image_85436
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর রায়েরবাগে একটি যাত্রীবাহী বাসে গান পাউডার দিয়ে হরতাল সমর্থনকারীরা আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে এক ছাত্রীসহ ৮ যাত্রী পুড়ে যায়। তাদের দেহের বেশির ভাগ অংশ ঝলসে গেছে। তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া বিরোধী দলের তিন হরতালে রাজধানীসহ সারাদেশে যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয়ার ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষ দগ্ধ হয় এবং ২ জন মারা যায়। বর্তমানে উক্ত ৮ বাস যাত্রী নিয়ে ২৫ জন অগ্নিদগ্ধ বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন। গতকাল সরেজমিনে তাদের সঙ্গে ইত্তেফাকের এ প্রতিনিধি আলাপ করেন। তারা আগুনে পুড়ে যাওয়ার ঘটনা এবং দগ্ধ হওয়ার দুঃসহ যন্ত্রণার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। পুরো বার্ন ইউনিট জুড়ে ছিল দগ্ধরোগী আর স্বজনদের আহাজারিতে শোক বিহ্বল পরিবেশ।

গতকাল অগ্নিদগ্ধ ৮ জন হচ্ছেন- ইডেন কলেজের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অনার্সের ছাত্রী রাবেয়া সুলতানা (২৪), ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মচারী আব্দুল মান্নান (৩৪), ফেরি করে ফুল বিক্রেতা আব্দুর রহিম (২৮), রাজমিস্ত্রি আবুল কালাম (৪৫), প্রকৌশলী শুভ (২৬), আবু বকর (৩৬), প্রকৌশলী আব্দুল হাই (৪৫) ও তেজগাঁও পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের ছাত্র তারেক (১৯)। মৃত ব্যাক্তিরা হচ্ছেন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল (৩৫) ও পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র মনির (১৩)।

প্রখ্যাত পোড়া বিশেষজ্ঞ ডাঃ শামন্ত লাল সেন বলেন, চাকরি এখন শেষ প্রান্তে। এত বছর পোড়া রোগীদের চিকিত্সা সেবা দিয়ে কেটে গেল। গত কয়েকটি হরতালে যে বিপুল সংখ্যক পোড়া নারী-পুরুষ ও শিশু এসেছে অতীতে কখনও হরতালে এত সংখ্যক পোড়া রোগী আসেনি। পেট্রোল বোমা তৈরিতে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় ক্ষমতাসম্পন্ন কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অপরদিকে গান পাউডার ছিটিয়ে দেয়ার পর যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এভাবে হরতালে আগুনে পোড়া রোগী আসছে। শরীর পোড়ার সঙ্গে খাদ্যনালীও পুড়ে যায়। গতকাল ৮ জনসহ চিকিত্সাধীন ২৫ জন পোড়া রোগীর অবস্থা আশংকাজনক। বার্ন ইউনিটের চিকিত্সকরা সুচিকিত্সা দিয়ে তাদের সুস্থ করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে তিনি জানান।

গতকাল প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ও উক্ত চিকিত্সাধীন পোড়া রোগীদের দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তাদের কারো মুখমণ্ডল, দুই হাত, দুই পা ও বুক ঝলসে গেছে এবং কারো সমস্ত দেহ ঝলসে গেছে। তাদের এ দুঃসহ দৃশ্য দেখে স্ত্রী, সন্তান, পিতা-মাতা ও স্বজনরা শয্যার পাশে শুধু চোখের পানি ফেলছেন।

রায়েরবাগে আগুনের ঘটনায় অগ্নিদগ্ধরা জানান, গতকাল অগ্নিদগ্ধদের কেউ কেউ গুলিস্তান থেকে কোমল পরিবহনের একটি বাসে করে সিদ্ধিরগঞ্জ-আদমজীর বাসে উঠেন। কেউ শনির আখড়া ও রায়েরবাগ থেকে ওই বাসে উঠেন। তাদের বাসটি রায়েরবাগ যাওয়ার পর পিছন থেকে হঠাত্ আগুন আগুন বলে চিত্কার দেয় কয়েক যাত্রী। মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়ে বাসে। যে যেভাবে লাফিয়ে পড়ে আত্মরক্ষা করেন। বাস থেকে নামতে নামতে ৮ জন যাত্রীর দেহের বেশিরভাগ ঝলসে যায়। স্থানীয় লোকজন তাদের প্রথমে পানি দিয়ে দেহের আগুন নেভান। পরে তাদের দ্রুত বার্ন ইউনিটে নিয়ে যান।

৮ যাত্রী জানান, চোখের পলকে অর্থাত্ বিদ্যুতের গতিতে দ্রুত বাসটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গান পাউডার দিয়ে আগুন দিলে এত দ্রুত ছড়ায়। ইডেন কলেজের মেধাবী ছাত্রী রাবেয়া সরকারি প্রাইমারি স্কুলে ইতিমধ্যে নিয়োগ পেয়েছেন। সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার কর্মস্থলে যোগদান করার উদ্দেশ্যে নিয়োগপত্র নিয়ে উক্ত বাসযোগে রওয়ানা হন। তাদের বাসা সিদ্ধিরগঞ্জ মৌচাক এলাকায়। গতকাল বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকবেন এবং বুধবার চাকরিতে যোগদানের কথা ছিল বলে রাবেয়া জানান।

এছাড়া বার্ন ইউনিটে হরতালে নৃশংসতায় আগুনে পুড়ে চিকিত্সাধীন রয়েছে শিশু সুমি (৮) ও তার দাদী রহিমা বেগম (৬০), বাস হেলপার মোঃ রনি (১৩), ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির পিয়ন আব্দুর রাজ্জাক মিঠু (২০), মাইক্রোবাস চালক হারুন অর রশীদ (৩২), লেগুনা গাড়ির হেলপার মিলন (১৩), কাভার্ড ভ্যান চালক রোকনুজ্জামান (৩০), দর্জি দোকানের শ্রমিক কামাল হোসেন (৩৫), মিলস শ্রমিক শ্রী মুক্তা রায় (৩০), দিনমজুর নাসিম (৩৫), স্বর্ণকার মন্টু পাল (৩০) (৯৫ ভাগ পোড়া), সিএনজি চালক আশাদুজ্জামান আশাদ (২৮), খবির উদ্দিন (৪৫), গার্মেন্টসের পুরাতন মেশিন মেরামতকারী সাগর মাহমুদ (২৩), লেগুনা গাড়ির হেলপার আল আমিন (২০), পিকআপ হেলপার সুমন (১৮) ও পঙ্গু ওয়াহিদুল ইসলাম (৩৫)। এরা সুস্থ হলে কারো কারো পরবর্তীতে প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজন হবে। এটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিত্সা। যা তাদের সাধ্যের বাইরে বলে জানান বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা। অনেককে পঙ্গুত্বের মত অভিশপ্ত জীবন নিয়ে বেঁচে থাকতে হতে পারে বলে চিকিত্সকরা জানিয়েছেন।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here