vtineখোঁপায় গাঁদা ফুল, পরনে বাসন্তী রংয়ের শাড়ি, ডান হাত স্বামীর মুঠোয়। বা হাতে ছয় বছরের মেয়ের হাত ধরে চন্দ্রিমা উদ্যানে হাঁটছেন কাকলী। রাজধানীর শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা। নানা ব্যস্ততায় খুব বেশি বেড়াতে পারেন না এ দম্পতি-পরিবার। গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনে ভালোবাসা দিবস তাদের জন্য সে উপলক্ষ তৈরি করল।

এ পরিবারের মত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্নস্থানে ভালোবাসার এমনই রঙ মেখে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালোবাসা দিবস উদযাপন করেছেন তরুণ-তরুণী-নাগরিকরা। ভালোবাসার রঙ ছড়িয়ে দিয়েছেন চারদিকে। বেড়ানো-ভ্রমণের পাশাপাশি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা, বৃক্ষ রোপণ, কেক কাটা, ফুল-চকোলেট-পারফিউম-বই উপহার, শুভেচ্ছা কার্ড বিনিময়, অনলাইনে ভালোবাসার কথামালা-বার্তার প্রকাশসহ নানা উপায়ে দিবসটি পালন করেছেন নগরবাসী। রবীন্দ্র নাথের সুরে গেয়ে উঠেছেন, ‘ভালোবাসি, ভালোবাসি—/এই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলে বাজায় বাঁশি/ আকাশে কার বুকের মাঝে ব্যথা বাজে,/ দিগন্তে কার কালো আঁখি আঁখির জলে যায় ভাসি’/ সেই সুরে সাগরকূলে বাঁধন খুলে/ অতল রোদন উঠে দুলে।/ সেই সুরে বাজে মনে অকারণে/ভুলে-যাওয়া গানের বাণী, ভোলা দিনের কাঁদন-হাসি’

ভ্যালেন্টাইনস ডে উপলক্ষে রাজধানীতে ভালোবাসার আবীর ছড়িয়েছেন তরুণ-তরুণীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, বইমেলা প্রাঙ্গণ, চারুকলা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান, রমনা পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ধানমন্ডি লেক, বনানী পার্ক, আশুলিয়ার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ, লালবাগ দুর্গ, আহসান মঞ্জিলসহ রাজধানীর উন্মুক্ত ও বেড়ানোর মত জায়গাগুলোতে ঘুরে বেড়িয়েছেন তরুণ-তরুণী, প্রেমিক-প্রেমিকা, স্বামী-স্ত্রী। ছুটির দিন হওয়ায় আনন্দ ছিল আরো বাঁধভাঙ্গা। ছিল না কলেজ বা অফিস ফাঁকি দিয়ে ঘরে ফেরার মত তাড়া। রাজধানীর রমনা পার্কে বেড়ানো এমনই এক প্রেমিক জুটি সাইফুল ইসলাম ও খাদিজা পারভীন। একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অন্যজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। উভয়ই জানালেন, তাদের প্রেমের ৫ বছরের প্রতিবছরই দুইজন নিয়ম করে এ দিন একসঙ্গে ঘুরে বেড়ান। পরস্পরকে উপহার দেন। কলেজে পড়ার সময় এ জন্য ক্লাস ফাঁকিও দিতে হয়েছিল! ফাঁকি দিতে হয়েছিল অভিভাবকের চোখ। এখন আর সেই সমস্যা নেই। তাই আনন্দের মাত্রা বেড়েছে বহুগুণ।

গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর শাহবাগ, ফার্মগেট, ধানমন্ডি, উত্তরার ফুলের দোকানগুলোতে ছিল তরুণ-তরুণীদের ভিড়। মেগা মল বা গিফ্ট শপগুলোতেও ছিল তারুণ্যের জোয়ার। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রেস্টুরেন্টগুলোতেও বাড়ে তরুণ-তরুণীর আনাগোনা। দেশি-বিদেশি খাবারে একান্তে-আলাপে চলে ভালোবাসার বিনিময়। বুড়িগঙ্গার দুর্গন্ধও অনেককে নৌকা ভ্রমণের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে পারেনি। মোবাইলফোন, স্কাইপে, ই-মেইল, ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে চলে ভালোবাসার কথামালা, কবিতা-বার্তার প্রকাশ। শুধু প্রিয়জনকে বার্তাই নয়, দিবসটি ঘিরে নিজেদের অনুভূতি-দর্শন প্রকাশ করেছেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, হাকিম চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় গোলাপবিনিময়, প্রেমের কবিতা পাঠ, স্মৃতিচারণসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হলের মাঠে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ধানমন্ডি লেকে ও শিল্পকলা একাডেমী প্রাঙ্গণে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কনসার্টের আয়োজন করা হয় রাজধানীর আরো কয়েকটি স্থানে।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বৃক্ষচারা রোপণ করেছে ‘সবুজ পাতা’ সংগঠন। এদিনে প্রিয়জনকে গাছের চারা উপহার দেয়ার আহবান জানিয়েছে সংগঠনটি। বইমেলায় ঘুরে প্রিয়জনকে নিয়ে বই পছন্দ করা এবং পছন্দের বই উপহার দেয়ার দৃশ্যও ছিল চোখে পড়ার মত।

গত কয়েক বছর ধরে ভ্যালেন্টাইনস ডেতে শুধু প্রেমের জয়গান নয়, এ নিয়ে ব্যতিক্রমী কর্মসূচি পালন শুরু করেছে দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের একটি দল। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রেমবঞ্চিত’ শিক্ষার্থীদের একটি দল ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। দুপুর পৌনে তিনটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল থেকে প্রায় আড়াইশ’ শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে মিছিল বের করেন। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত বঞ্চিত প্রেমিক সংঘ’ ব্যানার নিয়ে মিছিলটি কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, টিএসসি, শহীদ মিনার, পলাশী, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ ঘুরে কলা ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে তারা সমাবেশ করেন। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল ‘কেউ পাবে আর কেউ পাবে না, তা হবে না, তা হবে না’, ‘ভালোবাসার ধর্মঘট, চলছে, চলবে’, ‘হৈ হৈ রৈ রৈ, ভণ্ড প্রেমিক গেলো কই’, ‘এক দফা এক দাবি, প্রেম হোক সার্বজনীন’ লেখা প্ল্যাকার্ড। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা লুঙ্গি পরে ক্যাম্পাসে মিছিল করেন। রাজশাহী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) ‘চিরকুমার সংঘ’ ব্যানারে ‘ভালোবাসা বিরোধী মিছিল’ বের করেন শিক্ষার্থীদের একটি দল।

এ বছর ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষে গত ৭ ফেব্রুয়ারি ‘রোজ ডে’, ৮ ফেব্রুয়ারি প্রপোজ ডে, ৯ ফেব্রুয়ারি চকোলেট ডে, ১০ ফেব্রুয়ারি টেডি ডে, ১১ ফেব্রুয়ারি, প্রমিজ ডে, ১২ ফেব্রুয়ারি হাগ ডে, ১৩ ফেব্রুয়ারি কিস ডে এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইনস ডে উদযাপন শুরু হয়েছে। আগের দিবসগুলো ঘটা করে পালিত না হলেও গতকাল ভ্যালেন্টাইনস ডে বিপুল আগ্রহ নিয়েই পালন করেছেন তরুণ-তরুণীরা।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here