সরকার বাজার নাসিরপুর গ্রামে। বাড়ি দু’টির মালিক সাইফুর রহমানের শ্যালক মীজানুর রহমানকে (৪০) গ্রেফতার করা হয়েছে। গতকাল বুধবার দুটি বাড়ি ঘেরাও করার সময়ই মীজানুরকে গ্রেফতার করা হয়। লন্ডনপ্রবাসী সাইফুর রহমানের বন্ধু তোফায়েল ইসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তোফায়েল ইসলাম জানান, মীজানুর রহমান বড়হাটে সাইফুরের বাড়ির পাশে আরেকটি বাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন। তিনিও সাইফুরের দুটি বাড়ি দেখাশোনা করেন। বুধবার ভোররাতে পুলিশ বড়হাট ও নাসিরপুরে দুটি বাড়ি ঘেরাও করার সময়ই মীজানুরকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তোফায়েল আরো বলেন, বড়হাটের ওই বাড়িতে দুইটা ফ্লোরে তিনটা ফ্ল্যাট আছে। বড়হাটের এই বাড়িতে তিন-চার জনের মতো জঙ্গি রয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। মৌলভীবাজারের সহকারী পুলিশ সুপার রোকনুজ্জামান চৌধুরী এই তথ্য জানান।

মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন জানান, জঙ্গিদের প্রতিহত করতে এরই মধ্যে সব প্রয়োজনীয় কৌশল নেওয়া হয়েছে। ওই এলাকায় সাংবাদিকসহ সাধারণ মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এডিসি মো. সাইফুল ইসলাম জানান, নাসিরপুর গ্রামের জঙ্গি আস্তানা থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে তিনটি গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে। এই জঙ্গিরা নব্য জেএমবি’র সঙ্গে যুক্ত বলেও ধারণা করা হচ্ছে। নাসিরপুর গ্রামের গ্যাস ও বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। জঙ্গি আস্তানার আশেপাশের এলাকা থেকে লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে পুলিশ মাইকিং করছে। এরই মধ্যে ওই বাড়ির এক কিলোমিটার এলাকার মধ্যে থাকা লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সিলেটের ডিআইজি কামরুল আহসান বলেন, অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।

জঙ্গি আস্তানা এলাকায় ১৪৪ ধারা : মৌলভীবাজারের যে দুটি বাড়ি ঘিরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে, সেই দুই এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তার স্বার্থে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক জানান, বড়হাটের বাড়ি ঘিরে পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড ও কুসুমবাগ এলাকা এবং খলিলপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আশপাশের দুই কিলোমিটার এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। অর্থাত্ এসব এলাকায় যানবাহন চলাচল করতে পারবে না, জনসাধারণের চলাচলও নিয়ন্ত্রিত থাকবে। তবে বড়হাটের ওই এলাকা সংলগ্ন ঢাকা-মৌলভীবাজার মহাসড়কে যান চলাচলে  কোনো সমস্যা নেই।

মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র ফজলুর রহমান বড়হাট আবুশাহ দাখিল মাদ্রাসা গলিতে থাকা জঙ্গি আস্তানা এলাকা পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের বলেন, জঙ্গিদের কীভাবে নির্মূল করা যায়, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আলোচনা করে তা ঠিক করবেন। দুটি বাড়ির মধ্যে দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার।

মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহ জালাল বলেন, নাসিরপুরের জঙ্গি আস্তানা থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে। নাসিরপুরের জঙ্গি আস্তানার কাছ থেকে থেমে থেমে গুলির শব্দ শুনতে পাওয়ার তথ্য জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন।

বাড়ির কেয়ারটেকার জুয়েলের ভাষ্য, নাসিরপুরের ঘরে গত জানুয়ারিতে বর্তমান ভাড়াটেরা ওঠেন। ভাড়াটে তার নাম বলেছেন মাহফুজ, বাড়ি টাঙ্গাইল। তিনি নিজেকে একটি কোম্পানির ডিলার হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। সাত হাজার টাকায় ঘরটি ভাড়া দেওয়া হয়। ঘরে আট সদস্য থাকতেন। মৌলভীবাজার পৌরসভার বাড়ির ভাড়াটে সম্পর্কে জুয়েল বলেন, সেখানকার ভাড়াটে তার নাম বেলাল বলেছেন। তিনি নিজেকে একটি কোম্পানির ম্যানেজার পরিচয় দিয়েছেন। নাসিরপুরের স্থানীয় বাসিন্দা নান্নু মিয়া চৌধুরীর ভাষ্য, লন্ডনপ্রবাসী সাইফুর রহমান ভোরে তার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করেন। নাসিরপুরের বাড়িতে গিয়ে ভাড়াটেকে ডাকতে বলেন। নান্নু মিয়া বলেন, সাইফুর রহমানের ফোন পেয়ে তিনিসহ পাঁচ-ছয়জন ওই বাড়িতে যান। তাদের সঙ্গে পুলিশও ছিল। ভাড়াটের ঘরে গেলে ভেতর থেকে একজন দরজা খোলেন। পুলিশ দেখে তিনি সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ করে দেন। একটু পরে ঘরের ভেতরে হাতুড়ি পেটানোর মতো করে একটা শব্দ শোনা যায়।

নান্নু মিয়া বলেন, একটু পরে ওই বাড়ি থেকে বিকট শব্দ শোনা যায়। এই ঘটনার সময় ওই বাড়ি থেকে সাইফুর রহমানের মামাতো বোন ও রিকশাচালকের পরিবার সরে যায়। নাসিরপুরের আনকার মিয়া বলেন, ফজরের নামাজ আদায় করতে ভোররাতে ঘুম থেকে ওঠেন তিনি। তখন থেকে থেমে থেমে বেশ কয়েকবার গুলির শব্দ শুনেছেন। এ ছাড়াও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন কয়েকজন।

কুমিল্লায় আরেকটি আস্তানা : মৌলভীবাজারে অভিযানের মধ্যেই কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায় আরো এক বাড়ি জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে ঘিরে ফেলেছে পুলিশ। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগের দিন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির মধ্যেই এই জঙ্গি আস্তানার খবর এল। কুমিল্লার এসপি শাহ মো. আবিদ হোসেন জানান, বুধবার দুপুরে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সদস্যরা কোটবাড়ীর দক্ষিণ বাগমারা বড় কবরস্থানের পাশে তিনতলা ওই বাড়ি ঘিরে ফেলেন। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা বলেন, সামপ্রতিক বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে পাওয়া তথ্যেই তারা কুমিল্লার ওই বাড়ির সন্ধান পান। কোটবাড়ী এলাকাটি কুমিল্লা শহরের এক প্রান্তে হলেও দেলোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তির মালিকানাধীন ওই বাড়ি সিটি করপোরেশনের ভেতরেই পড়েছে। পাশেই গন্ধমতী হাই স্কুল আজ সিটি নির্বাচনের একটি কেন্দ্র।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার বলেন, ওই বাড়িতে কয়েকজন জঙ্গি আছে এবং তাদের কাছে বোমা থাকতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি। কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল মোমেন বলেন, আমরা এখনো ওই বাসায় ঢোকার চেষ্টা করিনি। গোলাগুলির কোনো ঘটনা এখনো ঘটেনি। তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পরই ওই আস্তানায় অভিযান চালাবে পুলিশ।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here