নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে বিরামহীন চলছে ঢাকা মেট্রোরেল লাইন-৬ এর কর্মযজ্ঞ। ইতিমধ্যে নয়টি টেস্ট পাইলের কাজ শেষ করে মূল পাইলের কাজ শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে কারওয়ান বাজার-ফার্মগেট এলাকায় সার্ভিস লাইন সরানোর কাজও চলমান। একই প্রকল্পের মিরপুর-শেওড়াপাড়া-আগারগাঁও অংশে ডিভাইডার দিয়ে মূল লাইন স্থাপনের জন্য জায়গা সংরক্ষণ করা হয়েছে। রাস্তার আইল্যান্ড বরাবর এবং এর দুই পাশ থেকে জায়গা সংরক্ষণ করে মূল পাইলের কাজ শুরু হয়েছে এ অংশে। আর যাত্রী পারাপারে ব্যবহূত হবে এমন রেলকোচ তৈরির কাজ ইতিমধ্যে জাপানে শুরু হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। সূত্র জানায়, শুষ্ক মৌসুম চলায় দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই পালাক্রমে কাজ করছেন শ্রমিক ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পের মূল ডিপো এলাকা উত্তরার ডিয়াবাড়ীতে মূল কাজের অগ্রগতি হয়েছে ১০ ভাগ। বর্তমানে সাইট অফিস নির্মাণ এবং ডিপোর অভ্যন্তরে চেক বোরিং কাজ চলছে। মাটি ভরাটের কাজ হয়েছে ৭৫ শতাংশ। আশা করা হচ্ছে চলতি বছরের শেষ দিকে প্রকল্পের প্রথম অংশ (ফেজের) কাজ শেষ হবে।

এদিকে প্রকল্প এলাকার মিরপুর ১২, ১১, ১০, কাজীপড়া, শেওড়াপাড়া, তালতলা ও আগারগাঁও ঘুরে দেখা গেছে, দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই চলছে কর্মযজ্ঞ। আগারগাঁও এলাকায় প্রকল্পের কাজের জন্য বসানো হয়েছে বিশাল আকৃতির ক্রেন, এসকেভেটর ও পাইলিংয়ের কাজে ব্যবহূত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাস্তার পাশে স্থাপন করা হয়েছে প্রকল্পের সাইট অফিস। রাস্তার ধারে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে নির্মাণসামগ্রী ইট, সিমেন্ট, বালু, সুরকি ইত্যাদি। প্রকল্প এলাকায় নির্বিঘ্নে কাজ করতে ও দুর্ঘটনা এড়াতে সড়কের মধ্যে সংরক্ষণ করা জায়গাকে কাঁটাতারের বেড়ায় ঘিরে ফেলা হয়েছে। দেওয়া হয়েছে উঁচু টিনের দেয়াল।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজেদের কাজ শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছেন খোদ সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ইতিমধ্যে মেট্রোরেলের কোচ কেনার জন্য জাপানি প্রতিষ্ঠান কাওয়াসাকি মিটসুবিসি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। গত অক্টোবর-নভেম্বরে জাপানে কোচ তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানতে জাইলে মেট্রোরেল প্রকল্পের পরিচালক আফতাব উদ্দীন তালুকদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘পুরো প্রকল্পের কাজে সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়েছে। এখন সার্বিকভাবে কাজের গতি বেড়েছে। আশা করা হচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।’

সূত্র জানায়, মেট্রোরেল প্রকল্পের লাইন-৬ এর পুরো কাজ আটটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্যাকেজ ৩ ও ৪-এর আওতায় উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার উড়ালপথ ও নয়টি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। পরে এই উড়ালপথের ওপরই ট্রেনের জন্য লাইন বসানো হবে। ইতিমধ্যে এ কাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। এ প্যাকেজের মেয়াদ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ডিসেম্বর-২০১৭ পর্যন্ত এ প্যাকেজের কাজের অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। এ প্রকল্পের প্যাকেজ ১-এর আওতায় রয়েছে ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়ন। ২০১৮ সালের অক্টোবরের মধ্যে কাজটি শেষ করার কথা রয়েছে। আর চুক্তি স্বাক্ষরের পর এখন পর্যন্ত এ প্যাকেজের ভূমি উন্নয়নের কাজ হয়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। তবে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ বলছে প্রকৃতপক্ষে এর অগ্রগতি আরও বেশি।

প্যাকেজ ২-এর আওতায় ডিপো এলাকার অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এ অংশে বিরতিতে ট্রেন রাখা ছাড়াও মেরামত ও মালামালের গুদাম, প্রধান ওয়ার্কশপ, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, জেনারেটর ও ইলেকট্রিক্যাল অবকাঠামো, ট্রেন ধোয়ার স্থান, বহুতল কার পার্কিংসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এই প্যাকেজের প্রথম পর্যায়ের কাজ ২০১৯ সালের অক্টোবরে ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা রয়েছে। এ প্রকল্পের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। প্যাকেজ-৫ ও ৬-এর আওতায় আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত উড়ালপথ ও স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এ প্যাকেজ দুটির কাজের চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে চলতি বছর জুলাইয়ে। আর এ কাজের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। প্যাকেজ ৭-এর আওতায় ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল সিস্টেম কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০১৬ সালের ২৬ মে। এই প্যাকেজের আওতায় প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০১৯ সালের অক্টোবরে। আর দ্বিতীয় পর্যায়ের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্যাকেজ ৮-এর আওতায় রোলিং স্টক (রেলকোচ) ও ডিপো ইকুইপমেন্ট সরবরাহের কাজ চলমান রয়েছে।

জানা গেছে, উত্তরা থেকে শুরু হয়ে মেট্রোরেলে লাইন-৬ এর রুট হবে মতিঝিল পর্যন্ত। ২০ কিলোমিটার এ লাইনে স্টেশন থাকবে ১৬টি। প্রতি চার মিনিট পরপর ১ হাজার ৮০০ যাত্রী নিয়ে চলবে মেট্রোরেল। প্রতি ঘণ্টায় যাত্রী পরিবহন করবে প্রায় ৬০ হাজার। ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে ৪০ মিনিটের মতো। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে জাপানের সংস্থা জাইকা। বাকি ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার জোগান দিচ্ছে সরকার।

শেয়ার করুন
  • 8
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here