শামছুদ্দীন আহমেদ

সংসদ নির্বাচন ব্যবস্থা প্রশ্নে এখনও নিজ নিজ অবস্থানেই অনড় প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। যেভাবে, যে প্রক্রিয়ায়ই হোক- পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন হয়েছে, সরকার ও সংসদও গঠন হয়ে গেছে। এই নির্বাচনের পর ইতিমধ্যে সাড়ে সাত মাস অতিবাহিত হলেও কোনো পক্ষেরই অবস্থানে নড়চড় নেই, কারও ছাড় দেয়ার আভাসও নেই। বরং নির্বাচন ব্যবস্থার পাশাপাশি এখন নতুন বিতর্ক যুক্ত হয়েছে আগামী নির্বাচনের সময় নিয়ে। এনিয়ে দু’পক্ষের বাহাস, হুমকি-পাল্টা হুমকি চলছে। যার ফলে সর্বত্র এখন প্রশ্ন- পুরনো চক্রে ঘূর্ণায়মান রাজনৈতিক এই সমস্যার সমাধান কী? তাহলে কি রাজনীতি এই অবস্থায়ই থাকছে?

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী, চলতি বছরের পাঁচ জানুয়ারি নবম সংসদ নির্বাচন হয়েছে নির্বাচিত সরকারের অধীনেই। বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন জোট সেই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। আগের দাবিতেই অটল থেকে বিএনপি বলছে- নির্দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন (পরবর্তী) দিতে হবে। এরসঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে, দ্রুততম সময়ে এবং সবার অংশগ্রহণে অবাধ নির্বাচনের দাবি। আওয়ামী লীগও নিজেদের পূর্ব অবস্থানে স্থির থেকে স্পষ্ট করেই বলছে, পরবর্তী নির্বাচনও বর্তমান সংবিধান অনুযায়ীই হবে। তাদের বক্তব্যে নতুন উপাদান সংযোজন হয়েছে শুধু এটুকু যে, সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকার পাঁচ বছরই ক্ষমতায় থাকবে এবং ২০১৯ সালের আগে কোনো নির্বাচন নয়। আওয়ামী লীগ-বিএনপির বক্তব্য কিংবা অবস্থানের ফলাফল হচ্ছে- পাঁচ জানুয়ারির আগে রাজনীতি যেখানে ছিল এখনও সেখানেই আছে। এই অবস্থায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কারও কারও মতে, বলা যেতে পারে সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটি একইস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।

এই পরিস্থিতি সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক গতকাল শনিবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের আগের অবস্থার সঙ্গে এখনকার পরিস্থিতির একটু তফাত্ আছে। আওয়ামী লীগ যেভাবে চেয়েছিল, সেভাবেই পাঁচ জানুয়ারি নির্বাচন করে নিতে পেরেছে, মাঝখানে শুধু এরশাদের দল (জাতীয় পার্টি-জাপা) একটু গোলমাল করেছে। সেই পরিকল্পনায় আওয়ামী লীগ একশ ভাগ সফল। তবে প্রভাবশালী রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক ক্ষমতাধররা ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে বলে বিএনপির যে পরিকল্পনা ছিল, তাতে তারা সফল হয়নি। বরং জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি যে ধরনের আন্দোলন করেছে, যে আন্দোলনে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, আওয়ামী লীগ সাফল্যের সঙ্গে সেটিকে প্রচার করতে সক্ষম হয়েছে। পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের পর এখনকার পরিস্থিতি হলো, বিএনপি সম্পূর্ণভাবে মনোবলহারা, খালেদা জিয়া বা তার দলের মনে কোন বল নেই। আবার সেই ধরনের আন্দোলন করতে গেলে মামলা-মোকদ্দমায় পড়তে হবে, বিএনপির জন্য সেটি বিপজ্জনক। যে কারণে আন্দোলনের নৈতিক শক্তি বা সাহস কোনটিই এখন তাদের নেই।’ অধ্যাপক আবুল কাশেম বলেন, ‘জনগণও এখন ধরেই নিয়েছে- রাজনীতি এরকমই চলবে। পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে হয়তো জনমনে একটা আশা ছিল যে, হয়তো বা কোনো পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এখন আর সেই অবস্থা নেই। বাস্তবতা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ বিজয়ী। তবে বিজয়ী হলেও আওয়ামী লীগের নেতাদের ভেতরেও ভয় আছে। কারণ একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন তারা করতে পারেনি। তবে আওয়ামী লীগ সেই ভয় প্রকাশ করে না, বাইরে দেখানো সাহস দিয়ে তারা সেটিকে ঢেকে রেখেছে।’

রাজনীতি পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সরকার বা আওয়ামী লীগ যেভাবেই বলুক না কেন- পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন প্রশ্নাতীত নয়। সে কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি থাকাও অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- যেভাবেই বা যেরকমই হোক- পাঁচ জানুয়ারি তারা একটি নির্বাচন করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। বিএনপি বা এর জোট সেটি থামাতে পারেনি। সরকার যদি নিজ অবস্থানে অটল থাকে তাহলে পরবর্তী কিংবা একাদশ সংসদ নির্বাচনও বর্তমান সংবিধান অনুযায়ীই হবে। বিএনপি যদি সেই নির্বাচনে অংশ নিতে চায়, তাহলে এই সংবিধানের আলোকেই নিতে হবে। আর যদি তা না হয়, তাহলে বিকল্প কি? অন্যকোনোভাবে কি এর সমাধান মিলবে? কি হতে পারে সেই বিকল্প?

জনমনে দেখা দেয়া এসব প্রশ্ন সম্পর্কে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘আসলে আমরা সবাই একটা অন্ধকারে, ঘোরের মধ্যে আছি। অতীতেও এই ধরনের রাজনৈতিক সমস্যা হয়েছিল, কোনো না কোনোভাবে এর সমাধানও হয়েছে। আমার ধারণা- এবারও সমাধান হবে। তবে সেটি কখন, কীভাবে, কি প্রক্রিয়ায়, কিসের বিনিময়ে হবে- বলতে পারছি না।’

উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তরণের পথ কি? এর জবাবে আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন ‘এ ব্যাপারে অনেকের অনেক মত থাকতে পারে। তবে আমার মত হচ্ছে- আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যদি উন্নত রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ করতে পারে, তাহলে এর সমাধান সম্ভব। অন্যথায় শুধু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দিকে তাকিয়ে না থেকে এখন নতুন করে ভাবারও সময় এসেছে। রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভেতরেও যারা ভালো চিন্তা করেন, তাদের সামনে আসার সুযোগ করে দিতে হবে। রাজনীতিবিদদের শুধু তিরস্কার না করে, যারা সত্যিকারভাবে দেশ ও জনগণের ভালো চান, তাদেরকে সামনে নিয়ে আসতে গণমাধ্যমকেও ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।’

নির্বাচন ব্যবস্থা প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নিজ অবস্থানে অটল থাকায় এবং উভয়ের পূর্ণ মনোযোগ শুধু রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া বা ধরে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ হওয়ায় দুইটি দলই সাংগঠনিক দিক থেকে ‘বিপজ্জনক’ অবস্থায় রয়েছে বলে অভিন্ন মত দিলেন অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক ও ড. ইফতেখারুজ্জামান। অধ্যাপক আবুল কাশেমের মতে, সংসদের ভেতরে-বাইরে কার্যত বিরোধী দল না থাকায় আওয়ামী লীগ দৃশ্যত ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগ অনেকটা বিপর্যস্ত অবস্থায়। ছাত্রলীগ, যুবলীগ থেকে শুরু করে দলের কোথাও শৃঙ্খলা নেই। একই পরিস্থিতি বিএনপিরও, তারাও শুধু সরকার পরিবর্তনের বিষয়ে ব্যস্ত, সংগঠন বিশৃঙ্খল।

আর ড. ইফতেখার বললেন, দুইটি দলই এখন সাংগঠনিকভাবে হুমকির মধ্যে পড়েছে। বিএনপি তাদের সমস্ত রাজনৈতিক মনোযোগ রেখেছে শুধু একটি দাবি নিয়ে। নিজেদের সংগঠন শক্তিশালী করার এবং জনগণের চাওয়া-পাওয়ার সমন্বয়ে সরকারের ওপর গণতান্ত্রিক চাপ সৃষ্টির দিকে দলটির মনোযোগ দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগও শুধু সরকার টিকিয়ে রাখতে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার দিকেই মনোযোগী। দেশের দুইটি প্রধান রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক এই দুর্বলতা গণতন্ত্রের জন্য শুভকর নয় বলে মত দেন ড. ইফতেখার।

 

সুত্রঃ ইত্তেফাকঃ

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here