murgiরাজধানীর মুরগির আড়তে প্রতিদিন কয়েক হাজার মুরগি মারা যায়। নিয়ম হচ্ছে এগুলো ধ্বংস করা ফেলা। কিন্তু আজ পর্যন্ত সরকারের কোন প্রতিষ্ঠানকে দেখা যায়নি মৃত মুরগি ধ্বংস করতে। তাহলে মৃত মুরগিগুলো যায় কোথায়? প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ। রাজধানীর চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ও ফাস্টফুডের দোকানে।

সিটি কর্পোরেশনের দক্ষিণ ও উত্তরের দুই কর্মকর্তা বলেন, মরা মুরগি ধ্বংস ও অপসারণের দায়িত্ব তাদেরই। কিন্তু জনবল সংকট, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার কারণে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে না।

মাঝেমধ্যে সিটি কর্পোরেশন মরা মুরগি বিক্রি রোধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করে। এর ফলে কয়দিন সিন্ডিকেট চুপ থাকে। পরে তারা আবার মরা মুরগি আড়ত থেকে সংগ্রহ করে রাজধানীর নামি-দামি রেস্তোরাঁয়, ফাস্টফুডের দোকানসহ বিভিন্ন দোকানে সরবরাহ করে।

গতকাল বৃহস্পতিবার র্যাব-২ ও ম্যাজিস্ট্রেট এ এইচ এম আনোয়ার পাশার সমন্বয়ে পরিচালিত মোবাইল কোর্ট কাওরান বাজার রেললাইন সংলগ্ন বৃহত্ মুরগির আড়তে অভিযান চালিয়ে ১২০টি মরা মুরগিসহ দুই জন বিক্রেতাকে আটক করে। আটক দেলোয়ার হোসেন ও আসমা বেগম সাংবাদিকদের জানান যে, প্রায় ২০ বছর রাজধানীর গুলশান-বনানীসহ অভিজাত এলাকায় নামি-দামি রেস্তোরাঁসহ চাইনিজ ও ফাস্টফুডের দোকানে মরা মুরগি সরবরাহ করে আসছে। ওইসব দোকানে মরা মুরগির চাহিদা বেশি। অনেক রেস্তোরাঁ ও চাইনিজ রেস্টুরেন্টের মালিকরা নিয়মিত মরা মুরগির সরবরাহের বিষয়টি জানেন না। তাদের ম্যানেজার কিংবা অন্য কর্মচারীরা মরা মুরগি ক্রয় করে থাকে। আটক দেলোয়ার হোসেন ও আসমা বেগমকে দুই বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।

দেলোয়ার ও আসমা জানান, শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মরা মুরগির বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ হয়। মরা ও দুর্গন্ধযুক্ত মুরগিতে লেবুর রস ও এক ধরনের সুগন্ধি কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এরপর ওই মুরগি অনেকটা তাজা মনে হয়। দুর্গন্ধও থাকে না।

রাজধানীতে পাঁচটি বৃহত্ মুরগির আড়ত রয়েছে। এগুলো হচ্ছে কাওরান বাজার, কাপ্তান বাজার, যাত্রাবাড়ী, নিউমার্কেট ও ফকিরাপুল। সবচেয়ে বৃহত্ কাওরান বাজার আড়ত। এখানে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দেড় লক্ষ মুরগি আসে। এ সকল আড়তে আনার পথে প্রতিদিন কয়েক হাজার মুরগি মারা যায়। ওই সকল মুরগি নিয়মিত একটি সিন্ডিকেট সংগ্রহ করে।

আড়ত মালিকরা জানান, মরা মুরগি সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে তারা কোন টাকা নেন না। এগুলো এক জায়গায় রেখে দেয়া হয় কিংবা সংগ্রহকারীরা নিজেরাই বহনকারী ট্রাক থেকে মরা মুরগি সংগ্রহ করে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতি আড়তে ৬ থেকে ৭ জনের একটা গ্রুপ মরা মুরগি সংগ্রহ করার দায়িত্বে থাকেন। সংগ্রহকারীরা প্রতি মরা মুরগির জন্য সিন্ডিকেটের কাছ থেকে ১০/২০ টাকা পায়। সিন্ডিকেট প্রতিটি মরা মুরগি নামি-দামি রেস্তোরাঁ, চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ও ফাস্টফুডের দোকানে প্রায় ২শ’ টাকায় বিক্রি করে।

জানা গেছে, মুরগি ডাস্টবিনে ফেলে দিলে কিংবা সিটি কর্পোরেশনের জন্য রেখে দিলে সিন্ডিকেটের সদস্যরা আড়ত মালিকদেরকে হুমকি দেয়। এ কারণে তারা মরা মুরগির বিষয়ে নাক গলান না। সিন্ডিকেটের মধ্যে পেশাদার সন্ত্রাসী কিলারসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধী রয়েছে। বিভিন্ন জেলা হতে মুরগি আনার পথে হিটস্ট্রোক, ভাইরাসজনিতসহ বিভিন্ন কারণে মারা যায় বলে আড়ত মালিকরা জানান।

প্রখ্যাত কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হারুন-উর-রশীদ বলেন, মরা মুরগির তৈরি খাবার খেলে বিষক্রিয়া হবে। ওই খাবার খাওয়ার পর বমি, ডায়রিয়াসহ নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়। এক পর্যায়ে কিডনি বিকল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি বলে তিনি জানান।

মহাখালী ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, অনেক মুরগি ভাইরাস জনিত কারণে মারা যায়। সেই মুরগি তৈরির খাবার খেলে অন্ত্রে প্রদাহ দেখা দেবে। আর কেমিক্যাল যুক্ত মুরগি খেলে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা ৯৫ ভাগ। ওই খাবার স্টমাকে গিয়ে ক্যান্সার কিংবা ক্লোন ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে তিনি জানান।

খ্যাতিমান নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ বলেন, মরা মুরগি জাতীয় খাবার খেলে সাধারণত ভাইরাস ব্রেনসহ নার্ভে গিয়ে মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রখ্যাত লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মবিন খান বলেন, মরা মুরগির টকসিন শরীরের বিভিন্ন অর্গানে ছড়িয়ে পড়ে, লিভারসহ শরীরের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। সরবরাহকারীদের ক্রসফায়ার হলো একমাত্র শাস্তি বলে তিনি জানান।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here