Naridiboshবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মাসের পর মাস সরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা চলছে স্বাধীনতাবিরোধীদের শিরোমণি যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা গোলাম আযমের। কিন্তু দেশের জন্য অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা নবম সেক্টরের নারী মুক্তিযোদ্ধা ক্যান্সারে আক্রান্ত আলমতাজ বেগম ছবিকে জরুরি কেমোথেরাপি দেওয়ার জন্য একটি সিট দিতে পারছে না ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তিন দিন ঘুরিয়েও কর্তৃপক্ষ প্রতিদিনই তাঁর কাগজে ‘দুঃখিত, বিছানা খালি নাই’ লেখা সিল মেরে ফিরিয়ে দিয়েছে। হাসপাতালে থাকার সুযোগ না পেয়ে এখন এই মুক্তিযোদ্ধা রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোডে একটি ঘিঞ্জি ঘরে অপেক্ষায় আছেন উপায় খুঁজে পাওয়ার। এর আগে গত জানুয়ারিতে এই নারী মুক্তিযোদ্ধা ওই হাসপাতালে এক দফা ক্যান্সারের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করিয়েছেন নিজের জমানো ও ধারদেনা করা প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ করে। বিছানাভাড়া, অস্ত্রোপচারের খরচ, ওষুধ-পথ্য সবই তাঁর জোটাতে হয়েছে নগদ টাকায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই মুক্তিযোদ্ধার জন্য দেয়নি বিনা মূল্যে কোনো সুবিধা। ওই দফায় চিকিৎসা খরচের জোগান দিতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে এখন পরবর্তী চিকিৎসা ব্যয় ও জীবন ধারণের জন্য হাত বাড়াতে হচ্ছে মানুষের কাছে।
দেশের জন্য লড়াইয়ে জয়ী হয়ে এখন জীবনের সঙ্গে লড়াই করতে এসে নিঃস্ব গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা আলমতাজ বেগম ছবি বিছানায় শুয়ে চোখের জল ফেলে  বলেন, ‘আমার চিকিৎসা কি বন্ধ হয়ে যাবে! সাহায্য না পেলে আমার চিকিৎসা তো আর চলবে না। এখন আমার কী করার আছে! হাসপাতালেও কোনো কিছুই ফ্রি নাই।’
একটু থেমে এই মুক্তিযোদ্ধা আবার বলেন, ‘সরকার তো দূরের কথা, কাউকেই তো আমি পাশে দেখছি না। এভাবেই কি আমি হেরে যাব?’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার একজন মুক্তিযোদ্ধা  বলেন, ‘মৃত্যুর পরে রাষ্ট্রীয় সম্মান দিয়ে কী হবে? জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করায় এখন অনেকে নেতা-নেত্রী-মন্ত্রী-এমপি হতে পারছেন। তাঁরা নিজেরা আইন করে নিজেদের সব কিছু ফ্রি করে রাখলেও আমাদের জন্য সামান্য চিকিৎসাটুকু আইন করে ফ্রি করতে পারছেন না। বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার পরে সম্মানের কোনো মানে হয় না।’
ওই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘ডাক্তার আমার হার্টে বাইপাস সার্জারির কথা বলেছেন। কিন্তু টাকার অভাবে তা করাতে পারছি না। অনেকের কাছে সাহায্য চেয়েছি। কেউ কেউ কিছু কিছু করে দিলেও প্রয়োজনীয় টাকা জোগাড় হচ্ছে না। একটি হাসপাতালে গেলাম, তারা ফিরিয়ে দিয়েছে।’ আলতাফ হোসেন নামের আরেক মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘প্রতি মাসে কিডনি ডায়ালিসিসের পেছনে টাকা দিতে দিতে এখন একরকম ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছি। মানুষের কাছ থেকে টাকা ভিক্ষা করে কোনো রকম চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সারা দেশে অনেক মুক্তিযোদ্ধা এখন নানা রোগে আক্রান্ত। অর্থকষ্টে ন্যূনতম চিকিৎসাটুকুও জুটছে না তাঁদের। সরকারি হাসপাতালে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিনা মূল্যে চিকিৎসার কথা বলা হলেও নানা জটিলতার মুখে কোথাও তাঁরা বিনা মূল্যে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন না। কোথাও কোথাও বিছানা, খাবার কিংবা কিছু ওষুধ ফ্রি পেলেও এ জন্য শিকার হতে হয় নানা ভোগান্তির। নানা জায়গায় ঘোরাঘুরি-ধরাধরি করে বহু আবেদন-নিবেদন করতে করতে রোগের অবস্থা আরো জটিল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে গিয়ে সম্মান বা বিনা মূল্যে চিকিৎসার সুযোগের পরিবর্তে নাজেহাল ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে বলে জানিয়েছেন অনেক ভুক্তভোগী।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের সর্বশেষ গেজেট অনুসারে মোট তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই লাখ পাঁচ হাজার ৪৮২। তবে এই তালিকা নিয়ে বির্তক থাকলেও মোট মুক্তিযোদ্ধার বেশির ভাগই যে বয়সের কারণে বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন, তা ওই মন্ত্রণালয়েরও নজরে আছে বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো তালিকা মন্ত্রণালয়ে নেই।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘সর্বশেষ জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে আমরা আশা করেছিলাম, মুক্তিযোদ্ধাদের বিনা মূল্যে সার্বিক চিকিৎসা বিষয়ে কোনো নির্দেশনা থাকবে। কিন্তু নীতিমালা হওয়ার পর এমন কিছু দেখলাম না। এ ছাড়া বাজেটেও সব মুক্তিযোদ্ধার জন্য বিনা মূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করার মতো কোনো বাজেট বরাদ্দও রাখা হয় না। কিন্তু এ বিষয়টি এখন খুবই জরুরি। কারণ মুক্তিযোদ্ধারা বয়সের কারণে নানা জটিলতায় ভুগে চিকিৎসার আশ্রয় নেবেন এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হয়ে পড়েছে বিশেষ সম্মানিত এই জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা রাষ্ট্রীয় খরচেই সম্পন্ন করার। বিশ্বের বহু দেশে এমন নজির রয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল আহাদ চৌধুরী আক্ষেপ করে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আমরা যতটা সরব বা সচেতন, মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা নিয়ে সে রকম উদ্যোগ দেখছি না। রাষ্ট্র ও সরকারের অনেক ব্যক্তি ও কর্মকর্তা সপরিবারে বিনা মূল্যে সব ধরনের চিকিৎসা সুবিধা ভোগ করতে পারেন, কিন্তু যাঁদের জন্য দেশ স্বাধীন হয়েছে সেই মুক্তিযোদ্ধারা আজ বিনা চিকিৎসায় অবহেলায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছেন- এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য আর কী হতে পারে!’
আব্দুল আহাদ চৌধুরী বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের বিনা মূল্যে চিকিৎসার জন্য এখন পর্যন্ত কোনো আইনও হয়নি। যদিও কিছুটা আশার কথা হলো- বর্তমান সরকার একটি আদেশ জারি করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের বিনা মূল্যে চিকিৎসার জন্য। কিন্তু তাও কতটা বাস্তবায়ন হচ্ছে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল মজিদ ভূঁইয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিনা মূল্যে চিকিৎসার সুযোগ সম্পর্কে  বলেন, ‘সরকারের তরফ থেকে আমরা একটি পরিপত্র পেয়েছি মুক্তিযোদ্ধাদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো আইন নেই। যার ফলে মুক্তিযোদ্ধারা সঠিক মাত্রায় ওই সরকারি আদেশের পরিপূর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কারণ হাসপাতালে চিকিৎসা বলতেই কেবল বিনা ভাড়ায় কেবিন বা বিছানা কিংবা খাওয়া নয়, প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসাই করা দরকার। কিন্তু কোনো হাসপাতালের পক্ষেই ব্যয়বহুল কোনো চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে দেওয়া সম্ভব নয়। হাসপাতালে না থাকা ওষুধ-সরঞ্জাম আমাদের পক্ষে কিভাবে জোগান দেওয়া সম্ভব?’
এসব ক্ষেত্রে ওই মুক্তিযোদ্ধার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কী করবে তা পরিষ্কার হয়নি, কিভাবে তাঁদের বিনা মূল্যে সব চিকিৎসা দেবে? তাই এ বিষয়ে অবশ্যই পরিষ্কার আইন-বিধি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’
মুক্তিযোদ্ধা আলমতাজ বেগম সম্পর্কে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ওই ঘটনাটি আমার নজরে নেই। আমার নজরে থাকলে অবশ্যই আমি আমার এখতিয়ারে থাকা বিছানা ভাড়া, কিছু ওষুধপথ্যসহ আরো কিছু বিনা মূল্যে দেওয়া যেত।’
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুলাহ আল সাফি মজুমদার  বলেন, ‘আগে থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের ফ্রি চিকিৎসা দেওয়ার জন্য সরকারি একটি নির্দেশনা রয়েছে। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য হাসপাতালের একটি পেয়িং বেড বরাদ্দ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা সরকারি কর্মকর্তা ও দুস্থ মানুষদের জন্য যেভাবে ফ্রি চিকিৎসা দিয়ে থাকি সেই আঙ্গিকেই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ব্যবস্থা করে থাকি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আলাদা করে পরিপূর্ণ ফ্রি চিকিৎসা দেওয়ার জন্য কোনো রকম সুস্পষ্ট বিধান আমরা পাইনি।’
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নেতা আহাদ চৌধুরী বলেন, ‘বয়সের কারণেই মুক্তিযোদ্ধারা দিনে দিনে এমনিতেই শেষ হতে চলেছে। আর কয়েক বছর পর আমরা এমনিতেই থাকব না। কিন্তু শেষ সময়ে কষ্টের মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। তাই আমরা চাই আইন করে মুক্তিযোদ্ধাদের সব ধরনের পরিপূর্ণ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হোক, যাতে করে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতাল মুক্তিযোদ্ধাদের ফ্রি চিকিৎসা দিতে বাধ্য হয়।’
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সূত্র জানায়, রাজধানীর মিরপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি হাসপাতাল প্রকল্প চালু হলেও তা এখন আর নেই। ওই ভবনটি এখন পরিত্যক্ত। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকারি খরচে চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা থাকলেও তা অন্যরা ভোগ করতে পারেন না।
এদিকে আইন না থাকায় কেবল সরকারি আদেশ অনেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই আমলে নেয় না বলে জানান মুক্তিযোদ্ধারা। নাম প্রকাশে একাধিক মুক্তিযোদ্ধা জানান, হাসপাতালে গিয়ে পরিচয়পত্র দেখালে অনেক চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্মানের পরিবর্তে অসম্মান করেন। ফ্রি চিকিৎসার কথা বললে নানাভাবে হয়রানি ও অপদস্থ করেন। এ ছাড়া কোনো হাসপাতালে স্বাধীনতাবিরোধী চেতনার কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকলে তারা তো স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করবে।
এমন পরিস্থিতির কথা স্বীকার করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক বলেন, ‘আমার হাসপাতাল সরকারি না হলেও মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে খারাপ আচরণ করায় ২৭ জন কর্মচারীকে শাস্তি দিয়েছি, তাদেরকে সাময়িক বরখাস্ত করেছি। তবু অনেক সময় আরো বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ পাই। আইন থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতি রোধ করা সহজ হবে।’
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এম নিয়াজউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের ফ্রি চিকিৎসার জন্য আমরা ইতিমধ্যেই একটি সার্কুলার জারি করেছি। এ ছাড়া তাঁদের ক্ষেত্রে সব ধরনের চিকিৎসা ফ্রি কিভাবে করা যায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। পাশাপাশি একটি আইন করার বিষয়ে প্রাথমিক উদ্যোগ চলছে।

 

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here