fire  বড় দুর্ঘটনা মোকাবিলার প্রস্তুতি নেই ;

লোকজন ও সাজ-সরঞ্জামের ঘাটতি ;

স্টেশন অরক্ষিত, ভবন ঝুঁকিপূর্

অযত্ন আর অবহেলার মধ্যে চলছে ফায়ার সার্ভিস। দুর্ঘটনা ঘটলে সবার আগে পৌঁছেন ফায়ার কর্মীরা। অথচ উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঢিমেতালে বরাদ্দ হয় এই বিভাগটির। যদিও স্বাধীনতার পর বর্তমান সরকারের আমলেই সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের। তবুও প্রয়োজনের তুলনায় তা ছিল খুবই অপ্রতুল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢেলে সাজানো দরকার এই বিভাগটিকে। প্রয়োজন আরো নতুন নতুন যন্ত্রপাতির। বাড়ানো দরকার জনবল। অনেক ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ভবনের অবস্থাই ঝুঁকিপূর্ণ। যে কোন সময় ভেঙে পড়তে পারে। আবার বর্তমান অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে ককটেল হামলা করে ক্ষতি করা হয়েছে বেশকিছু যন্ত্রপাতির। এমন পরিস্থিতিতে বড় ধরনের কোন দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু ফায়ার সার্ভিস দিয়ে উদ্ধার তত্পরতা চালানো কতটা সম্ভব তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর এ নিয়ে আলোচনা আবারো সামনে চলে এসেছে। কোন দুর্ঘটনা ঘটলে আলোচনা শুরু হয়, কিছুদিন পর আবার থেমে যায়।

দেশে ২৭২টি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতে ১৫টি। আর সবগুলো মিলিয়ে এর জনবল ৭ হাজারের কিছু বেশি। রাজধানীতে জনবল ৫শ’র মতো। ফায়ার স্টেশনগুলোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে আছে রাজধানীর ফায়ার স্টেশনগুলো। ‘বি’ ক্যাটাগরিতে আছে রাজধানীর উপকণ্ঠে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের স্টেশনগুলো। বাকি সবগুলো স্টেশন ‘সি’ ক্যাটাগরিতে। ‘এ’ ক্যাটাগরির স্টেশনগুলোতে ৩৫ জন করে, ‘বি’ ক্যাটাগরির স্টেশনগুলোতে ২৭ জন ও ‘সি’ ক্যাটাগরিতে ১৬ জন জনবল কাজ করে। রাজধানীর স্টেশনগুলোতে তিনটি বড় পানির গাড়িসহ বড় ধরনের হাইড্রোলিক ল্যাডারসহ (মই) ভারি কিছু যন্ত্রপাতি আছে। কিন্তু দেশের অন্য ফায়ার স্টেশনগুলোতে একটি করে পানির গাড়ি ছাড়া তেমন আর কোন যন্ত্রপাতি কিছুই নেই।

শুধু আগুন নেভানোর কাজ নয়, ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী দলও রয়েছে। আছে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস। যে কোন ধরনের দুর্ঘটনার খবর পেলেই ছুটে যান ফায়ার কর্মীরা। আগুন বা দুর্ঘটনার খবর শুনে ফায়ার কর্মীরা ছুটে যাননি এমন নজির নেই। অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। ফায়ার সার্ভিসের উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মেজর একেএম শাকিল নেওয়াজ ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটে গেলে শুধু ফায়ার কর্মীদের দিয়ে হবে না। এ জন্য ওয়ার্ড ও এলাকাভিত্তিক নাগরিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। আর এসব প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ছোট-বড় ৩০০ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। এমন ১৬০ কোটি টাকার প্রকল্প চলছে। আগে যারা আগুন নেভাত তারাই উদ্ধার কাজ চালাত। এখন দুই গ্রুপকে পৃথক করা হয়েছে। এক গ্রুপ আগুন নেভায় আর অন্য গ্রুপ উদ্ধার কাজ পরিচালনা করে। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এখানে নিয়োগ দেয়া হয় ৩০ বছর বয়সে। কিন্তু এটা ১৮ থেকে ২১ বছরের মধ্যে দেয়া হলে সংশ্লিষ্টরা অনেক বেশি শ্রম ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবে। নিয়োগ বিধি পরিবর্তন করার প্রয়োজন। যুগের সঙ্গে তালমিলিযে বিসিএস (ফায়ার) ক্যাডার সার্ভিস চালু করা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

সম্প্রতি বুয়েটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে ৭.৫ রিখটার স্কেল মাত্রার ভূমিকম্প হলে ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। একইসঙ্গে বহু কালভার্ট ও ব্রিজসহ প্রধান প্রধান সড়ক ভেঙে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের এই ফায়ার সার্ভিস দিয়ে কতটা উদ্ধার কাজ সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর শুধু ফায়ার সার্ভিস নয়, সেনাবাহিনীর ভারি যন্ত্রপাতি দিয়েও অন্তত ২০ দিন লেগেছে উদ্ধার কাজ শেষ করতে। এখানে একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরাতে যখন এই অবস্থা তখন ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়লে পরিস্থিতি কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। তাই ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষের প্রশিক্ষণের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর মাহবুবুর রহমান বলেন, আমরা বিদ্যমান জনবল ও ব্যবস্থাপনা দিয়ে বিভিন্ন দুর্যোগ ও দুর্ঘটনা থেকে উদ্ধারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আধুনিক করার কাজও হাতে নেয়া হয়েছে। এটা চলবে। জানা গেছে, বাংলাদেশের তিনটি ভূমিকম্পের উত্সস্থল রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে কাছে মধুুপুর। আর সিলেটের কাছে ভারত সীমান্তে এবং কক্সবাজারের কাছে মিয়ানমার সীমান্তে। মধুপুরে ভূমিকম্পের উত্পত্তি হলে ঢাকা শহর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা বলেন, কোন দুর্ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিসে বরাদ্দ বাড়ে। বর্তমানে ভূমিকম্প যেভাবে বাড়ছে, তাতে এখনই প্রস্তুতি না নিলে রক্ষা নেই।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার কাজ চালানোর দায়িত্ব যে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের, খোদ রাজধানীতে তাদের ভবনগুলোই বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে একটি বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে সবার আগে ফায়ার সার্ভিসের ভবনগুলো ধসে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ফলে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা নিজেদেরই রক্ষা করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার তত্পরতার জন্য দেশে ৬২ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে পাইলট প্রকল্প হিসেবে ঢাকায় এক হাজার স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক, ছাত্র, মুদি দোকানি থেকে শুরু করে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ রয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের সাবেক উপ-পরিচালক সেলিম নেওয়াজ ভুঁইয়া বলেন, গাড়ি রাখার জন্য পিলারের ওপর ভবন করা হয়। এ কারণে এমনিতেই ওইসব ভবন অন্য ভবনের চেয়ে দুর্বল হয়। ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এই ভবনগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। চীনে পুরনো ফায়ার সার্ভিসের ভবন ঠিক রেখে আলাদা পিলার দিয়ে সেগুলো শক্তিশালী করা হয়েছে। এভাবে দেশের স্টেশনগুলো মজবুত করা যেতে পারে। তিনি বলেন, ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার কাজ চালানোর জন্য প্রথমেই ছুটে আসে এলাকার লোকজন। রাজধানীতে যারা টিনের বাড়ি ও বস্তিতে বসবাস করছেন তাদের ভূমিকম্পে ক্ষয়-ক্ষতির ভয় কম। ফায়ার সার্ভিসের তরফ থেকে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। ভূমিকম্প হলে প্রশিক্ষণের অভাবে মানুষের মৃত্যু বেশি হবে। ধরা যাক, একটি ভবনকে তিন-চারটি ইট আটকে রেখেছে। উদ্ধারকারীরা বুঝতে না পেরে শাবল বা অন্য কিছু দিয়ে সেই ইট সরিয়ে দিল। তাতে কী হবে? ভবনটি পড়ে গিয়ে মানুষের প্রাণ যাবে। তাই প্রশিক্ষিত লোকই প্রয়োজন।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ  বলেন, ‘আমাদের সীমিত যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা কি কাজ করি দেশের মানুষ সবাই জানে। এর মধ্যেই আমরা আরো কিভাবে ভালো সেবা দেয়া যায় সে চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ ভবিষ্যতে আরো ভালো সেবা দেয়া যাবে বলে আশাবাদী এই কর্মকর্তা।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here