Falg_of_Bangladesh_Awami_League
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না- এমনটি নিশ্চিত হলেই প্রধান বিরোধী দলের ওপর শুরু হবে আরো বেশি দমন-পীড়ন। বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ‘অ্যাকশনে’ যাবে সরকার। অ্যাকশনের মধ্যে থাকবে হামলা-মামলা ও গ্রেপ্তার। জানা গেছে, সরকার বিএনপির প্রভাবশালী প্রায় একডজন নেতাকে কড়া নজরদারির মধ্যে রেখেছে। কারণ, সরকারের গোয়েন্দা তথ্যমতে, একতরফা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণামাত্র বিএনপি নেতারা দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা চালাবেন। এমনকি একটি সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য মিললে তাঁকে পর্যন্ত আইনের মুখোমুখি দাঁড় করাতে দ্বিধা করবে না সরকার।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে এ ধরনের একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে। মূলত নির্বাচনকে নির্বিঘ্ন করতেই সরকারি দলের এই পরিকল্পনা। তবে বিএনপির অবস্থানের ওপরই নির্ভর করছে এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন।

আওয়ামী লীগের কয়েকজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তাঁদের কাছে তথ্য আছে, বিএনপি নির্বাচনে না এলে যেকোনো মূল্যে নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টা করবে। এরই মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সেই ঘোষণাও দিয়েছেন। তাই দশম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। এ জন্য শুধু হামলা-মামলাই নয়, যা যা করণীয় তার সবই করবে সরকার।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, যেকোনো বৈরী পরিবেশ মোকাবিলা করে নির্বাচন সম্পন্ন করতে সরকার ও আওয়ামী লীগ বদ্ধপরিকর।

সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘আমরা নির্বাচন করব, নির্বাচনের পথে আছি। আশা করি বিএনপিও নির্বাচন করবে। তবে নির্বাচন বর্জন করে বাধার সৃষ্টি করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তিনি আরো বলেন, আগে দেখি তারা (বিএনপি) কী করে।’

সরকারদলীয় সূত্রগুলো আরো জানায়, বিএনপি নির্বাচনে না এলে তারা যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নির্বাচন বানচাল করতে চাইবে- এমন তথ্য সরকারের কাছেও রয়েছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে সরকার পূর্বপ্রস্তুতিও গ্রহণ করছে। এ ক্ষেত্রে সম্প্রতি আটক পাঁচ শীর্ষ নেতাই শুধু নয়, বিরোধী দলের আরো প্রভাবশালী নেতাদের গ্রেপ্তার করার বড় পরিকল্পনা রয়েছে। জানা গেছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে লিপ্ত রয়েছে- এমন নেতাদের গ্রেপ্তার করা হবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই। কারণ, আওয়ামী লীগ মনে করছে, তফসিল ঘোষণার পরপরই বিএনপি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে। আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল এক নেতা কালের কণ্ঠকে জানান, বিএনপির প্রায় একডজন প্রভাবশালী নেতার গতিবিধি সবসময় নজরদারি করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, সাংবিধানিক ধারা বজায় রাখতে হলে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। সরকার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রক্ষা করতে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর। তাই নির্বাচনের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এমন যেকোনো শক্তিকে প্রচলিত আইনে মোকাবিলা করা হবে। সর্বশক্তি দিয়ে সে বাধা অতিক্রম করা হবে।

বিএনপি নির্বাচনে না গিয়ে বানচালের ষড়যন্ত্র করলে তা প্রতিহত করতে ক্ষমতাসীন দলের বড় পরিকল্পনার কথা স্বীকার করে দলের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, এ ক্ষেত্রে যত বড় শক্তিই আসুক না কেন, পরাস্ত করা হবে। তিনি বলেন, নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র যদি খালেদা জিয়াও করেন এবং সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তাহলে তাঁকেও ছাড় দেওয়া হবে না। আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে।

জানা গেছে বিএনপিকে বাদ দিয়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পথে ক্ষমতাসীনরা এগিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে আপত্তি নেই সরকারি দলের। এ ক্ষেত্রে আলাপ-আলোচনার টেবিলে এসে দরকষাকষির মাধ্যমে বিএনপিকে বড় ছাড় দিতেও প্রস্তুত রয়েছে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের সম্পাদকমণ্ডলীর এক নেতা বলেন, শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে বলেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব চান না, দেশের জনগণের শান্তি চান। বিএনপিকে কতটুকু ছাড় দিতে চায় আওয়ামী লীগ তারই বহিঃপ্রকাশ শেখ হাসিনার এ বক্তব্য। তবে সেটা তাদের আদায় করে নিতে হবে।

শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ নিজে থেকে ছাড় দিয়ে বিএনপির দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করতে চায় না। এর পক্ষে যুক্তি দাঁড় করিয়ে ওই সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সাংবিধানিক পথে হাঁটছে। বিএনপি অসাংবিধানিক দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে। তাই আলোচনা ছাড়াই বিরোধী দলের দাবি মেনে নিতে হবে এমন দেউলিয়া দলে পরিণত হয়নি আওয়ামী লীগ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানের পথ এখনো খোলা আছে। আশা করি, বিএনপি হরতাল কর্মসূচি বাদ দিয়ে আলোচনার পথে আসবে। সংবিধানের ভেতরে থেকে গ্রহণযোগ্য একটি সমাধান আসবে। সে ক্ষেত্রে অনেক ছাড় দেওয়ার মানসিকতা রয়েছে আওয়ামী লীগের। নির্বাচনে না এসে সেটা ঠোকানোর কোনো পরিকল্পনায় সফল হতে পারবে না বিএনপি। সরকার সেটা মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

ভারতের তাগিদ প্রসঙ্গে : এদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার বিভেদ দূর করতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশ এবং চীন-জাপানের পর বাংলাদেশের বড় দুই দলকে সংলাপে বসার তাগিদ দিয়েছে ভারত। তবে ভারতীয় দূতাবাস থেকে পাঠানো বিবৃতির মাধ্যমে দেওয়া এ তাগিদে উদ্বিগ্ন নয় আওয়ামী লীগ। একে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে ক্ষমতাসীনরা।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। আমরাও শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই।’ তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ মানেই হচ্ছে সাংবিধানিক ও জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনের সমাধান। আশা করছি, বিরোধী দল এ সত্যকে অনুধাবন করে শান্তিপূর্ণ সমাধানে আসবে। তিনি বলেন, ‘আমরা সমঝোতার পথে আছি। সংঘাত-সংঘর্ষ চায় বিএনপি। নির্বাচনও বানচাল করতে চায় তারা। বিএনপি ও আমাদের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। তারা অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতায় আসতে চায়। সংবিধান মানতে চায় না। আমরা সংবিধান মেনে সামনে এগিয়ে যেতে চাই। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান হোক, তা চাই।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, ‘ভারত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, আমাদের প্রতিবেশী। তারা চাইতেই পারে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এ দেশে নির্বাচন হোক, যেটা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও চান।’ ভারতের সংলাপের তাগিদ দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরাই তো সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছি। বিরোধীদলীয় নেতা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। এখন খালেদা জিয়া প্রস্তাব দিক সংলাপে বসার, তারপর দেখা যাক কী করা যায়।’

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here