kibria 1news

দীর্ঘ ৯ বছর পর সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলার তৃতীয় দফা সম্পূরক অভিযোগপত্র (চার্জশিট) গৃহীত হয়েছে। শুনানি শেষে গতকাল রবিবার হবিগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রশীদ আহমেদ মিলনের আদালতে অভিযোগপত্রটি গৃহীত হয়। শুনানিকালে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগপত্রের ত্রুটি তুলে ধরা ছাড়াও এ মামলায় ২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে আটক দেখানো আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা লুত্ফুজ্জামান বাবরের জামিন আবেদন করেন। মামলার বাদী হবিগঞ্জ-২ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ খানসহ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগপত্র গ্রহণের পক্ষে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ও লুত্ফুজ্জামান বাবরের জামিন আবেদন নাকচ করেন। এই অভিযোগপত্র গ্রহণের মধ্য দিয়ে মামলায় মোট ৩২ জন আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হলো।

উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে অন্যরা হলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জের পৌর মেয়র ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জিকে গউছ প্রমুখ। আদালতে হাজির না হওয়ায় হারিছ চৌধুরী, আরিফুল হক চৌধুরী ও জিকে গউছকে পলাতক হিসেবে গণ্য করে তাদের বিরুদ্ধেও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত।

উল্লেখ্য, গত ৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি সিলেট জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মেহেরুন নেছা পারুল দাখিলকৃত দ্বিতীয় দফা সম্পূরক অভিযোগপত্রে আরিফুল হক চৌধুরীর নাম এবং জিকে গউছের ঠিকানা ভুল থাকায় আদালত তা সংশোধন করে আবার সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় গতকালের অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। দ্বিতীয় দফায় দেয়া সম্পূরক অভিযোগপত্রে মোট ৩৫ জনকে আসামি করা হয়েছিল। এর মধ্যে হারিছ চৌধুরী, আরিফুল হক চৌধুরী ও জিকে গউছসহ ১১ জন নতুন আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এতে তিন জনকে অভিযোগপত্র থেকে অব্যাহিত দেয়ার আবেদন করা হয়।

এর আগে প্রথম অভিযোগপত্রে ১০ জন এবং দ্বিতীয় দফার অভিযোগপত্রে (প্রথম সম্পূরক) লুত্ফুজ্জামান বাবর, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান ও পাকিস্তানি নাগরিক আব্দুল মজিদ বাট ওরফে ইউসুফ বাটসহ ১৪ জনকে আসামি করা হয়। নাম উল্লেখিত তিনজনই বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। প্রথম অভিযোগপত্রে উল্লেখিত ১০ আসামির মধ্যে জামিনপ্রাপ্ত আট জন গতকাল আদালতে হাজির ছিলেন।

আগামী ৮ জানুয়ারি মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য করা হয়েছে ।

ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় আহত ৫

সম্পূরক অভিযোগপত্র গ্রহণ শুনানি উপলক্ষে গতকাল সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ভিড় জমান। শুনানি শেষ হলে বিএনপি কর্মীরা শ্লোগান দিয়ে আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করার সময় আওয়ামী লীগ কর্মীরা তাদের ধাওয়া করলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। উভয় পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় কমপক্ষে ৫ জন আহত হয়। আহতদের হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে চিকিত্সা দেয়া হয়েছে।

যে ৩২ জন আসামি হচ্ছেন

যে ৩২ জন আসামি হচ্ছেন তারা হলেন নড়াইলের আমডাঙ্গার মইনুদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মইন ওরফে খাজা ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সি ওরফে আবুল কালাম ওরফে আব্দুল মান্নান, একই এলাকার মুহিব উল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, চাঁদপুরের মৈশাদি গ্রামের শরীফ শাহেদুল আলম ওরফে বিপুল, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের হাফেজ সৈয়দ নাইম আহমেদ আরিফ ওরফে নিমু, হবিগঞ্জের চৌধুরী বাজারের মোঃ বদরুল আলম মিজান, লুত্ফুজ্জামান বাবর, হবিগঞ্জের বানিয়াচঙ্গের মিজানুর রহমান মিজান ওরফে মিঠু, পাকিস্তানের ইসলামাবাদের কুলগাঁও থানা বর্তমানে সিরাজগঞ্জ নিমতলী থানার আব্দুল মাজেদ বাট ওরফে ইউসুফ বাট, বগুড়ার শেরপুরের শেখ আব্দুস সালাম, টাঙ্গাইলের গোপালপুরের মাওলানা মোঃ তাজউদ্দিন, কিশোরগঞ্জের ভৈরবের মুফতি শফিকুর রহমান, কুমিল্লার দাউদকান্দির মুফতি আঃ হাই, হবিগঞ্জের বানিয়াচঙ্গের মোহাম্মদ আলী, নবীগঞ্জের কালিয়ারভাঙ্গার বদরুল ওরফে মোঃ বদরুল, হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ভাদৈ গ্রামের একেএম আব্দুল কাইয়ুম, মোঃ তাজুল ইসলাম, মোঃ কাজল মিয়া, একই উপজেলার আব্দাবকাই গ্রামের জয়নাল আবেদীন জালাল, একই উপজেলার বনগাঁও গ্রামের জমির আলী, জয়নাল আবেদীন মুমিন ওরফে মুমিন আলী, লুকড়া গ্রামের মোঃ শাহেদ আলী ওরফে ছন্দু মিয়া, বহুলা গ্রামের মোঃ সেলিম আহমদ, শরীফপুর গ্রামের মোঃ আয়েত আলী, মাহমুদপুর গ্রামের আব্দুল জলিল, কাটাখালি গ্রামের মোঃ মুহিবুর রহমান, সিলেটের কানাইঘাট বর্তমানে ঢাকা গুলশানের হারিছ চৌধুরী, খুলনার রূপসা থানার শেখ ফরিদ ওরফে মাওলানা শওকত ওসমান, সিলেটের কানাইঘাটের হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, হবিগঞ্জের শায়েস্তানগরের গোলাম কিবরিয়া গউছ, সিলেটের কুমারপাড়ার আরিফুল হক চৌধুরী ও মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থানার দেলোয়ার হোসেন রিপন।

যে ৩ জন অব্যাহতি দেয়ার আবেদন করা হয়

অভিযোগপত্রে উল্লেখিত চট্টগ্রামের ইউসুফ বিন শরীফ, মৌলভীবাজার বড়লেখা থানার আবুবক্কর ওরফে আব্দুল করিম-এর ঠিকানা না মেলায় এবং অপর আসামি ফরিদপুর কোতয়ালী থানার চৌরঙ্গী মোড়ের আহসান উল্লাহ ওরফে কাজল ২০০৬ সালে ভারতীয় পুলিশের ‘এনকাউন্টারে’ নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তাদেরকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়ার আবেদন করা হয়।

অভিযোগপত্রে যা ভুল ছিল

দ্বিতীয় দফায় দেয়া সম্পূরক অভিযোগপত্রে হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র গোলাম কিবরিয়া গউছের ঠিকানা মর্তুজা কটেজ, শায়েস্তাগঞ্জ, চিড়িয়াখানা রোড লেখা ছিল। অথচ মেয়রের বাসার ঠিকানা হচ্ছে হবিগঞ্জ শহরের শায়েস্তানগর আবাসিক এলাকা। শায়েস্তাগঞ্জ ও শায়েস্তানগরের মধ্যে দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। অপর আসামি সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নাম লেখা হয়েছিল আরিফুল ইসলাম চৌধুরী।

২ মেয়র যেভাবে আসামি

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, হাফেজ মাওলানা মুফতি আব্দুল হান্নান গত ৭-৪-১১ তারিখে মতিঝিল থানার মামলা নম্বর ৯৭ (০৮) ২০০৪ সংক্রান্তে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করে বলেন যে, ২০০৩ সালের শেষের দিকে প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরের বেইলি রোডস্থ সরকারি বাসায় অপরাপর আসামিদের সাথে জি কে গউছ এবং আরিফুল ইসলাম আরিফকে সিলেটে পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করার নির্দেশ দেন। উক্ত নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সহায়তায় অত্র মামলার ঘটনা ঘটায়।

বাবর ও হারিছ চৌধুরী যেভাবে আসামি

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সংগঠিত ঘটনায় ব্যবহূত গ্রেনেড সংগ্রহ সরবরাহকারীকে মদদদানে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর জ্ঞাতসারে আশ্রয় এবং প্রশ্রয়দাতার ভূমিকা পালন করেছেন বলে বিষয়টি প্রকাশ পায়। পলাতক আসামি মাওলানা তাজউদ্দিন হতে প্রাপ্ত বিস্তারিত তথ্য তত্কালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরকে সাক্ষীরা অবহিত করলে তিনি বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর না হওয়ার নির্দেশ দেন এবং মাওলানা তাজউদ্দিনকে হেফাজতে রেখে বিশেষ ব্যবস্থায় পাকিস্তানে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। হারিছ চৌধুরী সম্পর্কে অভিযোগপত্রে বলা হয় ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি আসামি বদরুল ও মিজান সিএনজি চালিত অটোরিকশায় এবং বদরুল আলম মিজান ও মোঃ আলী মোটর সাইকেলে করে বৈদ্যের বাজার যায়। বৈদ্যের বাজার সভার কাছাকাছি তারা একত্রিত হয় এবং তারা মোটর সাইকেলটি অস্থায়ী চায়ের দোকানের পাশে রাখে। একই সময়ে হারিছ চৌধুরী ও অচেনা একজন নীল রঙের মোটর সাইকেলে এসে অস্থায়ী চা দোকানের পাশে রাখা লাল মোটর সাইকেলের পাশে তাদের মোটর সাইকেল রাখেন। হারিছ চৌধুরী লাল রঙের মোটর সাইকেলে আসা লোকদের সাথে কথা বলেন। এরপর হারিছ চৌধুরী ও অচেনা লোকটি কিবরিয়া সাহেবের মিটিং শেষ হবার ২০/৩০ মিনিট আগে নীল রঙের মোটর সাইকেলে করে চলে যান।

গ্রেনেডের উত্স

তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, সাক্ষীদের জবানবন্দি অনুযায়ী ২০০৫ সালের শেষের দিকে মাওলানা তাজউদ্দিনকে জঙ্গি সংগঠনের সদস্য হিসেবে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে জানা যায়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় ব্যবহূত সকল গ্রেনেড সে সরবরাহ করেছিল। উক্ত মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামি আব্দুল হান্নান মুন্সি ৩২টি গ্রেনেড মাওলানা তাজউদ্দিনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে। ৩২টি গ্রেনেড থেকে ৯টি গ্রেনেড ২ দফায় সিলেট অঞ্চলে পাঠায়। আলোচ্য মামলার ঘটনায় ব্যবহূত গ্রেনেডটি উল্লেখিত ৯টি গ্রেনেডের একটি।

উল্লেখ্য, ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যের বাজারে আওয়ামী লীগের জনসভা শেষে এক গ্রেনেড হামলায় সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ ৫ জন নিহত ও ৪৩ জন আহত হয়।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here