mobileমোবাইল ফোনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না? কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না অপরাধীদের। শেষমেষ এবার জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভার ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হচ্ছে মোবাইল অপারেটরদের। যাতে মোবাইল ফোন অপারেটরই গ্রহকের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে সিম কার্ডটি চালু করতে পারে। শুধু সিমকার্ড রেজিস্ট্রেশনে বাধ্যবাধকতাই নয়, মোবাইল সেটের ব্যাপারেও কঠোর নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সংঘটিত বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত, হ্যান্ডসেট চুরি বা ছিনতাই রোধ এবং নকল হ্যান্ডসেট বিক্রি বন্ধে চালু হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল স্টেশন ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি (আইএমইআই) নম্বর শনাক্তকরণ ব্যবস্থা। আইএমইআই নম্বর নিবন্ধন ও এটি শনাক্ত করতে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থার খসড়া নির্দেশনাও সম্প্রতি তৈরি করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। আগামী মার্চে জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভারে প্রবেশের সুযোগের পর এই নির্দেশনা জারি করার প্রস্তুতি চলছে।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান সুনিল কান্তি বোস সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভারের সঙ্গে মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংযুক্ত করতে পারলে ভুয়া নামে রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ থাকবে না। এতে অপরাধ কমে আসবে। অপরাধীদের শনাক্ত করতে সুবিধা হবে। অনেক আলোচনার পর আগামী মাসেই জাতীয় পরিচয় পত্রের সার্ভার ব্যবহারের সুযোগ পাবে অপারেটররা। এতে আরো একটি লাভ আছে। তা হল- বাংলাদেশে দৈনিক গড়ে বিদেশ থেকে সাড়ে চার কোটি মিনিট বৈধ কল আসছে। অবৈধ কলের সংখ্যা কমানো গেলে বৈধ কলের সংখ্যা দৈনিক আট কোটি মিনিটে উন্নীত করা সম্ভব। সিম নিবন্ধন নিশ্চিত করা গেলে অবশ্যই এই কল বাড়বে।

টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসি সূত্র জানায়, সমপ্রতি মোবাইল অপারেটরদের জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের সুযোগ দিতে নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করে মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসি। পরে নির্বাচন কমিশন অপারেটরদের কমিশনের সার্ভার ব্যবহারের অনুমতি দেয়। জানা গেছে, নতুন সংযোগ নেয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি দেয়ার পর তা পরীক্ষা করার সুযোগ না থাকায় অনেকে ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করছেন। এ ছাড়া প্রতিদিন বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর ব্যবহার করে অবৈধ কলের সংখ্যাও বাড়ছে। এসব সমস্যা এড়াতে অপারেটররা অনেক দিন ধরে পরিচয়পত্র যাচাই করার সুবিধা চেয়ে বিটিআরসির কাছে আবেদন জানিয়ে আসছিল।

মোবাইল ফোন অপারেটর রবি’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহমুদুর রহমান বলেন, আমরা অনেক দিন থেকেই গ্রাহকের দেয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য নিশ্চিত হওয়ার জন্য এর সার্ভার ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে আসছি। এতদিন গ্রাহক যে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়েছে আমরা অন্ধের মতো তা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছি। কারণ আমাদের সামনে তথ্য যাচাইয়ের কোন সুযোগ ছিল না। এখন সুযোগ পেলে অবশ্যই সিম রেজিস্ট্রেশনে আমরা কঠোর হতে পারব। তিনিও বিশ্বাস করেন, এটা হলে দেশের মোবাইল ফোনের অপারাধ অনেক কমে যাবে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলে ওই ডাটাবেসের মূল সার্ভার স্থাপন করা হবে। বিটিআরসি এটি মনিটরিং করবে। অপারেটররা অনলাইনে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ভাণ্ডারে প্রবেশ করে গ্রাহকের পরিচয় ও তথ্য নিশ্চিত হয়ে সিম চালু করার ব্যবস্থা নিতে পারবে। তথ্য ভাণ্ডার ব্যবহারের জন্য অপারেটরদের ফি দিতে হবে বলে জানান বিটিআরসির একজন কর্মকর্তা। এর আগে বিটিআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী ২০১২ সালের ১২ অক্টোবর থেকে দেশে ‘প্রি-অ্যাকটিভ সিম’ (আগে থেকে চালু) বিক্রি বন্ধ থাকার কথা। নির্দেশনায় বলা আছে, গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিত করেই অপারেটররা সংযোগ (রিম/সিম) সচল করবে। সিম নেয়ার সময় জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি কিংবা ছবিসহ পরিচয়পত্র জমা দেয়ার নির্দেশনাও আছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিটিআরসির এই নির্দেশনা মোটেও মানা হয় না। পাড়া-মহল্লার দোকানে, এমনকি ফুটপাতেও বিভিন্ন অপারেটরের সিম পাওয়া যায়। কোথাও কোথাও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি জমা নেয়া হলেও অনেক দোকানেই তার প্রয়োজন হয় না। অন্যদিকে, জমা দেয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও সন্দেহ থাকে। অনেকেই নকল জাতীয় পরিচয়পত্র বা নথি জমা দিয়ে সিম তুলে নেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিক্রেতা জাল কাগজপত্র বানিয়ে নেয়। এসব সংযোগ চাঁদাবাজি, হুমকি, সন্ত্রাসী এবং রাষ্ট্রবিরোধী কাজে ব্যবহার হলেও তা অনুসন্ধান করে অপরাধীকে চিহ্নিত করা যায় না। পরিচয়পত্রের ডাটাবেস ব্যবহারের সুযোগ পেলে গ্রাহকের জমা দেয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যতা যাচাই করে তার সিম সচল করতে পারবে মোবাইল অপারেটর।

এদিকে বিটিআরসির খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি মোবাইল ফোন অপারেটরকেই এনইআইআর স্থাপন করতে হবে। এজন্য তাদের ফ্রড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফএমএস) স্থাপন করতে হবে। চূড়ান্ত নির্দেশনা প্রকাশের এক বছরের মধ্যে এনইআইআর ও এফএমএস বাস্তবায়ন করতে হবে অপারেটরদের। এরপর বাস্তবায়ন করতে হবে জেনুইন আইএমইআই ইমপ্লান্ট প্রোগ্রাম (জিআইপি)। এসব কার্যক্রম শেষ হলে নকল মোবাইল সেট বন্ধ করার কাজ শুরু করবে অপারেটররা।

প্রতিটি মোবাইল ফোন সেটে ১৫ সংখ্যার একটি অনন্য নম্বর থাকে, যা আইএমইআই নামে পরিচিত। মোবাইল সেট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নাম, মডেল ও ক্রমিকের সমন্বয়ে গঠন করা হয় আইএমইআই নম্বর। ব্র্যান্ডেড সেটের ক্ষেত্রে এটি মানা হলেও নন-ব্র্যান্ডেড সেটে ভুয়া আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করা হয়। বিটিআরসির এক হিসেব মতে, দেশের বাজারে যেসব সেট পাওয়া যায়, তার এক-তৃতীয়াংশই নকল। এসব সেটে আইএমইআই নম্বর থাকে না বা থাকলেও ভুয়া নম্বর ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে আইএমইআই নম্বর নিবন্ধনের ব্যবস্থা না থাকায় চুরি হওয়া সেটের প্রকৃত মালিক শনাক্ত ও উদ্ধার অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। এছাড়া আইএমইআই নম্বরবিহীন নকল হ্যান্ডসেট ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনারও অভিযোগ রয়েছে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here