news

পাকিস্তান থেকেই বিমানে করে আনা হচ্ছে জাল ভারতীয় রুপি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে চোরাচালান হয়ে আসছে সোনা। জাল রুপি পাশর্্ববর্তী এই দেশ ভারতে বাজারজাতকরণ হচ্ছে বাংলাদেশের রাজশাহী ও যশোরের সীমান্ত এলাকায় মাদক ব্যবসার মাধ্যমে। একইভাবে সোনা চোরাচালানেরও একটি বড় অংশ পাঠানো হচ্ছে ভারতে। এসব ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে জাল টাকা ও রুপি। পুরো প্রক্রিয়া চলছে একটি ভয়ঙ্কর গোপন পাকিস্তানি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। বাংলাদেশে অবস্থান করে এই অপকর্ম করে যাচ্ছেন পাকিস্তানিরা। এই নেটওয়ার্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদে।

লাখ লাখ ভারতীয় জাল রুপিসহ একাধিক পাকিস্তানি গ্রেফতার হওয়া, জাল মুদ্রার সঙ্গে পাকিস্তান দূতাবাসের এক কর্মকর্তার জড়িত থাকা এবং সর্বশেষ গতকাল পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের এক কর্মকর্তার গাড়িচালক আটক হওয়ার পর বেরিয়ে এসেছে পাকিস্তানি এই নেটওয়ার্কের নানা তথ্য। নজরদারিতে আনা হয়েছে পাকিস্তান দূতাবাস ও এয়ারলাইন্সের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে। চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত পাকিস্তান থেকে আগত ব্যক্তিদের ভিসা পরীক্ষা করে দেখা গেছে তাদের সবাই ভুয়া ভিসা ব্যবহার করেন। শুধু তাই নয়, ভিসা কেনার রসিদও তারা নকল করে থাকে। গত ২৪ ঘণ্টায় তিনজন পাকিস্তানি নাগরিককে টার্কিশ, এমিরেটস এবং পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত মোট পাঁচ কোটি ভারতীয় জাল রুপি উদ্ধার করেছে গোয়েন্দারা। এ ছাড়া গত ২০ মাসে কেবল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেই ২০ কোটি ভারতীয় জাল রুপি উদ্ধার করা হয়েছে।

সর্বশেষ গতকাল দুপুরে পাকিস্তান এয়ারওয়েজের বাংলাদেশস্থ স্টেশন ম্যানেজার সাইদ আলী আব্বাস শাহর গাড়িচালক বাংলাদেশি নাগরিক আলমগীর এবং ওই ফ্লাইটের যাত্রী আবদুল হাকিমকে অর্ধ কেজি সোনাসহ গ্রেফতার করা হয়। ওই ঘটনায় স্টেশন ম্যানেজারকে জবাব দিতে ইতিমধ্যেই চিঠি পাঠানো হয়েছে।

একাধিক সূত্র জানায়, হাকিম ছাড়াও মোট ছয়জন নিয়মিত বিভিন্ন সময় সোনা ও জাল মুদ্রার চালান বাংলাদেশে নিয়ে আসতেন। আলমগীরের কাছে বোর্ডিং পাস থাকার কারণে তিনি যাত্রীদের কাছ থেকে চোরাচালানের দ্রব্য নিয়ে নির্বিঘ্নে বেড়িয়ে আসতেন।

এর আগে গত শুক্রবার হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৬০ লাখ এক হাজার ভারতীয় রুপিসহ পাকিস্তানি নাগরিক আইয়ুব আলীকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ। এর এক দিন আগে বৃহস্পতিবার কাস্টমস কর্মকর্তারা এক কোটি ভারতীয় রুপিসহ রেহান আলী নামে আরও এক পাকিস্তানি নাগরিককে গ্রেফতার করে। ৪ ফেব্রুয়ারি হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ৭০ লাখ ভারতীয় জাল রুপিসহ আকরাম নামে এক পাকিস্তানি নাগরিককে গ্রেফতার করে কাস্টমস গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ। ওই দিন দুপুরে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে (পিকে-২৬৬) করাচি থেকে ঢাকায় আসেন আকরাম। পরে তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। তল্লাশি করা হলে তার সঙ্গে থাকা কালো স্যুটকেসের ভেতর থেকে ৬৯ লাখ ৯৭ হাজার ভারতীয় জাল রুপি উদ্ধার করা হয়। শুল্ক গোয়েন্দার এক ঊধর্্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টাঁকশাল থেকে ছাপা না হলে জাল রুপির মান এত উন্নত হওয়ার কথা নয়।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের জুলাই মাস থেকে চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ২০ মাসে ৪১২ কোটি ৯৭ লাখ টাকার ৮৭৯ কেজি ৭১৭ গ্রাম সোনা উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতার করা হয় ৯৪ জনকে। এর মধ্যে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০১ কোটি ৬৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার ৬৪১ কেজি ৯০৮ গ্রাম সোনা উদ্ধার করা হয়। এ সময় গ্রেফতার করা হয় ৭৫ জনকে।

অন্যদিকে, ২০১৩ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩৭ দশমিক ৮৩ কোটি টাকা সমমূল্যের ভারতীয় মুদ্রাসহ বিভিন্ন বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। এ সময় গ্রেফতার করা হয় ১৩ জনকে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিদেশে আসা-যাওয়ার পথে বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা বহন করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। অবৈধভাবে অর্থ পাচারের জন্যই এসব বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা বহন করে থাকে। আর এ কারণে অবৈধভাবে বহন করা বৈদেশিক মুদ্রা আটক করে থাকে কাস্টমস।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশি মুদ্রা এবং সোনা চোরাচালানের সঙ্গে পাকিস্তানি নাগরিকই জড়িত। এসব চোরাচালান থেকে প্রাপ্ত অর্থ এদেশে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ করে আসছে। তবে তাদের ওপর কড়া নজরদারি অব্যাহত। বিশেষ সতর্কাবস্থা নেওয়া হয়েছে বিমান, স্থল এবং সমুদ্রবন্দরগুলোতে।

সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশের পাকিস্তান দূতাবাস থেকে সহকারী ভিসা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাযহার খানকে জাল মুদ্রা ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ জামায়াত-শিবির, হিযবুত তাহ্রীর, তেহরিক-ই-তালেবান, আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের মতো বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীকে দেওয়ার মতো রাষ্ট্রদ্রোহী কাজে জড়িত থাকার অপরাধে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। মাযহার খান ১৭টি চ্যানেলের মাধ্যমে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কারের পর ১০টি চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেলেও সাতটি চ্যানেল অদ্যাবধি তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। মাযহার খান জাল রুপিগুলো বহনকারীদের বারাওয়ালা, ছোটাওয়ালা, বারাতেরা নামের বিভিন্ন কোডওয়ার্ডের মাধ্যমে নির্দেশ দিয়ে আসছিলেন।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here