newsপদ্মা নদীর ভাটি এলাকায় ভেসে উঠছে একের পর এক লাশ। মাওয়ায় লঞ্চডুবির দুই দিন পর গতকাল বুধবার পদ্মা ও মেঘনা নদী থেকে আরো ১২টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে ভোলায় ৪, চাঁদপুরের হাইমচরে ৩, বরিশালে ১, শরিয়তপুরের সুরেশ্বর ও নড়িয়ায় ৩ এবং মাওয়ায় ১টি লাশ উদ্ধার হয়। লাশগুলোর মধ্যে মাত্র ৪ জনের পরিচয় জানা গেছে। বাকিরাও ডুবে যাওয়া লঞ্চের যাত্রী বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গতকাল সন্ধ্যায় মাওয়াঘাটে বিআইডব্লিউটিএ’র রেস্ট হাউসে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান জানান, ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে এ পর্যন্ত ১৯টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এদের মধ্যে ৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। যে যে এলাকায় লাশ উদ্ধার হবে ওই এলাকায় স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হবে বলে তিনি জানান।

এদিকে গত তিন দিনেও ডুবে যাওয়া ‘পিনাক-৬’ লঞ্চটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সমন্বিত উদ্ধার অভিযান চললেও এখনও নিখোঁজ রয়েছেন লঞ্চটির শতাধিক যাত্রী। তবে যাত্রীদের লাশ নদীর ভাটি এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার হওয়ায় স্বজনরা মাওয়া ঘাটে অপেক্ষা না করে নিজেরাই লাশের সন্ধানে নদীতে নেমেছেন। কেউ ট্রলারে, আবার কেউ নৌকায় করে নদীর বুকে বিশেষ করে ভাটি এলাকায় খুঁজে ফিরছেন প্রিয়জনের লাশ। তাদের একটাই দাবি, ঘরে ফেরার সময় অন্তত স্বজনের লাশটি নিয়ে যেতে চাই।

গতকাল ভোলা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তেজগাঁও কলেজের বিবিএ’র ছাত্র ফায়জুল করিম ফাহাদ আকন্দ (২২) এর মরদেহ। ফাহাদের বাড়ি ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ায়। শরীয়তপুরের নড়িয়া ও সুরেশ্বর থেকে উদ্ধার করা হয় মাদারীপুরের শিবচরের মিজানুর রহমান (৩৫), ফরিদপুরের নগরকান্দার রিতা আক্তার (২৫), ফরিদপুরের নগরকান্দার জামাল উদ্দিন (২৭) ও এক অজ্ঞাত নারীর (২৫) লাশ। এই অজ্ঞাত নারী নৌ-মন্ত্রী শাজাহান খানের ভাগ্নি জান্নাতুল নাইম লাকির লাশ বলে স্বজনরা নিয়ে যান। তবে পরে লাকির লাশ নয় বলে ফেরত দেন। এছাড়া মাওয়ার ভাটি অঞ্চল থেকে দুপুরে নৌবাহিনীর উদ্ধারকারী জাহাজ অজ্ঞাত এক নারীর (৩৫) লাশ উদ্ধার করে কাওরাকান্দি ঘাটে হস্তান্তর করে।

এদিকে নৌ-মন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলনে ৮ লাশের পরিচয় জানা গেছে উল্লেখ করলেও মাওয়াঘাটে স্থাপিত ক্যাম্প থেকে এ পর্যন্ত উদ্ধারকৃত লাশের মধ্যে ৬ জনের নাম-পরিচয় জানানো হয়েছে। এরা হলেন, গতকাল উদ্ধার হওয়া ফাহাদ, মিজানুর রহমান, রিতা আক্তার, জামাল উদ্দিন এবং লঞ্চডুবির প্রথম দিন উদ্ধার হওয়া হাসি ও হীরা। এদের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ডুবে যাওয়া লঞ্চ উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় গতকাল জরুরি বৈঠক করে। মাওয়া ঘাটে বিআইডব্লিউটিএ’র রেস্ট হাউসে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে নৌ-মন্ত্রী শাজাহান খান উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে লঞ্চ উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিআইডব্লিউটিএ, নৌ-বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও কোস্টগার্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন। লঞ্চ উদ্ধার চেষ্টার সর্বশেষ অবস্থা এবং উদ্ধার কার্যক্রম আরো চলবে কি না- সে ব্যাপারে বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়।

লাশের খোঁজে স্বজনরা: গতকাল মাওয়া ও মাওয়ার ভাটির দিকে লাশের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। স্বজনরা এখন প্রিয়জনের শোকে কাঁদতেও ভুলে গেছেন। তাদের চোখে আর পানি ঝরছে না। তারা নিষ্পলক তাকিয়ে রয়েছেন শুধু প্রমত্তা পদ্মার জলরাশির দিকে। যদি প্রিয়জনের লাশ ভাসতে দেখেন! এটুকুই প্রত্যাশা এখন তাদের।

বরিশালের বাকেরগঞ্জের জাকির হোসেন জুলহাস ডুবে যাওয়া লঞ্চের যাত্রী ছিলেন। নিখোঁজ হওয়ার পর তার ছোট ভাই আল মামুন এখন ট্রলারে চেপে পদ্মায় ভাইয়ের লাশ সন্ধান করছেন। মাওয়া ঘাট থেকে এক কিলোমিটার পূর্ব দিকে পদ্মা নদীর তীরে মামুনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ভাইয়ের লাশের সন্ধানে সকাল থেকে ট্রলারে প্রায় ৩ ঘণ্টা পদ্মা নদীতে চষে বেড়িয়েছেন। লাশ না পাওয়ায় ভাইয়ের স্ত্রী কানন বেগম বার বার মূর্চ্ছা যাচ্ছেন। অন্তত লাশ নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরতে চান।

ফরিদপুরের আটরশির আয়শা আক্তার আট মাসের অন্ত:সত্ত্বা। স্বামী শহীদুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জের একটি গার্মেন্টেসের প্রোডাকশন ম্যানেজার। বাবার বাড়িতে ঈদ উদযাপন শেষে আয়শা তার ৮ বছরের সন্তান সারা মনি ও স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন। লঞ্চ ডুবে যাওয়ার সময় আয়শা আক্তার ও সারা মনি লঞ্চের ভিতরে ছিলেন। শহীদুল লঞ্চের ডেকে ঘোরাঘুরি করছিলেন। ডুবে যাওয়ার সময় তিনি লঞ্চের ভিতর থেকে তার স্ত্রী ও সন্তানদের বের করার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। গতকাল শহীদুল সুরেশ্বর ও কাওড়াকান্দি এলাকায় ট্রলারে করে তার স্ত্রী ও সন্তানের লাশের সন্ধান চালান।

উদ্ধার কার্যক্রম:গতকাল সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত নৌ-বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও বিআইডব্লিউটিএ পদ্মা নদীর ১০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তল্লাশি করেও লঞ্চের অবস্থান শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। দুপুর পর্যন্ত তিনটি ‘সোনার’ (সাউন্ড নেভিগেশন অ্যান্ড রেঞ্জিং) মেশিন দিয়ে নদীতে তল্লাশি চালানো হয়। লঞ্চ উদ্ধার করতে উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম ও নির্ভীক এখন মাওয়া ঘাট থেকে অর্ধ কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর ‘মিডপয়েন্ট’এ অপেক্ষা করছে।

তল্লাশি অভিযান পরিচালনাকারী নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম জানান, বুধবার সন্ধ্যায় মাওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্ধারকারী জাহাজ ‘কান্ডারী’ পৌঁছতে পারে। গত দুই দিনের মতো একই কায়দায় ‘সোনার’ মেশিন দিয়ে ডুবে যাওয়া লঞ্চ শনাক্তকরণের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তেমন কোন সম্ভাব্যস্থান চি?হ্নিত হয়নি।

ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক আমীর হোসেন মজুমদার জানান, বুধবার সকালে মাওয়ার ভাটির দিকে ১২ জন ডুবুরী নদীতে তল্লাশি চালিয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের ৪০ সদস্য কাজ করছে। ফায়ার সার্ভিস নোঙর দিয়ে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।

সোমবার সকালে কাওড়াকান্দি থেকে ছেড়ে আসা এমএল পিনাক-৬ মাওয়া লঞ্চ ঘাট থেকে পৌনে ১ কিলোমিটার দূরে লৌহজং চ্যানেলে আড়াইশ’ যাত্রী নিয়ে প্রায় ৯০ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। এর মধ্যে মাত্র ১ শ’ যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা গেছে।

ভোলা দক্ষিণ প্রতিনিধি জানান, গতকাল বেলা ১টা পর্যন্ত ভোলার মেঘনার সদর উপজেলার রামদাসপুর, ইলিশা ও কাচিয়া ইউনিয়নের কাঠিরমাথা এলাকা থেকে শিশুসহ ৪টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ফাহাদ আকন্দের লাশ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. সেলিম রেজা জানান, আরো লাশ ভেসে আসার আশঙ্কায় কোস্টগার্ডকে মেঘনায় সতর্ক দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

নড়িয়া (শরীয়তপুর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার চরআত্রা ও কাচিকাটা থেকে ২টি লাশ উদ্ধার করেছে নড়িয়া থানা পুলিশ ।

চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, সকালে জেলার হাইমচর উপজেলার মেঘনা নদী থেকে ২টি লাশ উদ্ধার করেছে স্থানীয় পুলিশ। হাইমচর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মনিরুজ্জামান জানান, লাশগুলো শনাক্ত করার জন্য থানায় আনা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ভাঙ্গা (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, লঞ্চডুবির ঘটনায় একই পরিবারের ৫ জনসহ মোট ১৫ জন নিখোঁজ হওয়ায় উপজেলায় এখন চলছে শোকের মাতম। নিখোঁজ এসব লঞ্চযাত্রীরা হলেন, হামেরদী ইউনিয়নের ভীমের কান্দা গ্রামের ইসমাইল মিয়ার স্ত্রী চাঁদনী আক্তার (৪০), মেয়ে সাহিদা (১২), মেয়ে সুবর্ণা (৮), মেয়ে রুমানা (০১) ও বোন তাছলিমা বেগম (৫৫), কাউলিবেড়া ইউনিয়নের খাটরা গ্রামের লোকমান হোসেনের স্ত্রী আয়শা বেগম (৩০), মেয়ে সারা (১২) ও ভাতিজি রোজিনা (১৩), তুজারপুর ইউনিয়নের ষরইবাড়ী গ্রামের সোহরাব হোসেনের ছেলে রবিউল হোসেন (২৮) ও মেয়ে রাবেয়া (১০), হামেরদী ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামের রফিউদ্দিন তালুকদারের ছেলে সহিদ তালুকদার (৩৫), ঘারুয়া ইউনিয়নের খামিনারবাগ গ্রামের ছলেমান সেকের মেয়ে শাহিনূর (২৮) ও সফিউর সেকের ছেলে অলিউর সেক (৩০), কাওলিবেড়া ইউনিয়নের পল্লীবেড়া গ্রামের মোস্তফা মাতুব্বরের ছেলে রেজাউল মাতুব্বর (২৮) ও নাসিরাবাদ ইউনিয়নের ভদ্রকান্দা গ্রামের সফর খানের ছেলে টিটন খান (৩২)।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here