J News


বিপজ্জনক হয়ে উঠছে গ্যাস পাইপলাইন

তিতাসের বৈধ পাইপলাইনেও নানা ত্রুটি, এক বছরে ২৮২ অগ্নিদুর্ঘটনা

রাজধানী ও এর পাশের জেলাগুলোতে স্থাপিত গ্যাসের অবৈধ এবং পুরনো পাইলাইন মানুষের জীবন ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা থামছে না। শিল্প-বাণিজ্য ও গৃহস্থালীতে অবৈধ গ্যাস সংযোগ ব্যবহার এবং এই সংযোগের জন্য নিম্নমানের পাইপ ও অন্যান্য পণ্য ব্যবহারের কারণে এ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বৈধভাবে স্থাপিত বিতরণ পাইপগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করা এবং বেশী পুরনো হওয়ার ফলেও ঝুঁকি বেড়েছে।

ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটারের বৈধ বিতরণ লাইন রয়েছে সরকারি গ্যাস বিতরণকারী সংস্থা তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (টিজিটিডিসিএল)। এর বাইরে আরো প্রায় চার হাজার কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন স্থাপন করেছে দুর্বৃত্তরা। অবৈধভাবে স্থাপিত পাইপলাইন সংযোগ থেকে শুরু করে ব্যবহারের যে কোনো পর্যায়েই দুর্ঘটনার শঙ্কা তৈরি করেছে। গত দুই বছরে অবৈধভাবে স্থাপিত এমন ৩২৬ কিলোমিটার পাইপলাইন উচ্ছেদ করেছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে অবৈধভাবে প্রকাশ্যে গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন ও সংযোগের সময় কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। বৈধ লাইন থেকে অবৈধ সংযোগের কারণে গোটা গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্কই ঝুঁকিতে পড়েছে। এক বছরে অন্তত ২৮২টি অগ্নি দুর্ঘটনা এবং ৫ হাজার ১২৩টি গ্যাস লিকেজের (ছিদ্র) ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে বৈধ-অবৈধ প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার পাইপলাইনের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে মৃত্যুফাঁদ। এ ব্যাপারে সরকারকে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার আহবান জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম এন্ড মিনারেল রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ম তামিম বলেন, ‘অবৈধ গ্যাস সংযোগ শুধু মূল্যবান সম্পদ গ্যাসের অপচয়ই করছে না, মানুষের জীবনের প্রতিও ভয়ঙ্কর ঝুঁকি তৈরি করেছে। একদিকে নিম্নমানের পাইপ ও সামগ্রী ব্যবহার অন্যদিকে বৈধ পাইপলাইনে গ্যাস সঞ্চালিত অবস্থায় অবৈধ সংযোগ নেয়া, দুটোই ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষের জীবন রক্ষায় সরকারকে কঠোর হাতে এগুলো বন্ধ করতে হবে।’

তিতাস গ্যাস ঢাকা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নরসিংদী, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলায় গ্যাস সরবরাহ করছে। দেশের ৩০ লাখ গ্যাস গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ২০ লাখই এ কোম্পানির সেবা নেয়। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক সংখ্যা ১৮ লাখ ৮০ হাজার ৩৫৩। ১০ হাজার ৯১৩টি বাণিজ্যিক এবং ৪ হাজার ৫৯০টি শিল্প গ্রাহক রয়েছে। প্রায় ১৩ হাজার বিতরণ পাইপলাইনের মাধ্যমে  গ্রাহকদের সেবা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বৈধ পাইপলাইন ও সংযোগের বাইরেও বিপুলসংখ্যক অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে। টিজিটিডিসিএল’র ২০১৪ সালের এক হিসাব মতে, তখন কোম্পানির আওতাভুক্ত এলাকায় এক লাখ ৬৫ হাজার অবৈধ গ্রাহক ছিল। এর মধ্যে অনেকেই গ্যাস সংযোগ বৈধ করেছেন, আবার অনেকেই করেননি।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিতাস গ্যাসের একজন মহাব্যবস্থাপক (জিএম) জানান, বর্তমানে শিল্প, বাণিজ্যিক ও আবাসিক গ্রাহক মিলে চার লাখের বেশী অবৈধ গ্রাহক রয়েছে। চিহ্নিত ও অচিহ্নিত মিলে চার হাজার কিলোমিটারের অবৈধ বিতরণ ও সার্ভিস পাইপলাইন রয়েছে। টিজিটিডিসিএল’র আওতাভুক্ত ঢাকাসহ অন্যান্য জেলাগুলোতে এ অবৈধ পাইপলাইন উচ্ছেদ ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলাতেই প্রশাসকের সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে।

তিতাস গ্যাসের ডিজিএম (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) মো. শাহজাহান জানান, উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনায় গঠিত কমিটিগুলো কাজ শুরু করেছে। গতকাল বুধবার নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জে অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহারকারী চারটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ঐ প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- অ্যাম্বিয়েন্ট স্টিল, হারভেস্ট রিচ, হাই-টেক স্টিল এবং হিমালয় পেপার এন্ড বোর্ড মিল।

তিতাস গ্যাস সূত্র জানায়, অবৈধ গ্যাস সংযোগের পাশাপাশি পুরনো পাইপলাইন এবং সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনে ময়লা জমে বিভিন্ন সময় গ্যাস লিকেজ ও অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ধরণের দুর্ঘটনার সংখ্যাও বাড়ছে। গ্রাহক পর্যায়েও পুরনো ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। এ ধরণের দুর্ঘটনা রোধে ও অভিযোগ জানার জন্য জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ রয়েছে। দুর্ঘটনার তথ্য কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষগুলোর জরুরি ফোন নম্বরে কল করে জানানো হয়।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তিতাসের জরুরি দল ২১৬টি অগ্নিদুর্ঘটনা ও ৩ হাজার ৮১৯টি গ্যাস লিকেজের ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। পরের অর্থবছরে ২৮২টি অগ্নিদুর্ঘটনা এবং ৫ হাজার ১২৩টি গ্যাস লিকেজ মেরামত করেছে। বর্তমানেও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। গ্যাস লিকেজ ও অগ্নিকান্ডে বিপুল সংখ্যক মানুষ হতাহত হয়েছেন। গত রবিবারও রাজধানীর বংশালে একটি বাসায় গ্যাসের পাইপলাইনের আগুনে তিনজন দগ্ধ হন। গত ৫ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি ডাইং কারখানার গ্যাস পাইপে আগুন ধরে পাঁচ শ্রমিক দগ্ধ হয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে টিজিটিডিসিএল’র পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী আলী আশরাফ বলেন, অবৈধ পাইপলাইন ও গ্যাস সংযোগগুলোতেই সিংহভাগ দুর্ঘটনা ঘটে। কেননা এগুলোতে নিম্নমানের পাইপ ও সামগ্রী ব্যবহার করা হয়। কোম্পানির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী ও টহলদলগুলোও সেগুলোর লিকেজ বা অন্যান্য সমস্যা সারাতে পারে না। গ্যাসের সিস্টেম পুরনো হওয়ার কারণেও কিছু লিকেজ হয়। তবে তা মেরামতযোগ্য। তিনি আরো বলেন, অবৈধ সংযোগগুলো ভবিষ্যতে গ্যাসের বৈধ বিতরণ পাইপলাইনেরও ক্ষতি করার শঙ্কা রয়েছে। তবে আশার কথা, অবৈধ পাইপলাইন ও সংযোগ উচ্ছেদ-বিচ্ছিন্ন করতে জেলা প্রশাসক, উপজেলা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে অভিযান শুরু হয়েছে। এতে একদিকে অবৈধ সংযোগ  যেমন বিচ্ছিন্ন হবে অন্যদিকে ঝুঁকিও কমবে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here