J News

মানবতাবিরোধী ওবায়দুল ও আতাউরের মৃত্যুদণ্ড

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে নেত্রকোনার মো. ওবায়দুল হক ওরফে তাহের ও আতাউর রহমান ওরফে ননীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে অথবা গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবে বলে রায়ের আদেশে বলা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালে এ রায় দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি শাহীনুর ইসলাম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী। এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দুই জনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

রায়ে তাদের বিরুদ্ধে আনা ছয়টি অভিযোগের মধ্যে চারটি প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে অপহরণ, হত্যা, নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ৩ ও ৫ নম্বর অভিযোগে তাদের মৃত্যুদণ্ড এবং ১ ও ২ নম্বর অভিযোগে তাদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়। আর ৪ ও ৬ নম্বর অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় তাদের খালাস দেয়া হয়েছে। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন তারা প্রত্যাশিত বিচার পাননি। এ রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।

গত ১০ জানুয়ারি উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছিল ট্রাইব্যুনাল। পরে মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার দিন ধার্য করে। গতকাল সকাল ১০টা ৩৫ থেকে দুপুর ১২টা ১০ মিনিট পর্যন্ত বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করে। ২৬৮ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্তসার একে একে তিন বিচারপতি পড়েন। রায়ের প্রথম অংশ পড়েন বিচারিক প্যানেলের সদস্য বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী। রায়ের দ্বিতীয় অংশ পড়েন বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম। সবশেষে রায়ের মূল অংশ ও দণ্ড ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হক। ১ ও ২ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আসামিদের আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ৩ ও ৫ নম্বর অভিযোগে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফাঁসিতে ঝুলিয়ে অথবা গুলি করে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবে। আসামিদের যে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে সেগুলো হলো, ১৯৭১ সালের ১৯ অক্টোবর আসামিরা বারহাট্টার লাউফা গ্রাম থেকে ১০ জনকে অপহরণের পর ঠাকুরাকোনা সেতুতে নিয়ে যান এবং সেখানে সাতজনকে হত্যা করেন। এবং অপর অভিযোগটি হলো ১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর আসামিরা বিরামপুর বাজার থেকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বদিউজ্জামানসহ ছয়জনকে অপহরণ করে গুলি করে হত্যা। রায়ে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় দুই আসামি যে নৃশংস অপরাধ সংগঠিত করেছে তাতে তাদের মৃত্যুদণ্ডই প্রাপ্য।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। মামলার প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল সাংবাদিকদের বলেন, আদালত দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা, অপহরণ, দেশান্তরিতকরণ, বাড়ি-ঘরে আগুন ও লুটপাটের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সর্বোচ্চ এ সাজা দেয়া হয়েছে। রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বা গুলি করেও মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা যাবে। রায়ে আমরা সন্তোষ প্রকাশ করছি। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিম বলেছেন, আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করা হবে। রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, মোখলেসুর রহমান বাদল, সাবিনা ইয়াসমিন মুন্নী প্রমুখ। অন্যদিকে আসামিপক্ষে ছিলেন আবদুস সোবহান তরফদার ও গাজী এম এইচ তামিম।

গত বছরের ৩ মার্চ এই দু’জনের বিরুদ্ধে নেত্রকোনায় হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের ছয়টি অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। ২০১৫ সালের ৫ এপ্রিল তাদের বিরুদ্ধে সূচনা বক্তব্য পেশ ও সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর মধ্য দিয়ে মামলার বিচার শুরু হয়। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ২৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। তবে আসামিপক্ষ কোনো সাক্ষী হাজির করতে পারেননি। আসামি ওবায়দুল হক তাহেরের বাড়ি নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলায় এবং আতাউর রহমান ননীর বাড়ি কেন্দুয়া উপজেলায়। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১৪ সালের ১২ আগস্ট নেত্রকোনা পুলিশ এ দুই আসামিকে গ্রেফতার করে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারে গঠিত পৃথক দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এর আগে ২১ মামলায় ২৪ আসামির বিরুদ্ধে রায় হয়েছে। নেত্রকোনার মো. ওবায়দুল হক তাহের ও আতাউর রহমান ননীর বিরুদ্ধে মামলায় রায় ট্রাইব্যুনালের ২২তম রায়। আর একটি ট্রাইব্যুনাল হওয়ার পর এটি প্রথম রায়। এ পর্যন্ত রায় আসা ২২টি মামলার ২৬ আসামির মধ্যে তাহের ও ননীকে নিয়ে মোট ১৮ যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ সাজার আদেশ হল।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here