pm2news

সেই দরবার হলে ছয় বছর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত হলেন। দরবার হলে উপস্থিত বিজিবি সদস্যদের অভাব-অভিযোগের কথা শুনলেন প্রধানমন্ত্রী। এই দরবার হলে ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহে অন্তত ৩৫ সেনা কর্মকর্তা নির্মমভাবে নিহত হন। ইতিহাসের সেই কালো অধ্যায়ের পর শনিবার বিজিবি দিবস উপলক্ষে রাজধানীর পিলখানায় বাহিনীর সদর দফতরের সেই দরবার হলেই (বীর উত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তন) অংশ নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রথমে স্বাগত বক্তব্য দেন বিজিবি’র মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ। এরপর প্রধান অতিথির ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবার প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন করার সুযোগ মেলে সাধারণ বিজিবি সদস্যদের। একজন করে বেশ কয়েকজন সদস্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিজেদের নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেন। নিজেদের চাওয়া ও নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীও আন্তরিকতার সঙ্গে সবার কথা শোনেন এবং উত্তর দেন। ঘণ্টাখানেক দরবারে অবস্থানের পর প্রধানমন্ত্রী পিলখানা ত্যাগ করেন।

এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী পিলখানায় বিজিবি দিবস উপলক্ষে বীর উত্তম আনোয়ার হোসেন প্যারেড গ্রাউন্ডে অভিবাদন গ্রহণ ও আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রী পিলখানার বীর উত্তম আনোয়ার হোসেন প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছালে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং বিজিবি’র মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ তাকে স্বাগত জানান। অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রীকে বিজিবি’র পক্ষ থেকে সশস্ত্র সালাম জানানো হয়। এসময় জাতীয় সংগীত বাজায় বিজিবি’র বাদক দল। এরপর তিনি খোলা গাড়িতে করে গার্ড পরিদর্শন করেন।

মুক্তিযুদ্ধে তত্কালীন সীমান্তরক্ষী এই বাহিনীর (ইপিআর) সাহসী ও গৌরবময় ভূমিকার কথা তুলে ধরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, এই বাহিনী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ইপিআরের বেতার যন্ত্রের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘এই সেই পিলখানা। এখান থেকে স্বাধীনতার বার্তা সারা বাংলাদেশে পৌঁছে যায়। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করায় ইপিআরের সুবেদার মেজর শওকত আলীসহ চার সদস্যকে গ্রেফতারের পর পাক-হানাদার বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে।’

তিনি বলেন, ‘তত্কালীন ইপিআরের ১২ হাজার বাঙালি সদস্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। এর মধ্যে যুদ্ধে ৮১৭জন জীবন উত্সর্গ করেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য এই বাহিনীর দু’জন বীরশ্রেষ্ঠ, আটজন বীর উত্তম, ৩২ জন বীর বিক্রম এবং ৭৭ জন বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছেন। সমগ্র দেশবাসীর সঙ্গে আমি তাদের এ আত্মত্যাগ গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।’

সীমান্তে দায়িত্ব পালনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিজিবির কার্যক্রমের প্রশংসা করে শেখ হাসিনা বলেন, চোরাচালান, মাদক পাচার এবং নারী ও শিশু পাচারসহ সীমান্ত অপরাধ অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। এই সাফল্যের ধারা আরো বৃদ্ধি পাবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

তিনি বলেন, সীমান্ত রক্ষায় এই বাহিনীর সদস্যদের আরো সজাগ থাকতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিজিবির সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দশম জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় বিজিবির সাহসি ভূমিকা উল্লেখ করে তিনি সহিংসতা মোকাবেলা করতে গিয়ে বিজিবির একজন নায়েক সুবেদার এবং দুজন সিপাহী মারা যাওয়ার কথা ও তাদের এই আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্রোহের মর্মান্তিক ঘটনার পর এ বাহিনীর শৃঙ্খলা নিশ্চিত এবং একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আইন-২০১০’ প্রণয়ন করেছে। পোশাক পরিবর্তন করা হয়। এছাড়া ব্যাপক সংস্কার ও উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বিজিবির নতুন সাংগঠনিক কাঠামো ও জনবল অনুমোদন এবং পদবী কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। বাহিনীর কার্যক্রমে গতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য চারটি রিজিয়ন সদর দফতর স্থাপনের মাধ্যমে কমান্ড বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। অনুমোদিত নতুন চারটি সেক্টর ও ১৫টি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের কাজ চলছে। বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থাকে শক্তিশালী করতে ‘বর্ডার সিকিউরিটি ব্যুরো’ স্থাপন করা হয়েছে। বাহিনীর নিজস্ব র্যাঙ্ক-ব্যাজ প্রবর্তন করে বিজিবির স্বকীয়তা, সৌকর্য ও আস্থাকে সমুন্নত করা হয়েছে। সীমান্তে বিজিবির অপারেশনাল কার্যক্রম আরো জোরদার করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বিজিবি সদস্যদের ৩০ শতাংশ সীমান্ত ভাতা, রেশন, বাসস্থান এবং সদস্যসহ তাদের পরিবারের চিকিত্সা সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। পদোন্নতিযোগ্য সদস্যদের পদোন্নতির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিজিবি দিবসের অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ মন্ত্রিসভার সদস্য ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্ব

প্রধানমন্ত্রীর কাছে দরবার হলে প্রথমেই প্রশ্ন করেন পিলখানা সদর দফতরে কর্মরত নায়েব সুবেদার রাজু আহমেদ। তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে বলেন, অন্য বাহিনীর সদস্যদের জাতিসংঘের শান্তি মিশনে নেয়া হলেও বিজিবি থেকে নেয়া হয় না। তাই বিজিবি সদস্যদের জাতিসংঘ শান্তি মিশনে পাঠানোর কোনো উদ্যোগ আছে কিনা ? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি তিনিও চিন্তা করেছেন। কিভাবে শান্তি মিশনে বিজিবিকে অংশ গ্রহণ করানো যায় সে ব্যাপারে তিনি উদ্যোগ নেবেন। তবে এগুলো সময় সাপেক্ষ ও আলাপ আলোচনার বিষয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দ্বিতীয় প্রশ্ন করেন ল্যান্স নায়েক মিজানুর রহমান। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘অর্জিত ছুটি বাড়িয়ে দুই মাস করায় আপনার কাছে বিজিবি সদস্যরা চিরকৃতজ্ঞ। তবে আমার প্রস্তাব হচ্ছে-বছরে যে কোনো সময়ে একসঙ্গে প্রয়োজন পড়লে যে কাউকে তিন মাসের আগাম বেতন দেয়া যায় কিনা যাতে একসঙ্গে পাওয়া টাকা সংসারের বড় কোনো কাজে লাগানো যায়।’ এর জবাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী উল্টো প্রশ্ন করেন, একসঙ্গে তিন মাসের বেতনের টাকা নিয়ে কাজে লাগালে পরের সেই তিন মাস কিভাবে সংসার চালাবেন? আরো বেশ কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন করলে তিনি সেগুলোর উত্তর দেন।

দ্রুত কম্বল বিতরণের নির্দেশ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের শীতকবলিত এলাকার মানুষের মাঝে ৬০ বছরের বেশি বয়সের বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধী ও এতিমদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত কম্বল বিতরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় সারাদেশের শীতার্ত মানুষের মাঝে বিতরণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ১৯টি বেসরকারি ব্যাংকের সংগঠন বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ব্যাংকস-এর (বিএবি) দেয়া ৩ লাখ ৭০ হাজার পিস কম্বল গ্রহণের পর তিনি এই নির্দেশ দেন।

 নিজ নিজ ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালকরা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে শেখ হাসিনার কাছে এসব কম্বল হস্তান্তর করেন।

কম্বল গ্রহণকালে তাদের এই মহতী কাজের জন্য প্রধানমন্ত্রী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান এবং পাশাপাশি তিনি শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমাজের বিত্তবানদের প্রতিও আহবান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দান করলে গরিব ও অসহায় মানুষ উপকৃত হবে।

শেখ হাসিনা সারাদেশের শীতার্ত মানুষের মাঝে এসব কম্বল দ্রুত পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।

 বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ব্যাংকস-এর সভাপতি ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার পরিচালিত অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here