জনতার নিউজঃ

বাংলাদেশে ঢোকার সুযোগ খুঁজছে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতন থেকে বাঁচতে দেশটির সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে অবস্থানরত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সুযোগ খুঁজছে বলে জানা গেছে। সদ্য অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের দাবি, উত্তর মংডুর বিভিন্ন এলাকা থেকে রোহিঙ্গারা দলে দলে জড়ো হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এবার যারা অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় আছে তাদের বেশিরভাগই আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান। পরিস্থিতি শান্ত হবে ভেবে তারা এতোদিন ধরে অপেক্ষা করেন। তবে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন অব্যাহত থাকায় তারা এপারে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

গতকাল শনিবার অনুপ্রবেশকারী মিনার মিয়া নামের এক রোহিঙ্গা ইত্তেফাককে জানান, উত্তর মংডুর কুয়াঞ্চিবন, সাহেব বাজার এলাকা থেকে ৫০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ইতিমধ্যে একযোগে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে রওয়ানা দিয়েছে। পথে যাতে সেনাবাহিনীর আক্রমণের কবলে পড়তে না হয় সেজন্য তারা একসাথে আসছেন। দিনের বেলা হাঁটছেন, রাতে পথেই জিরিয়ে নিচ্ছেন। তারা কয়েকদিনের মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তে এসে পৌঁছবে।

ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা : রোহিঙ্গারা উখিয়া, টেকনাফ ছেড়ে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠছে। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম নগরীর কয়েকটি এলাকায় রোহিঙ্গা শিশুদের ভিক্ষা করতে দেখা গেছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি অস্বীকার করলেও অনেক প্রত্যক্ষদর্শী তা দেখেছেন। তবে রোহিঙ্গাদের ভাষা, আচার আচরণ, চেহারায় চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দাদের সাথে মিল থাকায় তাদের সনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

যেসব রোহিঙ্গা আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান তারা নিজ উদ্যোগে অথবা আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় কক্সবাজার হয়ে চট্টগ্রাম শহরের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

সীমান্ত এলাকায় কর্মরত হেলপ কক্সবাজার নামের একটি এনজিও’র নির্বাহী পরিচালক আবুল কাশেম ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমারা একাধিক সূত্রে মানবপাচারকারীর কথা জানতে পেরেছি। চক্রটি উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় রিফিউজি ক্যাম্পগুলোতে গিয়ে তাদের অসহায়ত্বে সুযোগ নিচ্ছে। বিদেশ নেয়ারও লোভ দেখাচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে দেশের অন্যান্য এলাকায় নিয়ে যাচ্ছে।’

যদিও চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা জানিয়েছেন যে, পুলিশ রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া রোধে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। কেউ যাতে চট্টগ্রামে ঢুকতে না পারে সে জন্যে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারকে প্রধান করে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। যেটি এসব বিষয় দেখাশোনা করছে।

নতুন অনুপ্রবেশ ২০ হাজার : গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত উখিয়া টেকনাফের ঘুমধুম, তমব্রু, বালুখালী, আঞ্জুমানপাড়া, রহমতের বিল, ধামনখালী, লাম্বারবিল এলাকা দিয়ে অন্তত ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

কোনঠাসা নতুনরা : আগে থেকে যেসব রোহিঙ্গা উখিয়া টেকনাফে আশ্রয় নিয়েছে তাদের দাপটে নতুন অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা কোনঠাসা হয়ে পড়ছে বলেও অভিযোগ উঠছে। যারা আগে থেকে এসেছেন তারা বিভিন্ন এলাকার সরকারি ভূমি ও ক্যাম্প এলাকায় জায়গা দখল নিয়েছেন। আর নতুন যারা আসছেন তাদের সেসব জায়গায় আশ্রয় দিতে অর্থ আদায় করছেন। এছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার দেয়া ত্রাণও কেড়ে নিচ্ছেন।

রাস্তার ধারে বৃষ্টিতে ভিজে মানবেতর জীবনযাপন : অস্বাভাবিক রোহিঙ্গা স্রোতের কারণে রোহিঙ্গারে আশ্রয় দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশের প্রশাসন। এতো দ্রুত গণহারে রোহিঙ্গারা প্রবেশ করছে যে তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে বেগ পেতে হচ্ছে। ফলে নতুন অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গারা উখিয়া-টেকনাফ সড়কের দুই ধারে ঝড়বৃষ্টিতে ভিজে কোনো মতে বেঁচে আছে। তাদের অধিকাংশের কাছে বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য পলিথিনের তেরপালটুকুও (ছাউনি) না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। বৃষ্টিতে ভিজে ছোট শিশুরা জ্বরে ভুগছে। তার উপর খাদ্য, পানি ও ওষুধের অভারে হাহাকার করছে অনুপ্রবেশকারীরা।

এখনো চলছে নৃশংসতা : রাখাইনের মংডুজুড়ে মিয়ানমার সৈন্যদের নৃশংসতা এখনো চলছে বলে দাবি করেছেন পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। সেখানকার রোহিঙ্গা এক্টিভিস্টদের পোস্ট করা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে নৃশংসতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে আসা রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত আসা চার লাখ রোহিঙ্গাসহ সকল রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন কার্যক্রম জেলা প্রশাসন শিগগিরই শুরু করবে। তাদের নাম ও ঠিকানার সঙ্গে ছবি ও আঙ্গুলের ছাপ সংগ্রহ করা হবে।

গত তিন দশক ধরে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করলেও এদের সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই। শুধুমাত্র প্রথম দিকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে কিছু রোহিঙ্গার নিবন্ধন করা হয়েছিল।

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা বিষয়ক তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা (ফোকাল পারসন) এডিএম খালেদ মাহমুদ জানান, রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য না জানলে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হবে না। শিগগিরই আমাদের টেকনিক্যাল টিম যন্ত্রপাতি নিয়ে আসবে। সেসবের মাধ্যমে আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে নিবন্ধন করা হবে। তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে টেকনাফ এবং উখিয়াকে ২০টি জোনে ভাগ করে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন করা হবে।

কক্সবাজারস্থ ৩৪ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল মঞ্জুরুল হাসান খান বলেন, আমাদের কাছে যে কোনো ধরণের সহযোগিতা চাইলে আমরা তা অবশ্যই করবো।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাইনুদ্দিন বলেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা নানা উপায়ে আমাদের মধ্যে জায়গা করে নিয়ে মিশে যাচ্ছে। এদেরকে শনাক্ত করে এক জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। একারণে নতুন আসা প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গাদের জন্য সরকারের কাছে ইতিমধ্যে ২ হাজার একর ভূমি চাওয়া হয়েছে।

নো ম্যান্স ল্যান্ডে কয়েক হাজার গর্ভবতী ও প্রসূতি নারী স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে

লামা (বান্দরবান) সংবাদদাতা জানান, মিয়ানমার সীমান্তের ফুলতলী, শিলেরঝিরি, আশারতলী ও ছেড়ার মাঠ সংলগ্ন নো ম্যান্স ল্যান্ডে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের দুর্ভোগ অবর্ণনীয়। এদের মধ্যে কয়েক হাজার গর্ভবতী ও প্রসূতি নারী রয়েছে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বান্দরবান জেলা ইউনিটের সেক্রেটারি কে এম জাহাঙ্গীর জানিয়েছেন,  নো ম্যান্স ল্যান্ডের প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা মানুষ চরম কষ্টে রয়েছে। এই মুহুর্তে তাদের খাবার, পানি, ওষুধ ও তেরপাল প্রয়োজন। প্রতিটি রোহিঙ্গা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। রোগব্যাধী ছড়িয়ে পড়ছে। গাদাগাদি করে অবস্থান করায় ক্রমেই সকলে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ফুলতলী ও সাপমারঝিরি নো ম্যান্স ল্যান্ডের অবস্থা খুবই খারাপ। কয়েক হাজার গর্ভবতী মহিলা রয়েছে। প্রতিদিনই ১০/১৫ জন সন্তান প্রসব করে। প্রসূতি রোহিঙ্গা মায়েদের চিকিত্সায় নেই কোন ব্যবস্থা। সদ্য নবজাতক শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে রোগব্যাধীতে। নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউপি চেয়ারম্যান তাসলিম ইকবাল চৌধুরী জানিয়েছেন, গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের চিকিত্সার প্রয়োজন। তারা রয়েছে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে।

রইক্ষ্যং ক্যাম্পে পানির তীব্র সংকট

টেকনাফ (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উনছিপ্রাং রইক্ষ্যং পুটিবনিয়া অস্থায়ী ক্যাম্পে গতকাল পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। ক্যাম্পে পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। নেই স্বাস্থ্যসম্মত বাথরুম ব্যবস্থা। খোলা জায়গায় যত্রতত্র পায়খানা প্রস্রাবের ফলে দুর্গন্ধময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। ক্যাম্পে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ছে। বিজিবির মেডিক্যাল টিমের প্রধান মেজর ডা. মো. আলম জানান, ক্যাম্পে জ্বর, ঠান্ডা, সর্দি ও ডায়রিয়ার রোগী বেশি।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here