জনতার নিউজ

ভাঙতেই হচ্ছে বিজিএমইএ ভবন

সর্বশেষ আইনি লড়াইয়ে হেরে গেল বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। গতকাল রবিবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ভবন ভাঙার রায় পুনর্বিবেচনা সংক্রান্ত রিভিউ পিটিশন খারিজ করে দিয়েছে। এর ফলে সংস্থাটিকে ভাঙতেই হচ্ছে বহুতল অবৈধ ভবনটি। তবে ভবনটি ভাঙার জন্য বিজিএমইএ কতদিন সময় পাবে সে ব্যাপারে বৃহস্পতিবার আদেশ দেবে আপিল বিভাগ। এর আগে দেশের সর্বোচ্চ আদালত লিভ টু আপিল খারিজের রায়ে অবিলম্বে ভবনটি ভাঙতে বিজিএমইএকে নির্দেশ দিয়েছিল। আদালত বলেছিল, ভবন ভাঙার যাবতীয় খরচ বিজিএমইএকেই বহন করতে হবে। বিজিএমইএ না ভাঙলে রায়ের কপি পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে রাজউককে ভবনটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়া গেল। এ জন্য যে অর্থ প্রয়োজন তা বিজিএমইএর কাছ থেকে নিতে বলা হলো।

হাইকোর্ট ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল ভূমির মালিকানা স্বত্ব না থাকা এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও জলাধার আইন ভাঙায় বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ অবৈধ ঘোষণা করে। রায়ে ৯০ দিনের মধ্যে ভবনটি ভেঙে মাটির সঙ্গে গুঁড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল। এর বিরুদ্ধে বিজিএমইএ লিভ টু আপিল করে। গত বছরের ২ জুন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ তা খারিজ করে দেয়। এ রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ পিটিশন দায়ের করে বিজিএমইএ। ওই পিটিশনে আপিল বিভাগের রায় স্থগিত করে বহুতল ভবনটি ভেঙে ফেলার জন্য তিন বছরের সময় চাওয়া হয়।

গতকাল রিভিউ পিটিশনের শুনানিতে বিজিএমইএর প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামরুল হক সিদ্দিকী বলেন, সরকারের সকল সংস্থার অনুমতি নিয়েই ভবনটি নির্মিত হয়েছে। ১৯৯৫ সালে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ভবনটি নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দের অনুমতি দিয়েছিলেন। ওই জমি বরাদ্দের অনুমতির নথি আগে আমাদের কাছে ছিল না, এখন পেয়েছি। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, আগে ভবন তৈরি করে পরে অনুমতি নিয়েছেন? যেখানে এই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে সেখানে জলাধার ছিল। দেশের সকল আইন কানুন লংঘন করে এই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। আবেদনটি খারিজ করা হলো।

এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেন, ভনটি ভাঙার জন্য অনেক সময় প্রয়োজন। এর আগে এ ধরনের একটি বহুতল ভবন ভাঙতে গিয়ে অনেক শ্রমিকের প্রাণহানি হয়েছে। তখন পরিবেশবাদি আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, রাজউকের চেয়ারম্যান বলেছেন ভবনটি ভাঙার জন্য তারা প্রস্তুত। সংস্থাটির সে জনবল রয়েছে। আদালত বলেন, ভবনটি ভাঙতে কতদিন সময় প্রয়োজন? অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, রাজউকের সঙ্গে কথা বলেছি তারা জানিয়েছে এটি।

ভাঙতে এক বছর সময় দরকার। এ পর্যায়ে বিজিএমইএর আইনজীবী তিন বছর সময়ের কথা উল্লেখ করেন। আদালত বলেন, আপনারা লিখিত সময়ের আবেদন দিন। বৃহস্পতিবার আদেশ দেওয়া হবে।

পরে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ভবন ভাঙার রায় বহাল রেখে বিজিএমইএ’র রিভিউ খারিজ করে দিয়েছে আপিল বিভাগ। বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে ভবনটি ভাঙার ব্যাপারে মৌখিকভাবে তিন বছরের সময় আবেদন করা হয়েছিল। আদালত বিজিএমইএকে বলেছে, বৃহস্পতিবারের মধ্যে লিখিতভাবে আবেদন করতে। ওই দিনই আদালত বিজিএমইএ-কে ভবনটি ভাঙতে কতদিন সময় দিবে, সে বিষয়ে আদেশ দেবে। তিনি বলেন, ভবনটি যখন নির্মাণ করা হচ্ছিল পরিবেশবাদীদের উচিত ছিল তখনই আদালতের দ্বারস্থ হওয়া। এই জায়গায় কাজ শুরুর আগেই বাধা দেওয়া উচিত ছিল। বাধা দেওয়ার পর না মানলে তখনই তারা আদালতে আসতে পারতেন।

বিজিএমইএর আইনজীবী ইমতিয়াজ মইনুল ইসলাম বলেন, রিভিউ খারিজ করে দেওয়ার পর ভবনটি ভাঙার বিষয়ে আমরা সময় চেয়েছিলাম। আদালত বলেছেন, লিখিত আবেদন করতে। আমরা লিখিত আবেদন করব এবং তিন বছর সময় চাইব।

১৯৯৮ সালের ২৮ নভেম্বর সে সময়কার ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজিএমইএ ভবনটির ভিত্তি স্থাপন করেন। ভবন নির্মাণ শেষ হলে ২০০৬ সালের ৮ অক্টোবর বিজিএমইএ ভবন উদ্বোধন করেন তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এরপর থেকে বিজিএমইএ ভবনটি তাদের প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছে। রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ করা নিয়ে ২০১০ সালের ২ অক্টোবর একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন আমলে নিয়ে ৩ অক্টোবর বিজিএমইএ ভবন কেন ভাঙার নির্দেশ দেওয়া হবে না তার কারণ জানতে চেয়ে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন। ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল বিজিএমইএ ভবন নির্মাণকে অবৈধ ঘোষণা করে তা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, আর্থিক প্রতিপত্তির কারণে ভবনটি নির্মাণ করে বিজিএমইএ বহু প্রত্যাশিত হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়নে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। যা কোনো অবস্থাতেই আইনের শাসনের আঙ্গিকে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আর্থিক পেশিশক্তির অধিকারী বলে একটি শক্তিশালী মহলকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে এমন যুক্তি অগ্রহণযোগ্য। বস্তুত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হিসাবে বিজিএমইএকে আইনের প্রতি আরো অধিক শ্রদ্ধাশীল হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। অথচ তারা তা না করে আইনকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে ব্যবহার করেছেন।

রায়ে বলা হয়, বিজিএমইএর ওই ভবনের জমির ওপর কোনো মালিকানা নেই। কেননা জমিটি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল রেলওয়ের জন্য ১৯৬০ সালে। এখানে দেখা যাচ্ছে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ অর্থাত্ যাদের প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল তারাই মোট ৬ দশমিক ২১ একর জমি অপ্রয়োজনীয় বিবেচনায় ছেড়ে দেয় একই বছরে। পরে ১৯৯৮ সালে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ওই জমি একটি স্মারকের মাধ্যমে বিজিএমইএকে -এর নিজস্ব ভবন তৈরির জন্য বেআইনিভাবে প্রদান করে। অথচ ২০০৬ সালের আগ পর্যন্ত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর আদৌ ওই জমির মালিকানা ছিল না। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো কোনোক্রমেই বিজিএমইএকে ভবন তৈরির জন্য জমি প্রদান করতে পারে না। কেননা অধিগ্রহণকৃত জমি হয় মূল মালিককে ফেরত দিতে হয় অথবা অন্য একটি জনস্বার্থে ব্যবহার করতে হয়।

আপিল বিভাগ গত বছরের ৮ নভেম্বর লিভ টু আপিল খারিজের রায় প্রকাশ করে। ওই রায়ে আপিল বিভাগ বলেন, আমাদের বলতে দ্বিধা নেই বিজিএমইএ দেশের সকল আইন কানুন লংঘন করে অবৈধভাবে এই বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে। একারণে অবিলম্বে এটিকে ভেঙে ফেলতে হবে। আপিল বিভাগ বলেছে, দুটি প্রাকৃতিক জলাধার বেগুনবাড়ি খাল ও হাতিরঝিল লেক দখল করে বিজিএমইএ কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকাকে জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এ দুটি জলাধারের। রায়ে বলা হয়, জমির মালিকানার যথাযথ কাগজপত্র দেখাতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন রুলস-১৯৯৬ অনুযায়ী রাজউক থেকে নকশা অনুমোদনের জন্য জমির মালিকানার প্রমাণপত্র দাখিল করতে হয়। জমির মালিকানা সঠিক হলে আইন অনুযায়ী রাজউক নকশা অনুমোদন দিতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে উক্ত জমিটি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) কাছ থেকে নিয়েছে বিজিএমইএ। অথচ ইপিবি এই জমির মালিকানাই অর্জন করতে পারেননি।

রায়ে বলা হয়, ভবন নির্মাণের জন্য জলাধার আইন-২০০০ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ অনুযায়ী পরিবেশগত ছাড়পত্র নিতে হয়। এখানেও সেটা অনুপস্থিত। অবৈধভাবে জমি হস্তান্তরের পর অবৈধভাবে এই ১৫ তলা বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে বিজিএমইএর আবেদনের কোনো সারবত্তা না থাকায় তা খারিজ করা হলো।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here