আলী যাকের

কিছুদিন আগে একটা ইংরেজি ছবি দেখেছিলাম। এইচবিও চ্যানেলে। নাম দ্য সোলোইস্ট। একজন ধ্রুপদী চেলো বাদক এবং লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের এক কলামিস্টের সম্পর্কের ওপর নির্মিত এক অসাধারণ ছবি। স্টিভ লোপেজ লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের কলামিস্ট। আর ন্যাথ্নিয়েল আয়ার্স এক আমেরিকান-আফ্রিকান চেলো বাদক। তার অবস্থান লস অ্যাঞ্জেলেসের স্কিড রো তো। এই স্থানে অজস্র গৃহহীনের বাস। তাদের মধ্যে রয়েছে ভিখারি, মাদকাসক্ত, আধা পাগল, অনাথ, নানা ধরনের অস্বাভাবিক জীবন ধারণকারী মানুষ।

alyন্যাথনিয়েলকে হঠাৎ আবিষ্কার করে স্টিভ লোপেজ। সে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি ব্যস্ত রাস্তার ফুটপাতের এক কোনায় দাঁড়িয়ে নিজ মনে বেহালা বাজাচ্ছিল। এর পর বিভিন্ন জায়গা, বিভিন্ন ফুটপাত, পার্কের কোণে স্টিভ ন্যাথনিয়েলকে দেখতে পায়। মাঝেমধ্যেই দাঁড়িয়ে তার বাজনা শোনে। সেই বাজনা শুনে তার প্রত্যয় জন্মায় যে, এ কোনো সাধারণ ভিখারি বাদক নয়। কেন যেন মনে হয়, তার মধ্যে রয়েছে সঙ্গীতের শিক্ষা এবং অনুশীলন। স্টিভ তার সঙ্গে আলাপ করার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালে প্রতিবারই ন্যাথনিয়েল চমকে উঠে বাজনা বন্ধ করে দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো কথার জবাব দেয় না। আস্তে আস্তে বিভিন্নভাবে কলাম লেখক স্টিভ ন্যাথনিয়েল আয়ার্সের বেশ কাছাকাছি চলে আসে। প্রায় এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয় তাদের মধ্যে। স্টিভ জানতে পারে, ন্যাথনিয়েলের কাছে বেথহোফেনই হচ্ছে ঈশ্বর। বেথহোফেনের কথা বলতে বলতে ন্যাথনিয়েলের চোখ দুটো জ্বল জ্বল করে ওঠে। মুখটা উদ্ভাসিত হয়ে যায় আলোয়। একসময় চোখ ভরে আসে টলটলে জল। স্টিভ আগ্রহী হয় এই ভবঘুরে বাদকটিকে জানতে। সে জানতে পায় যে, ন্যাথনিয়েল বাল্যকাল থেকে এক দুর্মর আকর্ষণে প্রতিচ্যীয় সঙ্গীতের দিকে ধাবিত হয়। বাচ্চা বয়সের ছেলেটি একটি বিশাল বড় চেলো হাতে নিয়ে সঙ্গীত ভবনের দিকে ছোটে। তারপর এক ভূতে পাওয়া মানুষের মতো চেলোর ওপরে ছড় টেনে বেথহোফেনের সিম্ফনির এক মায়াজাল সৃষ্টি করে যেন। তারপর ক্রমে সে বড় হয়ে ওঠে এক ছন্নছাড়া পরিবেশে। তার এই কালজয়ী প্রতিভা কোনো স্বীকৃতি পায় না। তার অতিপ্রিয় চেলোটিও কোথায় চলে যায় কে জানে! যখন স্টিভ তাকে দেখতে পায় তখন সে একটি পুরনো বেহালা, যার দুটি তার অবশিষ্ট, তাতেই বাজিয়ে চলে তার প্রিয় বেথহোফেনের সিল্ফম্ফনি। স্টিভ লক্ষ্য করে, যখন ন্যাথনিয়েল চোখ দুটো বন্ধ করে, ঘাড়টা ঈষৎ বাঁকিয়ে একমনে তার বেহালা বাজায়, তখন সে যেন তার সঙ্গীতের প্রেমে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। মাথাটা মৃদু ছন্দে ডানে-বাঁয়ে দোল খায়।

ন্যাথনিয়েলের কোনো গল্প নেই, অথবা সে জানে না আদৌ কোনো গল্প আছে কি-না। সে দিব্যি খুশি রাস্তায় ভবঘুরে বাদক হিসেবে আজ এখানে কাল ওখানে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গীত সাধনা করতে। স্টিভ প্রাণ উজাড় করে একটি কলাম লেখে ন্যাথনিয়েলের ওপর। হৈচৈ পড়ে যায় চারদিকে। এক বৃদ্ধা, যিনি বাতে পঙ্গু হয়ে গেছেন তার একটি চেলো পাঠিয়ে দেন স্টিভের কাছে। তার অনুরোধ, এই চেলোটি যেন ন্যাথনিয়েলের কাছে পেঁৗছে দেওয়া হয়। কেননা, তার বাত-জর্জরিত হাতে আর চেলো বাজানো সম্ভব নয়। স্টিভের প্রতিবেদনে সাড়া পড়ে যায় ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে। বিশেষ সম্মানে ভূষিত হয় সে প্রশাসন দ্বারা ভবঘুরে এক বাদককে নিয়ে লেখার জন্য। আমরা জানতে পাই, এক লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে ৯০ হাজার গৃহহীন মানুষ বাস করে। আমাদের চোখ ক্যামেরার লেন্স হয়ে ধোঁয়াশা পরিবৃত এই হাজার হাজার গৃহহীনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় আস্তে আস্তে রাতের গভীরে। আমরা দেখতে পাই ওই সুদূরে ন্যাথনিয়েল একা দাঁড়িয়ে বাজিয়ে চলেছে তার জাদুর বেহালা।

ছবিটি এখানেই শেষ নয়। আরও অনেক ঘটনা রয়েছে এর পরে। স্টিভ চায় ন্যাথনিয়েলের পুনর্বাসন। কোনো এক ভবঘুরে আশ্রমে। কিন্তু ন্যাথনিয়েল তো প্রকোষ্ঠে বন্দি হতে চায় না। তার জায়গা তো খোলা রাস্তা, উন্মুক্ত আকাশ আর অসংখ্য গাড়ির প্রাণকাঁপানো শব্দে। আমরা যদি ধরে নিই যে, গল্পটির এখানেই শেষ, তাহলেই বা মন্দ কী! আমি তো তখন দিব্যি হেঁটে চোখ দুটোকে কেবল সম্বল করে গভীর রাতের নিস্তব্ধতাকে সাক্ষী রেখে এগিয়ে চলেছি আমার এই প্রিয় শহর ঢাকার রাস্তায়। আমি দেখছি কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও, কমলাপুর কিংবা সদরঘাটে অজস্র মানুষ দিন শেষে এক মানবেতর অবস্থায় পরম সুখে নিদ্রামগ্ন। তাদের আহার, সংসার, রমণ, আচমন তো খোলা আকাশের নিচে এই রাস্তাতেই। অনেক কথা মনে আসে আমার। আমাদের প্রতিবেদকদের মধ্যে আছে কি কোনো স্টিভ লোপেজ, যে তার সব স্পর্শকাতরতা নিয়ে আমাদের নিজস্ব ন্যাথনিয়েলকে খোঁজা শুরু করবে আমাদের এই প্রাণপ্রিয় শহরে? দিনের আলো অথবা গভীর যামিনীতে? আমাদের সড়ক কিংবা গলি-ঘুপচিতে লুকিয়ে আছে কি কোনো ন্যাথনিয়েল অ্যান্থনি আয়ার্স, যে তার সঙ্গীতে নিজেকে আকণ্ঠ ডুবিয়ে দেয়? যেন বা খুঁজে পায় ঈশ্বরকেই সেই সঙ্গীতে? আমার বুক ভাসিয়ে দিয়ে দরদর করে অশ্রু নেমে আসে আমি যখন বেথহোফেনে সম্মোহিত ন্যাথনিয়েলের জলভরা প্রায় উন্মত্ত চোখ দুটোকে দেখতে পাই কোনো এক কনসার্টে। তখন মনে হয়, আমার এই শহরে আছে কি সেই সঙ্গীতজ্ঞ লুকিয়ে ওই ভবঘুরেদের মাঝে, যে একতারায় তোলে সঞ্জীবনী সুর? ‘দ্য সোলোইস্ট’ আমাকে মনে করিয়ে দেয় লালন সাঁই, মনমোহন দত্ত, ফকীর আফতাব উদ্দীন, আলাউদ্দীন খাঁ, আয়াত আলী খাঁ_ আরও কত জানা-অজানা নাম! তাদের কেউ কি লুকিয়ে আছেন গভীর রাতে ঢাকার রাস্তায় নিদ্রামগ্ন ওই অজস্র্র মানুষের মাঝে?

ঠিক যেমন একজন ন্যাথনিয়েল আয়ার্সকে আবিষ্কার করার জন্য একজন স্টিভ লোপেজকে দরকার, তেমনি আমাদের প্রয়োজন একজন তীক্ষষ্টদৃষ্টিসম্পন্ন, ভালোবাসার বোধসম্পন্ন এক প্রতিবেদককে, যে তুলে ধরবে আমাদের নিজস্ব ন্যাথনিয়েলের কথা। তবে তার আগে এ কথা বলতে চাই, আমাদের এই সমাজে ছিল তো সবই! সংবেদনশীলতা ছিল, স্পর্শকাতরতা ছিল। ছিল বোধ, ছিল ভালোবাসা। আমাদের আবহমানকালের শুদ্ধ সঙ্গীতের ঐতিহ্যকে ভাগাড়ে নিক্ষেপ করেছি তো আমরাই। আর আমাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে আমাদের গণমাধ্যম! যাদের কৃপায় আমাদের শিল্পকর্ম লঘু হতে হতে এমন এক নিশ্ছিদ্র অন্ধকার গহ্বরে পতিত হয়েছে যে, আমরা আর উন্নত সংস্কৃতির মানুষ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছি না। ক্রমাগত বাঁদর নাচ নেচে চলেছি অন্যের অনুকরণে, নিজের সব গৌরবের অতীতকে বেমালুম ভুলে। আর তাতে ইন্ধন জুগিয়ে চলেছে আমাদের মাধ্যমগুলো বিকারহীনভাবে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের আবহমান সংস্কৃতির ঐতিহ্যের গভীরে আমাদেরকে প্রবেশ করতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে যেখানে মহর্ষী মনমোহন দত্তের অমৃত বাণীকে মহত্ত্বর করে তুলেছে ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর অগ্রজ ফকীর আফতাব উদ্দীন সংযোজিত ললিত, কেদার অথবা মেঘমল্লার রাগ। তিনিই ছন্দোবদ্ধ করেছেন সেই সঙ্গীতকে একতাল, ঝাপতাল কিংবা সুর ফাকতালে। এই সুর এখনও আমাদের হৃদয় মথিত করে। গাঁয়ের কৃষক গেয়ে চলে কোনো পড়ন্ত বিকেলে ক্ষেতের আগাছা বাছতে বাছতে।

আমি নিশ্চিত যে, একটি সংবেদনশীল গণমাধ্যম এবং একগুচ্ছ শিক্ষিত, অনুসন্ধিৎসু প্রতিবেদক হাতে হাত মেলালে আমাদের রাজপথে কিংবা আলপথে, খালে-বিলে কিংবা নদীতে বিচরণরত এসব মানুষকে সর্বসমক্ষে এনে নিজেদের ধন্য করা যাবে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here