বিকেল পৌনে ৪টা। আইসিইউ থেকে একজন নার্স এসে বললেন, ‘১২ নম্বরের আফসানার লোক কারা?’ একজন তরুণী এগিয়ে গিয়ে বলেন, ‘আমি আছি। আমার নাম শিল্পী। আমি চাচাতো বোন হই।’ তাঁকে ভেতরে নেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পর একটি ছোট প্যাকেট নিয়ে বের হলেন শিল্পী। তিনি জানালেন, আফসানার পরনের হালকা গয়নাগুলো খুলে তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। অবস্থা জানতে চাইলে তিনি কাঁপাকণ্ঠে বলেন, ‘এখন আর কোনো সাড়া নেই। অপারেশনের পরও নড়ছিল।’ হাসপাতালে নীরবে বসে থাকতে দেখা যায় আরো কয়েকজন স্বজনকে। তারা এতটা বিমর্ষ ছিল, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চাইল না।

হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) দায়িত্বশীলরা জানান, আফসানার অবস্থা চরম সংকটাপন্ন। তাঁকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দিয়ে (লাইফ সাপোর্ট) রাখা হয়েছে। আফসানা খানম নেপালে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বিমান দুর্ঘটনায় নিহত পাইলট আবিদ সুলতানের স্ত্রী। গতকাল সোমবার দুপুরে তাঁর মৃত্যুর গুজবও ছড়িয়ে পড়েছিল। বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যখন আফসানার স্তব্ধ স্বজনদের দেখা গেল, ঠিক তখনই বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে তাঁর স্বামী আবিদ সুলতানের লাশ হস্তান্তর ও জানাজার প্রক্রিয়া চলছিল। হাসপাতাল থেকে ছুটে স্টেডিয়ামে গিয়ে দেখা যায়, আবিদ-আফসানার একমাত্র ছেলে তানজিব বিন সুলতান মাহিকে ঘিরে শোকে স্তব্ধ আরেক দল স্বজন।  সাংবাদিকদের  ১৫ বছরের মাহি বলে, ‘আমার কিছু বলা পসিবল না!’ আফসানার বাবা এম এ কাশেম শেখ বলেন, ‘বাবা, আমার মেয়েটার জন্য দোয়া করেন। মাহির জন্য দোয়া করেন। আমাদের শোক জানানোর ভাষাও নাই।’

গতকাল বিকেলে নানা, চাচা, বাবার বন্ধুসহ আত্মীয়দের সঙ্গে কিশোর মাহিই আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁর বাবার লাশ গ্রহণ করে। গতকাল বাবার লাশ গ্রহণের সময় ছলছল চোখে অপলক তাকিয়ে ছিল মাহি। স্বজনরা এসে বারবার তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। পরে বনানী কবরস্থানে আবিদের লাশ দাফন করা হয়। স্বজনরা জানায়, আফসানাও ঝুঁকিতে আছেন বলে উত্তরা বা মিরপুরের বাসায় আবিদের মৃতদেহ নেয়নি তারা।

আর্মি স্টেডিয়ামে আবিদের বন্ধু মাহিম হোসেন বলেন, ‘ছেলেটাকে নিয়ে আমরা এক অন্য রকম কষ্টের মধ্যে আছি। এইটুকু বাচ্চা, কী করে এই শোক সামলাবে। ভাবির (আফসানা) অবস্থা আরো ক্রিটিক্যাল হয়েছে। তবে ফাইনাল কমেন্ট এখনো করেননি চিকিৎসক।’

আবিদের আরো দুই বন্ধু জানান, দুর্ঘটনার পর স্বামীর মৃত্যু সংবাদটি শুনে কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না আফসানা। অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। পরে তিনি বেঁচে আছেন জেনে একটু স্বাভাবিক হন। তবে পরদিন যখন মৃত্যুর খবরটি ফের নিশ্চিত করা হয় তখন তিনি শোকে একেবারেই ভেঙে পড়েছিলেন। শনিবার রাতেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। আফসানার আত্মীয় শামীমা নার্গিস জানান, গত রবিবার ভোরে প্রথমে আফসানাকে উত্তরার একটি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে নিউরোসায়েন্সে আনা হয়।

গতকাল নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ও মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান ড. সিরাজি শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আফসানার মাথার ডান পাশে রক্ত জমাট বাঁধার পর রবিবার সকালে জরুরি অপারেশন করা হয়। রবিবার রাতে আরেকবার স্ট্রোক করেন আফসানা। এরপর তাঁর আরেক দফা অপারেশন হয়। অপারেশন শেষে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। তাঁর অবস্থা ক্রিটিক্যাল দেখে আমরা আবার অপারেশন থিয়েটারে নিই। তাঁর অপারেশন করা হয়। পরে আবার আইসিইউতে রাখা হয়েছে। তিনি অবজারভেশনে আছেন। তিনি বর্তমানে কোমায় আছেন। আগামী ৭২ ঘণ্টার আগে কিছুই বলা যাবে না।’ জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক বদরুল আলম বলেন, ‘আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। ওনার চিকিৎসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আগামীকাল আরো (আজ) একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হবে।’

আবিদের ভাই মাহমুদ খুরশিদও একজন চিকিৎসক। গতকাল দুপুরে নেপাল থেকে নিহতদের মরদেহ দেশে আনার আগে আগে ইউএস-ফ্লাইটে অন্য স্বজনদের সঙ্গে তিনিও দেশে ফিরেছেন। তিনি বলেন, ‘জানাজা শেষ করে আমরা হাসপাতালে খোঁজখবর নেব। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বললেই সর্বশেষ পরিস্থিতি বুঝতে পারব।’

স্বজনরা জানায়, আবিদের গ্রামের বাড়ি নওগাঁর রানীনগরে। তাঁর বাবা প্রয়াত এম এ কাশেমও ছিলেন বৈমানিক। রাজধানীর পল্লবীতে তাঁর ‘শতাব্দী রোজ’ নামে একটি বাড়ি আছে। আবিদরা চার ভাই ও এক বোন। এর মধ্যে আবিদ দ্বিতীয়। আফসানার বাবা এ কাশেম শেখ একজন চিকিৎসক। তাঁদের গ্রামের বাড়ি নাটোরে। তবে রাজধানীর মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকায় থাকেন। আবিদ ও আফসানা দম্পতির একমাত্র সন্তান মাহি উত্তরার মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ‘ও’ লেভেলের ছাত্র। ছেলেকে নিয়ে তাঁরা উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের ৩৮ নম্বর বাসায় থাকতেন।

শেয়ার করুন
  • 10
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here