new‘বিষময়’ রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। এগিয়ে নিচ্ছেন প্রিয় স্বদেশ বাংলাদেশকে। উদ্দাম তারুণ্য আর উদ্যমী চিন্তাচেতনায় ভরা উদ্যোক্তারা সকল বাধাবিপত্তির সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন দেশকে স্বাবলম্বী করতে। তাদের চলার পথ মসৃণ নয়, তথাপি থামছেন না। মানুষ তার আশার সমান বড়-কথাটিই অনেকে মনে করিয়ে দিয়ে বললেন, একজন উদ্যোক্তার চলার পথে বড় বাধা ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা’। রাজনীতিতে যদি স্থিতিশীলতা থাকতো, তবে উত্পাদন খাতে বাংলাদেশ হতে পারতো ‘ছোটখাটো একটা চীন’। হয়তো একদিন হবে- সে আশা নিয়েই বিনিয়োগ করছেন তারা। বলছেন, অনেক সমস্যা থাকলেও বাংলাদেশ এখনো গতিশীল অর্থনীতির দেশ। এখানে রয়েছে কাজে লাগানোর মত বিপুল জনশক্তি।

উদ্যোক্তাদের এমন মন্তব্য প্রতীয়মানের জন্য সারাদেশ ঘুরতে হবে না। ঢাকা ও এর আশপাশ কিংবা ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ রোডের দিকে এগুলে বড় রাস্তার দুই ধারে সহজেই চোখে পড়ে শিল্প বিকাশের চিত্র। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশতো পরিণত হয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক করিডোরে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে এগুলেও বোঝা যাবে শিল্পের চাকা ঘোরার শব্দ। ছোট বড় মিলিয়ে বিশাল কর্মযজ্ঞ। এসবই হচ্ছে সম্পূর্ণ বেসরকারি প্রচেষ্টায়। পুঁজির ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন আকারের শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছেন উদ্যোক্তারা। কাজের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন লাখ লাখ মানুষের। যাদের দেয়া করের টাকায় চলছে সরকারের বিশাল ব্যয়নির্বাহ।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যেসব প্রতিকূলতাসত্ত্বেও উদ্যোক্তারা ব্যবসা-বাণিজ্য চালাচ্ছেন, তাতে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দারিদ্র্য সত্যি সত্যি জাদুঘরে চলে যেত। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে অর্থনৈতিক বিকাশ বারবার হোঁচট খেয়েছে। তদুপরি অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে বেসরকারি খাত। তরতর করে বেড়ে চলছে আমাদের অর্থনীতি। একই সঙ্গে সামাজিক সূচকগুলোকেও এগিয়ে নিয়েছে গতিশীল অর্থনীতি। যদি রাজনৈতিক ঝুঁকি না থাকতো, তবে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি এতদিনে ডাবলডিজিটে গড়াতো।’

রাজনৈতিক ঝুঁকি কিংবা উদ্যোক্তাদের মতে, ‘রাজনৈতিক বিপত্তি’ স্বাধীনতার পর থেকে অর্থনীতি বিকাশের বড় বাধা হয়ে আছে। স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭৫ সালে ক্যু, পাল্টা ক্যু এবং পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রের আন্দোলনে অস্থির ছিল রাজনৈতিক পরিবেশ। এই বৈরী পরিবেশে হোঁচট খেলেও একেবারে দমে যাননি বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। সব ধকল সহ্য করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি আর প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।

উদ্যোক্তা প্রকৌশলী আহমেদ আলী বলেন, একসময় বিদেশে বাংলাদেশ বলতে বুঝতো ঝড়- জ্বলোচ্ছ্ব্াস, খরা-বন্যার দেশ। এখন বাংলাদেশের ভাবমূর্ত্তি অনেক উজ্জ্বল হয়েছে। অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার হিসাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। পণ্যের গুণগত মানের জন্য বাংলাদেশ নির্ভর হয়েছে অনেক দেশ। সামনে অফুরন্ত সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘পণ্যের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে বিশ্ববাজার দখল সম্ভব হবে।’

বর্তমানে তৈরি পোশাক শিল্প ছাড়াও ইস্পাত, বস্ত্র, ওষুধ, রড-সিমেন্ট, কসমেটিকসসহ বিভিন্ন পণ্যের কারখানা গড়ে উঠেছে ঢাকার বাইরে। কমপ্লায়েন্স ইস্যুকে কেন্দ্র করে গার্মেন্টস শিল্প ঢাকার বাইরে স্থানান্তর গতি পায়। সেই গতি এখনো অব্যাহত রয়েছে। গার্মেন্টস শিল্প ছাড়াও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাত গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। নানা সমস্যার মধ্যেও উদ্যোক্তারা শিল্প বিকাশে এগিয়ে যাচ্ছেন। উদ্যোক্তাদের মতে, অবকাঠামোগত সুবিধাদি দ্রুত নিশ্চিত করা গেলে শিল্পস্থাপনের গতি আরো বেগবান হতো।

প্রাপ্ততথ্য অনুযায়ী ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সন্নিহিত এলাকায় শুধু বস্ত্র খাতেরই এক হাজারের বেশি কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় ১০ লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করে। প্রতিষ্ঠিত অনেক গ্রুপও রয়েছে এই তালিকায়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ওপেক্স গ্রুপ, এস্কয়ার নিট কম্পোজিট, চৈতী গ্রুপ, জাহিন টেক্সটাইল, ড্রাগন সোয়েটারসহ আরো কয়েকটি বৃহত্ গ্রুপ। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে এনভয় গ্রুপের এনভয় টেক্সটাইল, মাসকো গ্রুপ, ম্লল গ্রুপ, বেক্সিমকো, এনার্জি নিট কম্পোজিট, শামীম কম্পোজিট, ডিভাইন গ্রুপ, আইমন, আহসান, নায়াগ্রা, রেডিয়াল, এনআরজি নিট কম্পোজিট, ভিয়েলাটেক্সসহ অনেক বৃহত্ গ্রুপের কারখানা রয়েছে। এক একটি কারখানা নানামুখী প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে বৃহত্ গ্রুপে পরিণত হয়েছে।

সামপ্রতিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এসব বড় বড় গ্রুপের উদ্যোক্তাদের ভুগিয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাক পুড়িয়ে দেয়ায় লাখ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। যথাসময়ে ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়ে ডিসকাউন্ট এমনকি অর্ডার বাতিলে বড় অংকের ক্ষতির শিকার হয়েছেন। পরবর্তীতে পুলিশের বিশেষ প্রহরায় কোনমতে বন্দরে পণ্য পাঠানো হয়েছে। এসব এলাকার শিল্প কারখানার উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি অবকাঠামো ও গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট মেটানো সম্ভব হলে লাখ লাখ বেকার মানুষের কর্মকসংস্থান করা সম্ভব। বেড়ে যাবে প্রবৃদ্ধির হার।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ৭৫ একর জমির উপর গড়ে উঠেছে দেশের বৃহত্ এনভয় গ্রুপের এনভয় টেক্সটাইল । সব মিলিয়ে কেবল এই টেক্সটাইলেই রয়েছে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকার পুঁজি।

এই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে বেসরকারি উদ্যোক্তারাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিবারই সৃষ্ট অনিশ্চয়তা অর্থনীতিকে ভীষণ ভোগাচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হবে।’

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মদনপুর এলাকায় রয়েছে জাহিন নিটওয়্যার ও জামালউদ্দিন টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। প্রায় ১৮শ’ শ্রমিক কাজ করে এই দুটি কারখানায়। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সাবেক সহ-সভাপতি এম জামালউদ্দিন জানিয়েছেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় গত বছরের অক্টোবর থেকে পরবর্তী তিন চার মাস বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে পার করেছেন। তিনি বলেন, এই খাতটি যেহেতু অনেকগুলো প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত তাই কোন এক জায়গায় বাধাপ্রাপ্ত হলে গোটা প্রক্রিয়ায় বিরূপ প্রভাব ফেলে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে ঘিরে অর্থনৈতিক করিডোর ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। একসময় সরকারের পরিকল্পনায় থাকলেও ব্যক্তিখাতই করিডোরে রূপান্তর করেছে। মহাসড়কের পাশেই মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় গার্মেন্টস পল্লীর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এই পল্লীকে কেন্দ্র করেও আরো শিল্পকারখানা স্থাপনের ব্যাপক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তাহিদুর রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে মাল আনা নেয়ার সুবিধা রয়েছে এখানে। তবে অবকাঠামোগত সমস্যা যেমন গ্যাস-বিদ্যুত সংকটের সমাধান করা জরুরী। সর্বোপরি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশই এখানে অগ্রগণ্য হওয়া উচিত। ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে রাখা গেলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ তার আসন আরো পাকাপোক্ত করতে পারবে।’

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here