চীনের পেইচিংয়ে গ্রেট হল অব পিপলে (বাঁ দিক থেকে) উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের স্ত্রী রি সোল জু, উন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ও তাঁর স্ত্রী পেং লাইইউয়ান। চীনের বার্তা সংস্থা সিনহুয়া গতকাল ছবিটি প্রকাশ করে। ছবি : এপি

আন্তঃকোরীয় আর যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া বৈঠক নিয়ে যেখানে কিম জং উনের ব্যস্ত থাকার কথা, সেখানে তিনি হুট করে চীন সফর গেছেন। এ ব্যাপারে বিশ্লেষকদের আলোচনা অন্যতম একটা বিন্দুতে গিয়ে স্থির হচ্ছে। সেটা হলো, উত্তর কোরিয়ার একমাত্র সামরিক মিত্র চীনের পূর্ণ সমর্থন নিশ্চিত করে তবেই অন্যদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চান উন।

 

বাবার মৃত্যুর পর ২০১১ সালে উন যখন কোনো আনুষ্ঠানিক পদ ছাড়াই রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণ করেন, তখন থেকে গত সোমবারের আগ পর্যন্ত তিনি দেশের বাইরে পা রাখেননি। এত দিন ধরে তিনি দেশের ভেতর নিজের ভিত যতটা পেরেছেন শক্ত করেছেন। আপন মামা থেকে শুরু করে অনেককে সরিয়ে দিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সর্বোচ্চ শক্তিশালী করার জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনের দীর্ঘদিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে গেছেন। গত ডিসেম্বরে তিনি উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্রধর রাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছেন।

উনের এসব কর্মকাণ্ড একমাত্র মিত্র চীনের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছে, অন্তত বিশ্লেষকদের সেটাই অভিমত। উত্তর কোরিয়ায় নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের সাবেক কূটনীতিক ও বর্তমানে বিশ্লেষক সংস্থা চ্যাটহ্যাম হাউসের কর্মকর্তা জেমস হয়ার বলেন, উত্তর কোরিয়া-চীন সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভালো যায়নি। সর্বশেষ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ উত্তর কোরিয়ার ওপর যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাতে চীন সায় দেওয়ায় এবং নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করায় সম্পর্ক আরো খারাপ হয় বলে অভিমত এ বিশ্লেষকের। না বললেই নয়, একমাত্র সামরিক মিত্র চীন উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারও।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একাকী উত্তর কোরিয়া আরো একা হয়ে যায়। সদ্য অর্জন করা পরমাণু শক্তির ওপর ভর করে উত্তর কোরিয়া একা যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশের সঙ্গে আলোচনায় যাওয়ার আগে চীনের সমর্থন নিশ্চিত করতে চাচ্ছে—এমনটা মনে করেন পেইচিংয়ে কার্নেগি সিংহুয়া সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসির বিশেষজ্ঞ তং ঝাও। তিনি বলেন, ‘তারা (উত্তর কোরিয়া) জানে, (যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে) বৈঠকটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণও। অনেক রকম অনিশ্চয়তা রয়েছে। বৈঠক ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়ে দিতে পারে, কূটনীতি ব্যর্থ হয়েছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র আরো জবরদস্তির দিকে যেতে পারে, এমনকি সামরিক হামলাও চালাতে পারে। চীনের সঙ্গে একটা স্থিতিশীল আর ইতিবাচক সম্পর্ক থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা চীন ঠেকাবে।’ এসব বিবেচনা করেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের আমন্ত্রণ পেয়ে পেইচিং যেতে দ্বিধা করেননি উন। আগামী মে মাসের মধ্যে উন-ট্রাম্প বৈঠক হওয়ার কথা।

যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়ার মধ্যে শান্তি স্থাপন প্রক্রিয়ায় এত দিন চীন দৃশ্যত অনুপস্থিত থাকলেও উনের পেইচিং সফরের মধ্য দিয়ে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে বলে মনে করেন ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের জ্যেষ্ঠ সদস্য অঙ্কিত পাণ্ডে। দুই মাস ধরে উন-ট্রাম্পের মধ্যে দূতিয়ালির কাজটা করছে দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু এবার চীন সক্রিয় হয়ে উঠবে বলে মনে করেন অঙ্কিত পাণ্ডে। তাঁর মতে, চিনপিংয়ের আমন্ত্রণে উনের পেইচিং সফরের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে গেছে, চীন এখানে কতটা প্রাসঙ্গিক। দেশের শাসনভার নেওয়ার পর এবারই প্রথম উন বিদেশ সফর করলেন এবং সফরের জন্য তিনি চীনকেই বেছে নিয়েছেন। গত সোমবার কঠোর নিরাপত্তা গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে উন সেখানে যান।

উনের পেইচিং সফরের পেছনে উন-চিনপিংয়ের ভবিষ্যত্ পরিস্থিতিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। এ দুই সীমানা প্রতিবেশীর রাষ্ট্রক্ষমতা অনির্দিষ্টকালের জন্য এ দুজনের ওপরই ন্যস্ত হয়েছে। উন আগেই দেশে তাঁর সর্বোচ্চ ক্ষমতা নিশ্চিত করেছেন। আর গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার দুই মেয়াদের বিধানটি তুলে দিয়ে সংবিধান সংশোধন করেছেন চিনপিং। এতে তাঁর নিজেরই অনির্দিষ্টকালের জন্য চীনের প্রেসিডেন্ট থাকার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। ফলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উভয় বিচারে চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন উনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সূত্র : বিবিসি, সিএনএন।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here