নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় ফুটপাতের হকার উচ্ছেদকে কেন্দআইভী সমর্থিত লোকজনদের সঙ্গে হকার ও তাদের সমর্থিত লোকজনদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এতে সাংবাদিক, পুলিশসহ অর্ধ শতাধিক লোক আহত হয়েছে। সংঘষের্র সময়ে উভয় পক্ষের মিছিল থেকে ফাঁকা গুলি ছুড়তে দেখা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে পুলিশ প্রচুর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে দফায় দফায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সোয়া ঘন্টা ব্যাপী সংঘর্ষ চলাকালে রীতিমতো লঙ্কাকান্ড শুরু হয়। উভয় পক্ষ থেমে থেমে একে অপরের উপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং লাঠি সোটা নিয়ে হামলা চালায়। এসময় অন্তত ২৫/৩০ রাউন্ড গুলি বিনিময় হয়। ব্যাপক বোমাবাজিরও ঘটনা ঘটে। এই সংঘর্ষের ফলে চাষাঢ়া থেকে গলাচিপা এলাকা পর্যন্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আহতদের নারায়ণগঞ্জ তিনশ’ ও দেড়শ’ শয্যা হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে। তাদের কেউ কেউ গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে খবর ছড়িয়েছে। সন্ধ্যার পর শহরে অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয়।

সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত্ আইভী এই ঘটনার জন্য সংসদ সদস্য শামীম ওসমানকে দায়ি করে ঘটনা সামলাতে ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ায় নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে এই ঘটনাকে নারায়ণগঞ্জবাসীর উপর হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে শামীম ওসমান এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ নাকচ করেছেন।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল সকাল থেকেই শহরে হকার ইস্যুতে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করতে থাকে। দুপুরের পর থেকে শহর অনেকটা জনশূন্য হয়ে পড়ে। মঙ্গলবার বিকাল থেকে ফুটপাতে শৃঙ্খলাবদ্ধ ভাবে হকারদের বসতে নির্দেশ দেন শামীম ওসমান। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আইভীর সমর্থকরা হকারদের ফুটপাতে না বসতে দেবার জন্য বিকালে নগর ভবনের সামনে সমবেত হয়। গতকাল বিকাল সোয়া ৪টায় নগর ভবন থেকে পায়ে হেঁটে আইভী ফুটপাত দিয়ে কয়েক হাজার নেতা কর্মীসহ চাষাঢ়ার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। এর আগে থেকেই শহরের চাষাঢ়াস্থ শহীদ মিনার ও আশপাশের এলাকায় কয়েক হাজার হকার জড়ো হয়। বিকাল ৫টার দিকে আইভী কয়েক হাজার লোক নিয়ে চাষাঢ়ার দিকে এগোতে থাকেন। ওই সময় মেয়রপন্থি লোকজনের সঙ্গে হকারদের সংঘর্ষ শুরু হয়। শুরু হয় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া।

এক পর্যায়ে হকারদের সংখ্যাধিক্যের কারণে মেয়রপন্থিরা পিছু হটলেও অনঢ় থাকেন মেয়র। যেখানে সংঘর্ষের সূত্রপাত সেই সায়ামপ্লাজা মার্কেটের সামনেই কিছু অনুসারি নিয়ে রাস্তায় বসে পড়েন মেয়র আইভী। এসময় হকাররা বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে মেয়র ও তার সমর্থকদের উপর। সমর্থকরা ‘মানবঢাল’ তৈরী করে তাকে রক্ষা করে। তখনও উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং লাঠি সোটা নিয়ে মারপিট অব্যাহত থাকে। এভাবে ১৫ মিনিট সংঘর্ষ চলার পর পুলিশ প্রথমে হকারদের দিকে শটগানের গুলিবর্ষণ এবং টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। পরে মেয়রপন্থিদের দিকেও শটগানের গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হয়। তবে পুলিশের টিয়ার শেল এবং গুলির মুখেও অবিচল ছিলেন আইভী। তিনি তার অবস্থান থেকে এক চুলও নড়েননি। পরে টিয়ার শেলের ঝাঁঝ থেকে বাঁচাতে মেয়রকে তার অনুসারিরা নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে নিয়ে আসে।

মেয়রের দেহরক্ষী কনসটেবল শফিক জানান, তিনি আত্মরক্ষার্থে তার পিস্তল থেকে ২ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শী অনেকে আওয়ামী লীগ নেতা আবু সুফিয়ানকেও তার লাইসেন্স করা পিস্তল থেকে গুলি বর্ষণ করতে দেখেছেন। সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে, জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি আবদুল কাদির, শহীদুল্লাহ, আবু সফিয়ান, শহর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মেয়র আইভীর ছোট ভাই আহম্মেদ আলী রেজা উজ্জল, মেয়রের দেহরক্ষী শফিক, নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শরীফ উদ্দিন সবুজ, মাহাবুব হোসেন টিটু, নাহিদ, নাছির, সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের পরিদর্শক হিরণের নাম জানা গেছে। নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার আসাদ্দুজ্জামান বলেন, ‘আহতদের মধ্যে কমপেক্ষ ৩০ জনকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। এদের মধ্যে ৫ থেকে ৬ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’ অপর দিকে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালের জরুরী বিভাগের ডাক্তার মো. সরোয়ার বলেন, ‘৪ জনকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে।’

আইভির বক্তব্য: ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে এসে মেয়র আইভী বলেন, আমি নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষের জন্য রাস্তায় নেমেছিলাম। আমি ফুটপাত দিয়ে হেঁটে এসেছি। হকাররা ফুটপাতে নয়, হকার্স মার্কেটে থাকবে। আমি পায়ে হেঁটে সায়াম প্লাজার সামনে আসা মাত্র বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছোঁড়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী একনেকের একটি বৈঠকে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে মার্কেট হবে। এজন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও সরকারের কাছে বরাদ্দ চেয়েছে। মেয়র অভিযোগ করে বলেন, শামীম ওসমান রাইফেলস ক্লাবে বসে এই হামলার ঘটনা ঘটিয়েছেন। হকারদের পুনর্বাসনের জন্য জেলা প্রশাসন কাজ করছিল। তাদের পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হচ্ছিল। এসময় তিনি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে শামীম ওসমানের অনুগত দাবি করে তাদের প্রত্যাহার দাবি করেন।

শামীম ওসমান যা বললেন: এদিকে মেয়র আইভীর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য শামীম ওসমান বলেন, আমি মানবিক দিক বিবেচনায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফুটপাতে সুশৃঙ্খলভাবে হকারদের বসতে দিতে অনুরোধ রেখেছিলাম। হকাররা আক্রান্ত হয়েছে. তারাই প্রতিরোধ করেছে। এখানে আমার কোন সম্পৃক্ততা নাই। গত সোমবার যখন কয়েক হাজার হকার ও তাদের পরিবারের সদস্যরা আমার কাছে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো তখন একজন মানুষ হিসেবে আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here