logoবাংলাদেশকে পঙ্গু করার জন্য শুধু হরতাল কর্মসূচিই যথেষ্ট। শিক্ষার চাকা, অর্থের চাকা, জীবনের চাকা—সবকিছুই থেমে যাবে। উপর্যুপরি হরতালে পিষ্ট জনজীবন-শিক্ষাজীবন। নভেম্বর-ডিসেম্বর হচ্ছে পরীক্ষার মৌসুম। অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা। চলবে ডিসেম্বর পর্যন্ত। ভর্তি পরীক্ষার্থীদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়। দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা আলোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করেন। এই তারিখ একবার পরিবর্তন করে অন্য সময়ে করা কঠিন। এতে করে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা একই দিনে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দেশের ৩৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার জন্য যদি দুই দিন করে সময় ধরা হয়, তাহলেও নভেম্বর-ডিসেম্বর মিলে এক দিনও অবশিষ্ট থাকে না। ফলে যে পরীক্ষা পিছিয়ে যাবে, তার সমন্বয় করা অসম্ভব। হরতালজনিত কারণে ভর্তি পরীক্ষা পিছিয়ে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পিছিয়ে যাবে। ভর্তি দেরি হলে সম্মান কোর্স শেষ করতে বিলম্ব হবে, চাকরি পেতে দেরি হবে, বাবার কষ্ট বেশি হবে, নিজের বিয়ে বিলম্ব হবে, পরিবারের জন্য, দেশের জন্য সেবা করা দিনের সংখ্যা কমে আসবে। বর্তমানে যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন তাঁদের অবস্থা করুণ।
একদিকে চলছে হরতাল উৎসব, অন্যদিকে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন সপ্তাহে ছুটি দুই দিন। এতে করে শিক্ষার্থীদের সেশনজট দীর্ঘ হচ্ছে। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত-বিত্তহীন ঘরের। হরতালের কারণে ক্লাস-পরীক্ষা না হলে তাঁরা যে অসহায়ের সুরে সেশনজটের কথা বলেন, সেই অসহায় মুখ দেখে স্পষ্ট পড়ে নেওয়া যায় তাঁদের কষ্টগুলো কোথায়। আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষার্থীকে চিনি যাঁদের তিন বেলা খাওয়ার সামর্থ্য নেই। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে তাঁরা হলেও উঠতে পারেননি। তাঁরা দিন হিসাব করেন, কবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট শেষ করতে পারবেন। পাঠক্রম-শিক্ষাবর্ষ যতই হিসাব করুক না কেন, তা হরতালচক্রে মিলছে না কিছুতেই। ৪ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা। হরতালকারীরদের নির্মম সিদ্ধান্তে তাদের পরীক্ষা পেছানো হলো। এক হরতাল ছাড়া আমাদের দেশের রাজনীতিবিদেরা কি আর আন্দোলন-প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কোনো উপায় রপ্ত করতে পারেননি? হরতালে রক্ষা পাচ্ছে না শিশু-পথচারী-শ্রমিক-অ্যাম্বুলেন্স—কোনো কিছুই। আমার সাবেক এক সহকর্মী ৫ তারিখ সন্ধ্যায় মারা গেছেন। তাঁদের বাড়ি জামালপুরে। ৬ তারিখ ভোরবেলা তাঁর লাশ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স বগুড়া অতিক্রম করার সময় হরতালকারীরা সামনের কাচ ভেঙেছে। একসময় গাড়িতে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করলে হরতালকারীদের হাত-পা ধরে কফিন খুলে লাশ দেখানোর পর গাড়িটি ছেড়ে দেয়। ‘বর্বর’ আর ‘অসভ্য’ এ দুটি শব্দ দিয়ে তাদের ব্যাখ্যা করা যাবে না।
২০ নভেম্বর থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, ২১ নভেম্বর থেকে ২৮ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রাথমিক-মাধ্যমিক শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা। এ ছাড়া উচ্চমাধ্যমিক এবং সম্মান স্নাতক-স্নাতকোত্তর শ্রেণীর পরীক্ষা তো রয়েছেই। শুধু প্রাথমিক সমাপনী এবং জেএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। এককথায় সারা দেশে প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর পরীক্ষা রয়েছে এই সময়ে। এই চার কোটি শিক্ষার্থী বয়সভেদে আগামী ১৫ বছর পর ৪০-৪৫ বছর দেশের সব পর্যায়ে নেতৃত্ব দেবে। সেই চার কোটি শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলার জন্য আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেই। কিন্তু তাদের শিক্ষাজীবন প্রতিকূল করে তোলার জন্য অশেষ চেষ্টা রয়েছে। পরীক্ষাকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর এমন কোনো কর্মসূচি দেওয়া উচিত নয়, যাতে করে শিক্ষার্থীজীবন ব্যাহত হয়। মাধ্যমিক পর্যায়ের সব পরীক্ষা শেষ করতে ১৪ দিনের বেশি লাগবে না। বার্ষিক পরীক্ষার আগের কয়েক দিনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। হরতালে যথাসময়ে পরীক্ষা না হলে তাদের ফল প্রকাশিত হতে বিলম্ব হবে। তখন জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে তাদের নতুন বছরের শিক্ষাকার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে না। হরতালকারীরা শিক্ষাবান্ধব হলে পরীক্ষার দিন কয়েকটি এড়িয়েও হরতাল কর্মসূচি পালন করতে পারেন।
এরই মধ্যে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ‘ও’ লেভেল, ‘এ’ লেভেল পরীক্ষা হরতালের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা হরতালের আওতামুক্ত রেখে পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে, কিন্তু জীবন কি নিরাপদ? যেখানে জড়বস্তুর ওপর দলগুলোর ক্ষোভের অন্ত নেই, সেখানে মানুষ কি করে নিরাপদে চলবে? হরতালকারীরা যাঁরা মাঠে থাকেন, তাঁদের অনেকাংশেই থাকেন ভাড়া করা। ফলে তাঁরা কি পরীক্ষার্থীদের মর্ম বুঝবেন? পথ নিরাপত্তাহীন করে পরীক্ষা চালু করে কী লাভ? নাকি ইংরেজি মাধ্যমের পরীক্ষা চালু রাখার অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে?
কারণ, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা তো সাধারণ পরিবারের কেউ নয়। বিদেশে গিয়েও পরীক্ষা দেওয়ার সামর্থ্য তাদের রয়েছে। তারা ধনিকশ্রেণীর প্রতিনিধি এবং তাদের অনেকেই বড় রাজনীতিবিদদের সন্তান। সেখানে সব দলই রয়েছে। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা হরতালের আওতামুক্ত রেখে তাঁদের সন্তানদের ফলবিপর্যয় কিংবা সময় নষ্ট করা হলো না। ২০ হাজার পরীক্ষার্থীদের সময় নষ্টের কথা যেভাবে বিবেচনা করা হলো, তার নেপথ্য কারণ যা-ই থাকুক না কেন, তাদের হরতালের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে সেটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতে চাই। শুধু ২০ হাজার শিক্ষার্থীর দিকে দৃষ্টি দিলেই হবে না, চার কোটি শিক্ষার্থীর জীবনের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এরই মধ্যে হরতালজনিত কারণে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের ফলবিপর্যয় হয়েছে। যে নতুন প্রজন্ম জাতিকে এগিয়ে নেবে, হরতাল দিয়ে তাদের জীবন বিপর্যস্ত করে রাজনীতিবিদেরা কোন বাংলাদেশ গড়তে চান?
দীর্ঘ একটি বছর প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষার সময়ের দুর্ভাবনা তাদের প্রস্তুতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই হরতাল শুধু যে পরীক্ষার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তা নয়, হরতাল চলতে থাকলে নতুন বছরের যথাসময়ে পরীক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া অসম্ভব হবে। প্রত্যেক মা-বাবাই সন্তানদের মধ্যে সাফল্যের স্বপ্ন দেখেন। সেই শিক্ষার্থীদের বিন্দুমাত্র অসুবিধা করলে নির্বাচনে তাদের সমর্থন পাওয়া যাবে না।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here