malaysianews

বিদেশের কারাগারে বন্দী জীবন, সাগরে ট্রলার ডুবিতে মৃত্যু, থাইল্যান্ডে দাস শ্রমিক হিসেবে বিক্রি ও নির্যাতন সত্ত্বেও সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রবণতা থামছে না। মূলত অস্বচ্ছল, বেকার মানুষগুলো পাচারকারী ও দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে, আবার অনেকেই ইচ্ছার বিরুদ্ধে অপহরণকারী চক্রের কবলে পড়ে মালয়েশিয়া যাচ্ছে। তবে মানব পাচারকারীরা সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাঠানোর চুক্তি করে টাকা নিলেও এসব মানুষের পৌঁছানোর কোনো নিশ্চয়তা নেই। এরই মধ্যে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে ট্রলার ডুবে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার কারাগারে বন্দী রয়েছে আরো কয়েক হাজার। নিখোঁজও রয়েছে অনেকে। তারপরও মানুষের যাওয়ার প্রবণতা কমছে না। সর্বশেষ গত সোমবার অবৈধভাবে মালয়েশিয়া পাচারের পথে গভীর সমুদ্রে ৬১৪ জনকে আটক করেছে নৌবাহিনী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে কর্মসংস্থানের অভাব এর অন্যতম কারণ। তবে অসচেতনতা, দালালের দৌরাত্ম্য জোরপূর্বক পাচার এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবহেলা এজন্য দায়ী।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাগরপথে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে সম্প্রতি থাইল্যান্ডের বন্দিশিবিরে মারা গেছেন কক্সবাজারের চকরিয়ার খুটাখালী ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়ার শুক্কুর আহমদ ড্রাইভারের ২৩ বছর বয়সী ছেলে পুতিয়া। তারই মত মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে একই ইউনিয়নের সেগুনবাগিচা এলাকার শাহ আলমের মেয়ে জামাই আবুল হাশেম গত ১৫ মাস ধরে নিখোঁজ। মালয়েশিয়া যাত্রা তাদের পরিবারের স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছে। স্বজন হারিয়ে পরিবারগুলো এখন অসহায়।

শুধু টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশেপাশের অন্তত পাঁচশ’ মানুষ নিখোঁজ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।  জীবন বদলে দেবার স্বপ্নে দালালের মাধ্যমে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে গত বছর চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী গ্রামের মাত্র একটি ওয়ার্ডের (৬নং ওয়ার্ড) ১৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তারা গত বছরের ২৫ আগস্ট সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলেন। সেইদিন থেকে এখনো খোঁজ মেলেনি হাশেম ড্রাইভারের ছেলে হামিদুল হকের, ইসলাম নুরের ছেলে রবিউল হাসানের, সুলতানের ছেলে জিয়াউর রহমানের, মোহাম্মদ ইসলামের ছেলে মনুর আলমের, বদরার ছেলে আনোয়ারের, লোকমান হাকিমের ছেলে মিজানের, অহিদুল আলম ধেছুর ছেলে ইউনুছের, সোলেমানের ছেলে কালুর, ইউসুফ আলীর ছেলে আনোয়ারের, সুলতানের ছেলে নুর মোস্তফার, অলি আহমদের ছেলে কাদুরার, বাদশা মিয়ার ছেলে ফারুকের এবং আয়ূব আলীর ছেলে জসিমউদ্দিনের।

এদেরই মত কক্সবাজারের বিভিন্ন গ্রামের শত শত মালয়েশিয়াগামী যুবকের কোন খোঁজ নেই। এসব ঘটনায় আসলে কতজন নিখোঁজ রয়েছে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যানও সরকারি-বেসরকারি কোন দপ্তরে নেই। তবে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পাচার হয়, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। এর বাইরে একটি বড় অংশ কাজের খোঁজে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন।

স্বেচ্ছায় অনেকে বিদেশে পাড়ি জমালেও কেউ কেউ দালাল চক্রের কবলে পড়ে পাচারের শিকার হচ্ছেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, কক্সবাজার জেলার পাড়ায় পাড়ায় বিস্তার করে আছে আদম পাচারকারী চক্র। রয়েছে বিপুল সংখ্যক নারী সদস্যও। বর্তমানে বহুল আলোচিত এমএলএম বা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং স্টাইলে দেশব্যাপী শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে মানব পাচারকারীরা। এমনকি এই নেটওয়ার্কটি বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। এই নেটওয়ার্কের নেতৃত্বে রয়েছে মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে এসে বসতিগড়া রোহিঙ্গারা। এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা অপহরণের পর বিদেশে পাচার করে মুক্তিপণ আদায়, থাইল্যান্ডে দাস শ্রমিক হিসেবে বিক্রি, এমনকি খুনও করছে। সূত্র জানায়, মানব পাচারকারী চক্র চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিভিন্ন সমুদ্র উপকূলকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে সাগরপথে মানব পাচার করছে।

মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা অসচ্ছল ও বেকার যুবকদের জীবন বদলে দেবার স্বপ্ন দেখিয়ে নগদ ২০ হাজার টাকা ও বাকী দেড়, দুই লাখ টাকা মালয়েশিয়া পৌঁছার পর পরিশোধের শর্তে সহজেই ফাঁদে ফেলছে। মালয়েশিয়াগামীদেরকে প্রথমে ছোট নৌকাযোগে উপকূল থেকে সমুদ্রে বড় জাহাজে তুলে দেয়া হয়। সেই জাহাজ ৮ দিন পর থাইল্যান্ড পৌঁছে দেয়। থাইল্যান্ডে অবস্থানকালে ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায় করা হয়। মুক্তিপণ পেলে মালয়েশিয়ার জঙ্গলে বিভিন্ন খামারে শ্রমিক হিসেবে পাঠানো হয়। কারো মুক্তিপণ পাওয়া না গেলে তাকে থাইল্যান্ডে দাস শ্রমিক হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়। সেখানে নির্যাতনে মারা গেছেন অনেকেই। এত ঘটনার পরও কেন মানুষ অবৈধ পথে মালয়েশিয়া যাচ্ছে জানতে চাইলে কক্সবাজারের বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী নুরুল আজিজ চৌধুরী বলেন, দেশে কর্মসংস্থানের অভাব প্রকট হয়ে ওঠায় অনেকেই ভাগ্য ফেরাতে জীবনের ঝুঁকি নিতেও পিছপা হচ্ছে না।

সূত্রে জানা যায়, এসব মানব পাচারকারীদের সঙ্গে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীরও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। গত সপ্তাহে টেকনাফ বিজিবির ৬ জন সদস্যকে মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খোন্দকার ফরিদ হাসান এ ঘটনার সতত্যা স্বীকার করেন। তবে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ জানান, কক্সবাজারে মানব পাচারের ঘটনা অনেক কমে এসেছে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here