■ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

গত সোমবার আমার লেখায় (অন্য দৈনিকে প্রকাশিত) আশা প্রকাশ করেছিলাম, এবারের সংসদ অধিবেশনে বিরোধী দল যোগ দেবে বলে যখন ঘোষণা দিয়েছে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে আলোচনার মুলতবি প্রস্তাব দিয়েছে, তখন এই অধিবেশন ব্যতিক্রম ঘটাবে। অর্থাৎ বিরোধী দলের উপস্থিতিতে সংসদ জীবন্ত হবে, চাই কি দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনাক্রমে নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতির প্রশ্নে একটা সমঝোতার দুয়ারও খুলে যেতে পারে।
সোমবার রাতেই জানতে পারলাম, আমার এবং আমার মতো দেশের অসংখ্য মানুষের আশা পূর্ণ হয়নি। সংসদে বসতে না বসতেই বিরোধী বিএনপি দলের ওয়াক আউট। কেবল ওয়াক আউট হলে ক্ষতি ছিল না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে আলোচনার জন্য তারা যে মুলতবি প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তাও প্রত্যাহার করেছেন। প্রধানমন্ত্রী সংসদে এসে এ সম্পর্কে তাদের প্রস্তাব জানানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন, সে আহ্বান তারা প্রকারান্তরে প্রত্যাখ্যান করলেন।
এখন প্রশ্ন, এত ঢাকঢোল পিটিয়ে বিরোধী দল যখন সংসদে এলই, তখন এক দরোজা দিয়ে ঢুকে পরক্ষণেই আরেক দরোজা দিয়ে বের হয়ে যাওয়া কেন? এমনকি মুলতবি প্রস্তাবটিও প্রত্যাহার করা কেন? এরপর তাঁরা আবার অনির্দিষ্টকালের জন্য সংসদ বর্জন অব্যাহত রাখবেন, না এবারের অধিবেশনে বার বার ওয়াক আউটের খেলা খেলবেন? তাহলে এটা কি সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন না করে বেতন ভাতা নেয়ার একটা বাহানা নয়? এটা আইন বদল না হওয়া পর্যন্ত বৈধ হলেও নৈতিকতা সঙ্গত কি? আমাদের সূক্ষ্মবুদ্ধির ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এ সম্পর্কে কি বলেন?
আমার জানা মতে, বিএনপির অধিকাংশ সংসদ (যারা তাদের নির্বাচক ম-লীর আস্থা ভোগ করেন) যে কোন সরকার পদ্ধতিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক। এ এমনকি সংসদে হাজির হয়ে তাদের এলাকাবাসীর প্রতিনিধিত্ব করতেও আগ্রহী। কিন্তু তারা পড়ে গেছেন গ্যাঁড়াকলে। সিন্দবাদের দৈত্যের মতো যে পরিবারতন্ত্র দলের নেতৃত্বে জাঁকিয়ে বসেছে, তার কবল থেকে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের কোন কিছু করার উপায় নেই।
এই বিএনপিদলীয় শুভবুদ্ধির সংসদ সদস্যরা জানেন, দলের বর্তমান নেতৃত্ব দেশের বা দলের স্বার্থে নয়, নিজেদের পারিবারিক স্বার্থে রাজনীতিতে এমন অবস্থা নিয়েছে, যা দেশের দশের এবং দলের জন্যও গুরুতর ক্ষতিকর। বিএনপি নেত্রীর একমাত্র উদ্দেশ্য, তার দুই দুর্বৃত্ত পুত্রকে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের গুরুতর অভিযোগে শাস্তি পাওয়া থেকে রক্ষা করা এবং ক্ষমতায় বসানো। অন্যদিকে বিএনপির মিত্রদল জামায়াতের মূল উদ্দেশ্য একাত্তরের যুদ্ধাপরধীদের বিচার ঠেকানে এবং বাংলাদেশকে আবার দ্বিতীয় পাকিস্তানে পরিণত করা। এ দুই অশুভ উদ্দেশ্যই বিএনপি ও জামায়াত এই দু’দলকে মৈত্রীর বন্ধনে বেঁধে রেখেছে এবং দেশের রাজনীতি সন্ত্রাস ও সঙ্কট মুক্ত হতে পারছে না।
এসব কথা জেনেও বিএনপির সচেতন নেতাকর্মী ও সংসদ সদস্যরা কেন বিদ্রোহী হচ্ছেন না বা দলের নেতৃত্ব বদলের চেষ্টা করছেন না? আমি কিছু মাঝারি পর্যায়ের বিএনপি নেতা এবং দু’একজন সংসদ সদস্যকে এই প্রশ্ন করেছি। তারা বলেছেন, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও কর্নেল অলির দলত্যাগ এবং নতুন দল গঠনের ব্যর্থতা দেখে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে কোন সাহসী নেতা না থাকায় তারা কিছু করতে পারেননি এবং পারছেন না।
আমার ধারণা, ডা. বি চৌধুরী ও কর্নেল অলির রাজনৈতিক ব্যর্থতার মূল কারণ, তারা বিএনপির নীতি বদলের চেষ্টা করেননি। দলের গণবিরোধী মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী নীতিগুলো অব্যাহত রেখে নিজেদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। তারেক রহমানের অর্থ ও মাসল শক্তি ও দুষ্টবুদ্ধির সঙ্গে তারা পেরে ওঠেননি। পেরে ওঠার মতো সাহস ও নেতৃত্বগুণও তাঁরা দেখাতে পারেননি।
দল ত্যাগ করার পর ডা. বি চৌধুরী ও কর্নেল অলি দু’জনেই নতুন দল গঠন করেছেন, কিন্তু দেশবাসীর সামনে কোন নতুন কর্মসূচী তুলে ধরতে পারেননি। তাঁরা জিয়ার আদর্শ ও রাজনীতি অনুসরণ করবেন এ ঘোষণা দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, তারা জিয়া পরিবারের চাইতেও বড় জিয়াপন্থী। অর্থাৎ ‘সড়ৎব পধঃযড়ষরপ ঃযবহ ঃযব ভড়ৎব’ ঠিক একই কাজটা পরে করতে চেয়েছিলেন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, বিএনপি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন দল গঠন করে। তাদের কারও চেষ্টাই সফল হয়নি।
এখন ব্যর্থতার সব গ্লানি বহন করে, সব অপমান, অবমাননা হজম করে তারা ‘গোয়ালের গরু আবার গোয়ালে ফেরার’ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিএনপির সংসদ এড়িয়ে চলা, নির্বাচনীকালীন সরকার পদ্ধতি সম্পর্কে একটা সমঝোতায় পৌঁছার ব্যাপারে আগ্রহ না দেখানো, জামায়তের সঙ্গে ক্ষতিকর এলায়েন্স অব্যাহত রাখা, একের পর এক ব্যর্থ হরতাল ডাকা ইত্যাদির পেছনে কি স্ট্রাটেজি কাজ করছে আমি জানি না। বর্তমান সংসদের আয়ুষ্কালের মধ্যে যদি সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কোন সমঝোতা না হয়, তাহলে বিরোধী দল কি করবেন? সংসদের বর্তমান অধিবেশন মাত্র শুরু হয়েছে। প্রথম দিনের অধিবেশনে বিএনপি ওয়ার্ক আউট করলেও পরবর্তী অধিবেশনগুলোতে তাদের ভূমিকা দেখেই বোঝা যাবে, তাঁরা কি সমঝোতায়, না আবার সংঘাতের পথে এগুবেন? এই অধিবেশনগুলোতে তারা থাকবেন বলেছেন।
তাদের মতিগতি আরও স্পষ্টভাবে হয়ত বোঝা যাবে, চারটি সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচনের পর। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা সুবিধা করতে না পারলে বিএনপি হাইকমান্ড হয়ত আশা করবে, সাধারণ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ সুবিধা করতে পারবে না, সুতরাং তাঁরা নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী হতে পারেন। আর সিটি কর্পোরেশনগুলোর মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সাফল্য দেখালে নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যায় না ইত্যাদি ধুয়া তুলে নির্বাচন বর্জনের পথত খোলা রইলই।
আমার ইনটিউশন বলে, বিএনপি বর্তমান সরকারের আয়ুষ্কাল পর্যন্ত দরকষাকষির খেলা খেলবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আসবে। নির্বাচনে না গিয়ে সংঘাতের পথে গেলে, নির্বাচন বানচালের জন্য হেফাজতী ধরনের তা-ব সৃষ্টি করতে চাইলে তা সফল হবে না। তাদের ‘গোঁদা পায়ের লাথির’ শক্তি সরকার আন্দাজ করে ফেলেছে। নির্বাচন বয়কট বা বানচাল করতে গেলে বিএনপি অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়বে। আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন বন্ধ করার জন্য কোন অশুভ শক্তির ক্ষমতা দখলের পথ সুগম করে দিতে চাইলে সেই শক্তি বিএনপির জন্যও বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এক এগারো থেকে বিএনপির শিক্ষা নেয়া উচিত।
বিএনপি যদি নির্বাচনে যেতে না চাইবে, তাহলে ডা. বি চৌধুরী, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, কর্নেল ওলি (তিনি এখনও প্রকাশ্যে কিছু বলেননি, আভাস ইঙ্গিত দিচ্ছেন), কেন বিএনপিতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত জানাচ্ছেন? এমনকি রঙ্গবীর (বঙ্গবীরের বদলে রঙ্গবীর এই খেতাবটি তাকে এখন মানায়) কাদের সিদ্দিকী পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে গামছা বন্ধনে আবদ্ধ হতে চাইবেন?
বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ঢাকায় এক সাংবাদিক বন্ধু আমাকে জানিয়েছেন, ডা. বি চৌধুরী প্রমুখ দলছুট নেতাদের দলে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে একটা কারণ আছে। তারেক রহমানের দ্বারা অপমানিত হয়ে এরা দলত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। এখন বিদেশে পলাতক তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের সাহায্যে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ায় এ দলছুট নেতাদের আশা, তারেক দলের আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বে এখন ফিরে আসতে পারবেন না। ফলে বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানের অসহায় অবস্থা থেকে উদ্ধার লাভের জন্য তাদের দলে ফিরিয়ে নিতে এবং গুরুত্ব দিতে বাধ্য হবেন। তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে তারাই আবার হবেন খালেদা জিয়ার প্রধান পার্শ্বচর।
কিন্তু তারেক রহমান যদি দেশে ফিরে আসতে পারেন এবং নানা কৌশলে ২০০১ সালের মতো আবার নির্বাচন জয়ী হতে পারেন, তাহলে? সাংবাদিক বন্ধু এই প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, তাহলেও তাদের অসুবিধা নেই। তারেক রহমান যদি উজিরে আজম হন, তাহলে তারা তার অনুগ্রহে উজির হতে পারবেন ভাবছেন। নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জামায়াত হারানোর চেয়ে তারেকের উজির হওয়া তারা সম্ভবত বেশি সম্মানজনক ভাবছেন। কিন্তু বিএনপি যদি নির্বাচনে না গিয়ে সন্ত্রাস ও সংঘাতের পথে যায়? তাহলে এসব নেতা কি সেই সংঘাত ও সংঘর্ষে নিজেদের জড়াবেন? দলের নেত্রীর পারিবারিক স্বার্থ উদ্ধারের কাজে নিজেদের আবার বিতর্কিত করবেন, সুনাম হারাবেন? আমার এ প্রশ্নটির জবাব ঢাকার সাংবাদিক বন্ধু দেননি।
চারদিকের নানা ষড়যন্ত্র ও হামলার মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভালই খেলেছেন। তার ক্লাইমেক্স ঘটেছে ৫ম তারিখে। ওই দিনটাতেই ছিল তার মাস্টার স্ট্রোক। আল্টিমেটামের ৪৮ ঘণ্টা শেষ হলেই বেগম জিয়া নতুন শাড়ি পরে বঙ্গভবনে ছুটবেন এটাই ছিল কর্মসূচী। তা অত্যন্ত করুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এখন বিএনপির কৌশল পরিবর্তিত হয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে নতুন নতুন ফ্রন্ট গড়ে উঠছে। একদিকে বিএনপি-জামায়াত-হেফাজত-শিবির, অন্যদিকে বৃহৎ এনজিও গোষ্ঠীর সমর্থন ও সাহায্যপুষ্ট সুশীল সমাজ তারা ড. কামাল হোসেন ও ড. ইউনূসকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর নতুন একজন কারজাই খুঁজছেন।
এক্ষেত্রে শেখ হাসিনা তার মহাজোট নিয়ে কি পারবেন এই একাধিক ফ্রন্টের ষড়যন্ত্র ও হামলা সামলাতে? এ পর্যন্ত প্রতিটি সঙ্কটে তিনি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ম্যাচ্যুরিটির পরিচয় দিয়েছেন। ভবিষ্যতেও তাকে সেই পরিচয় দেখাতে হবে। শেখ হাসিনা এখন আর শুধু এক ব্যক্তি বা নেত্রী নন; ভাল-মন্দ মিশিয়ে তিনি চারদিক থেকে আক্রান্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ঘাঁটির শেষ রক্ষাব্যূহ। এই সত্যটি দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

লন্ডন : ৪ জুন, মঙ্গলবার, ২০১৩।

(দৈনিক জনকণ্ঠ)

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here