জনতার নিউজঃ

‘বাংলাদেশে একটি মানুষও গৃহহীন হয়ে থাকবে না’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রবল বর্ষণ ও উজানের পানি আসায় দিনাজপুরে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। বহু রাস্তাঘাট, কার্লভাট, ব্রিজ, রেল লাইন, মহাসড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। বন্যার তোড়ে জেলার বেশিরভাগ মাটির বাড়ি ঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে, নষ্ট হয়েছে কাঁচা বাড়িঘর। আমার সরকার কাউকে গৃহহীন রাখবে না। প্রত্যেকের বাড়ি তৈরি করে দেয়া হবে। যাদের নিজস্ব জায়গা নেই তাদের খাস জমির উপর বাড়ি করে পুনর্বাসন করা হবে। বাংলাদেশে একটি মানুষও গৃহহীন হয়ে থাকবে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিনাজপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি ও ত্রাণ শিবির পরিদর্শনের জন্য আজ রবিবার সকাল সাড়ে ১০ টায় হেলিকপ্টারযোগে দিনাজপুর বড় মাঠে নেমে সরাসরি দিনাজপুর জিলা স্কুল আশ্রয় শিবিরে উপস্থিত হন। তিনি বন্যার্তদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। পরে দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন। এ সময় স্বাগত বক্তব্য রাখেন জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, খাদ্য মন্ত্রী কামরুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জনশীল গোপাল, ৬ আসনের সংসদ সদস্য শিবলি সাদিকসহ অন্যান্য নেতাকর্মী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর নানা রকম রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিবে। আক্রান্ত হবে বহু লোক। তাই আমার নির্দেশ দুর্গত এলাকার লোকজনের স্বাস্থ্যের যেন কোন  ক্ষতি না হয় সে জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা দেয়া হবে। একটি লোকও চিকিৎসার আওতার বাইরে থাকবে না। বন্যা চলে গেলেও কিছু কিছু নিম্নাঞ্চলে এখনও পানি লেগে আছে। আমি নির্দেশ দিচ্ছি অনতিবিলম্বে এই সকল পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনে বাঁধ ও রাস্তা কেটে পানি বের করে পরিবেশকে স্বাভাবিক করতে হবে এবং দ্রুততার সঙ্গে ওই সকল সড়ক ও বাঁধ সংস্কার করতে হবে। এজন্য সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার, গ্রাম পুলিশসহ আওয়ামী লীগের কর্মী বাহিনী দিন রাত কাজ করে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগে একটি মনিটরিং গ্রুপ এ সকল কর্মকাণ্ড তদারকি করবে সারাক্ষণ।

তিনি আরো বলেন, প্রচুর রাস্তাঘাট, রেল লাইন কাঁচা রাস্তা নষ্ট হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই আমি সড়ক জনপথ ও সেতু মন্ত্রণালয়, এলজিইডি মন্ত্রণালয়, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছি পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই সকল ভেঙ্গে যাওয়া রাস্তাঘাট মেরামত করে দ্রুত চলাচলের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, কৃষক ভাইরা ভয় পাবেন না। আপনারাই জাতির মেরুদণ্ড। আপনাদের ব্যাংক ঋণ কর্মসূচী অব্যাহত থাকবে। যারা কৃষি ঋণ নিয়েছিলেন তাদেরকেও পুনরায় ঋণ প্রদান করা হবে। ইতিমধ্যেই দেশের ২ কোটি কৃষককে ১০ টাকার একাউন্টের মাধ্যমে ১০টাকা দরে চাল প্রদান করা হচ্ছে। আরও এক কোটি লোককে ১০ টাকা কেজি দরে চাল প্রদান করা হবে।

বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করে দিয়েছে। তার স্বপ্ন ছিল দেশকে একটি শোষণমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার ও অর্থনৈতিকভাবে দেশকে সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তোলা। কিন্তু তার আগেই স্বাধীনতাবিরোধী একটি বিপথগামী দল আমার পিতা-মাতাসহ আমার ছোট্ট ভাই রাসেলকেও হত্যা করেছে ১৫ আগস্ট। তাতেও তাদের সখ মেটেনি। আমার মেজো ফুফুকে ও মেয়েসহ সকল সদস্যকে হত্যা করতে দ্বিধা করেনি। আমরা দু’ বোন ওই সময় দেশের বাহিরে ছিলাম বলে এখনো আল্লাহ্‌ রাব্বুল আল আমিনের কৃপায় বেঁচে আছি। জিয়া সরকার আমাদের ২ বোনকে ছয় বছর এই দেশে আসতে দেয়নি। আওয়ামী লীগ যখন আমাকে পার্টির সভাপতি মনোনীত করেন তারপরেই আমি দেশের মাটিতে ফিরে আসি। মানুষ একটি হত্যার শোক ভুলতে পারেনা। আর আমি গোটা পরিবারের শোক কিভাবে বুকে নিয়ে দেশ পরিচালনা করছি। তা আপনারা দেখতে পাচ্ছেন।

আমি আমার বাবার শেষ স্বপ্ন সোনার বাংলা গড়ার এবং জনগণের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য জীবন দিয়ে হলেও কাজ করে যাবো। স্বৈর সরকার আওয়ামী লীগকে ২১ বছর ক্ষমতায় আসতে দেয়নি। মানুষের কোন ভাগ্য উন্নয়ন করতে পারেনি। উত্তরবঙ্গ ছিল মঙ্গার দেশ। আমরা ’৯৬-তে  ক্ষমতায় এসে মঙ্গা দূর করার জন্য কেবল বিভিন্ন কর্মসূচী ও প্রকল্প গ্রহণ করি। এর পরপরই আবারও জোট সরকার ২০০২ সালে ক্ষমতায় এসে সম্পূর্ণ প্রকল্পটি নস্যাৎ করে দেয়। আমরা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর উত্তরবঙ্গে পূর্বের কর্মসূচীগুলো বাস্তবায়ন করার কাজ পুরো দমে চালু করি এবং কয়েক বছরের মধ্যে উত্তরবঙ্গ থেকে মঙ্গাকে বিদায় দেই। শুধু তাই নয়, এখন বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ। আমরা খাদ্য উৎপাদনে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছি তাতে অনেকেরই ঈর্ষা হয়। এতো বড় বন্যাতেও উত্তরাঞ্চলে কোন মঙ্গার দেখা যায়নি। আমি যখন বিরোধী দলের নেত্রী ছিলাম তখন দিনাজপুরে ১৯৯৫ সালে একজন তরুণী পুলিশ কর্তৃক ধর্ষণ ও হত্যা হয়। এর প্রতিবাদে দিনাজপুরের জনগণ যখন আন্দোলন ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আপনাদের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। তখন আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। সকল বিপর্যয়, দুর্যোগের সময় আমি আপনাদের সাথে ছিলাম এখনো আছি, আগামীতেও থাকবো। তিনি বলেন, দেশে ঘন ঘন বন্যার কবলে পড়লেও এ বছর খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলা করতে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ থাকার পরেও বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করেছি। খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলায় সব সময় সরকার প্রস্তুত।

তিনি দিনাজপুর জিলা স্কুলে আশ্রয় কেন্দ্রে ত্রাণ বিতরণের পরপরই গাড়িযোগে বিরলে ফারাক্কাবাদ ইউনিয়নের তেঘরা উচ্চ বিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন এবং বানভাসিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে তাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন। এরপর তিনি দিনাজপুর সার্কিট হাউজে ফিরে আসেন। দুপুরে যোহরের নামাজ আদায় করে হেলিকপ্টারযোগে কুড়িগ্রামের উদ্দেশ্যে দিনাজপুর ত্যাগ করেন।

তিনি এনজিওদের প্রতি আহ্বান করে বলেন, এই বন্যায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের কিস্তির টাকা যাতে উত্তোলনের জন্য চাপ না দেয় এবং তাদেরকে নতুন করে ঋণ দেয়ার জন্য তিনি বলেন। তিনি দিনাজপুর বড় মাঠে পৌনে ১১ টা সময় হেলিকপ্টারে করে এসে পৌঁছালে তাকে হেলিপ্যাডে অভ্যর্থনা জানান জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি। এছাড়াও জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম, পুলিশ সুপার হামিদুল আলমসহ জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here