newভারতের সরকার পরিবর্তন এবং সুষমা স্বরাজের সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরের পর বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। সবার প্রশ্ন, এবার সত্যিই কী হতে যাচ্ছে এ চুক্তি!

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যেহেতু ভারতের নবগঠিত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ নিজে থেকে এ বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন ফলে দু’দেশের সরকার প্রধানদের সফরের সময় এ তিস্তা চুক্তি হওয়ার একটা সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে।

ভারতে বিজেপি সরকার গঠনের পর সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশ সফরে এসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে আলোচনায় জানান, অভিন্ন তিস্তার পানি চুক্তি নিয়ে ভারত অভ্যন্তরীণ সমঝোতা তৈরির চেষ্টা করছে। বিজেপি সরকারের বাংলাদেশের মানুষের বহুল প্রত্যাশিত এ বিষয়টি সমাধানের আগ্রহ দেখানোয় মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে, সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশ সফরে আসার আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে ফোনে আলাপ করে এসেছিলেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। মমতার সঙ্গে আলাপ করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন তিস্তা চুক্তির বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন তখন ধারণা করা হচ্ছে, মমতাও চুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক হবেন।

সূত্র জানায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময় এ চুক্তি সম্পাদন হবে। দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী নয়াদিল্লীতে যৌথ পরামর্শক কমিশনের (জেসিসি) বৈঠকে অংশ নেবেন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এছাড়া সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকের সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। এরপর এবছরের অক্টোবর থেকে ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ সফরে আসবেন- এ লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন ঢাকা ও দিল্লীর কর্মকর্তারা। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরে এ চুক্তি হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী বাংলাদেশ।

শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীতে পানি না থাকায় প্রতিবছর বাংলাদেশে কৃষিকাজ ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এবছর শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি প্রবাহ একেবারে তলানিতে ঠেকে। এরফলে ব্যাপকভাবে কৃষিকাজ ব্যাহত হয়। ফলে কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি প্রতিটি নাগরিকের একান্ত দাবি হয়ে দেখা দিয়েছে।

এর আগে, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তা চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মূহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতার কারণে এ চুক্তি পিছিয়ে গিয়েছিল। এরপর আর আলোর মুখ দেখেনি এ পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টি। সুষমা স্বরাজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণপত্র দিয়েছেন। সেই আমন্ত্রণপত্রে নরেন্দ্র মোদী দ্বিপাক্ষিক আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক আরো এগিয়ে নিতে ঘন ঘন সাক্ষাতের প্রত্যাশা করেছেন।

তিস্তা চুক্তি প্রসঙ্গে আলোচনায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. জাফর আহমেদ খান বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ স্পষ্ট করেই তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির কথা জানিয়েছেন। এটা আমাদের আশাবাদী করেছে। দুই দেশের সরকার প্রধানদের সফরের সময়ে এ চুক্তি হওয়ার ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।

এদিকে, যৌথ নদী কমিশনের সদস্য মীর সাজ্জাদ হোসেন জানান, তিস্তা চুক্তির বিষয়ে সচিব পর্যায়ে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে। এখন শুধু দুই দেশের রাজনৈতিক সমঝোতা হলেই এ চুক্তি হতে কোন বাধা নেই।

সমতা, নদী অববাহিকার দৈর্ঘ্য এবং জনসম্পৃক্ততার ভিত্তিতে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চূড়ান্ত হয়েছিল। এতে প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল তিস্তা নদী অববাহিকায় মানুষের বসবাস ও নদীকেন্দি ক কৃষিনির্ভরতা। হিস্যার উভয় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নির্ধারিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে, তিস্তা নদী প্রবাহের জন্য ২০ ভাগ পানি রেখে পানির হিস্যা বাকি প্রবাহের ৪৮ ভাগ বাংলাদেশ ও ৫২ ভাগ ভারত নেয়ার একটি প্রস্তাবনা রয়েছে। তবে বাংলাদেশ সবসময় সমান সমান পানির হিস্যার বিষয়ে ভারতের কাছে দাবি জানিয়ে এসেছে। প্রথমে ১৫ বছর মেয়াদী অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি হওয়ার প্রস্তাবনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে পানি প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সম্পাদন করা হবে।

২০১১ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তা চুক্তির বিষয়ে দুই দেশ একটি ‘ফাইন টিউনিং’ এ এসে পৌঁছায়। এর আগে ২০১০ সালের জানুয়ারি ও মার্চে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীতে যৌথ নদী কমিশনের সচিব পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে ঐকমত্যের সৃষ্টি হয়। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠকেও তিস্তার চুক্তির বিষয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে একমত পোষণ করা হয়; কিন্তু শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে যায় চুক্তি।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে মনমোহন সিং বাংলাদেশে আসার আগেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তা চুক্তির খসড়া নিয়ে আপত্তি তুলে মনমোহনের সঙ্গে ঢাকা সফরে না আসার সিদ্ধান্ত নেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার বাংলাদেশ ও ভারতের পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে পানির হিস্যার পরিমাণে আপত্তি জানায়। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের সমর্থন ছাড়া ভারতের কেন্দ ীয় সরকার এ চুক্তি করতে সম্মত নয়। সে কারণে শেষ মুহূর্তে তারা এ চুক্তিতে সই করা থেকে পিছিয়ে যায়।

তিস্তা চুক্তি না হওয়ার কারণে এবং শুষ্ক মৌসুমে ভারতের একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের কারণে প্রতিবছর দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে শুকনো মৌসুমে সেচের পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। পানির অভাবে বাংলাদেশের তিস্তা সেচ প্রকল্প বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

৩১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও খরস্রোতা তিস্তা নদী ভারতের সিকিম ও পশ্চিম বঙ্গের দার্জিলিং-জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশের লালমনিরহাট দিয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারীতে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্রে মিলিত হয়েছে। বাংলাদেশে এর দৈর্ঘ্য ১১৫ কিলোমিটার। ফলে এটি শুধু স্বাধীন একটি নদীমাত্র নয়, তিস্তা বাংলাদেশেরও নদী এবং তা ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রবাহেরও অন্যতম উত্স। তিস্তার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া মানেই ভাটিতে বাংলাদেশের তিস্তার অপমৃত্যু এবং সেই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র তথা যমুনার প্রবাহ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। এই নদীর অস্তিত্বের সঙ্গে বিস্তীর্ণ এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ নির্ভরশীল। বর্তমানে তিস্তার অবস্থা দাঁড়িয়েছে একটি মরা খালের মতো। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি প্রবাহ নেমে আসে ৪০০ কিউসেকে। যেখানে ২০ হাজার কিউসেকের কম প্রবাহ হলে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষিকাজের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিস্তার উজানে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে গাজলডোবা নামক স্থানে তিস্তা নদীর উপর ভারত একটি ব্যারাজ নির্মাণ করায় নদীর প্রবাহ কমে যাচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের কৃষিকাজে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী থাকলেও শুধু গঙ্গা ছাড়া অন্য কোন নদীর পানি বণ্টনে দুই দেশের মধ্যে কোনো চুক্তি নেই। এখন তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির মডেল অনুসরণ করে অপরাপর অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন চুক্তি হবে। এর আগে বাংলাদেশ ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিস্তার পানিপ্রবাহে যে তথ্য পরস্পরকে হস্তান্তর করেছে সেটাকেই ভিত্তি ধরে চুক্তি সই করতে বলেছিল; কিন্তু তিস্তার উজানে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে গাজলডোবা নামক স্থানে তিস্তা নদীর উপর যথারীতি একটি ব্যারাজ ১৯৯০ সালে নির্মাণ সম্পন্ন করে। যা বৃহত্ একটি সেচ প্রকল্প হিসেবে কাজ করছে। ভারত তার অংশের তিস্তার পুরো অংশকে কাজে লাগিয়ে আগামী ১০ বছরের মধ্যে ৫০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের বিশাল প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় পানির বড় বড় রিজার্ভার গড়ে তোলা হচ্ছে এবং এগুলোর শক্তিশালী প্রবাহ থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা হবে। গাজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করার ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিনষ্ট হওয়ায় পানিপ্রবাহের ডাটা আর পরস্পরকে আদান-প্রদান করা হয়নি।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here