উত্তম চক্রবর্তী ॥
সময়ের ব্যবধানে পাল্টে যাচ্ছে নির্বাচনী মাঠের চিত্র! মাত্র দু’মাসের আগের তুলনায় বর্তমানে রাজনীতির মাঠের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। সময়ের ব্যবধানে এখন নির্বাচনী কৌশলী খেলায় উজ্জীবিত ও ঐক্যবদ্ধ শাসক আওয়ামী লীগসহ মহাজোট। বিপরীতে হতাশ-সিদ্ধান্তহীনতায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। দু’মাসের ব্যবধানে রাজনীতির মাঠের এই উল্টো চিত্র পাল্টে দিচ্ছে নির্বাচনী জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশও।
তফসিল ঘোষণা মাত্রই দেশ অচল করার বিরোধী দলের হুমকি, আর তা মোকাবেলায় শাসক দলের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক রণপ্রস্তুতিতে রাজনীতির মাঠে উত্তাপ-উত্তেজনা ছড়ালেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী হার-জিতের হিসাব নিকাশ করতেই ব্যস্ত এখন দেশের প্রধান দুই দল। দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার মধ্যেই আগামীকাল সোমবার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু এখনও বিরোধী দলের মাঠের নেতারা নিশ্চিত নয় আদৌ তাঁরা নির্বাচনে যাচ্ছে কিনা। অন্যদিকে শাসক দলের নেতারাও শতভাগ নিশ্চিত নয় যে বিরোধী দল নির্বাচন বর্জনের পথেই হাঁটবে, নাকি শেষ পর্যন্ত অংশ নেবে।
দু’পক্ষের মধ্যে চলা সংলাপ নাটক আর বৈপরীত্য অবস্থানের মধ্যে শাসক দল আওয়ামী লীগ সর্বশক্তি নিয়ে নির্বাচনী ট্রেনে উঠে পড়লেও কার্যত বিরোধী দল এখনও নির্বাচনী প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ নাকি বর্জন- বিরোধী দলের এই সিদ্ধান্তহীনতার সুযোগে অনেকটাই মাঠ গুছিয়ে নিয়েছে সরকারী দলটি। অন্যদিকে শেষ পর্যন্ত বর্জনের পথে হাঁটলে সরকারের বিরুদ্ধে ঠিক কতটুকু প্রতিরোধ গড়তে তোলা সম্ভব হবে- এ নিয়ে সন্দিহান খোদ বিরোধী দলের নেতারাই। জনসমর্থনহীন শুধু জামায়াতের সন্ত্রাসী ও ক্যাডারদের ওপর ভর করে নাশকতার মাধ্যমে কতটুকু লক্ষ্য অর্জিত হবে, আর নির্বাচনে না গেলে শেষ পর্যন্ত দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা যাবে কিনা, জোটের নেতাদের মধ্যে সৃষ্ট এই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে সময়ের ব্যবধানে নির্বাচনী খেলায় আরও ‘ব্যাকফুটে’ ধাবিত করছে বিরোধী দলকে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর প্রতিক্রিয়ায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলে সে মুহূর্তে থেকেই দেশ অচল করে দেয়া হবে। এখন আমাদের সর্বাত্মক আন্দোলন ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। এমন একতরফা নির্বাচন কোনভাবেই হতে দেবে না বিএনপি। আর এই সরকারকেও আর ক্ষমতায় আসতে দেয়া হবে না।
তবে বিএনপির এমন হুমকিকে তেমন আমলেই নিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সদ্যনিযুক্ত খাদ্য, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আমির হোসেন আমু তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, দেশ অচল করার হুমকিই প্রমাণ করেছে, বিরোধী দল নির্বাচন ও গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। নির্বাচন বানচালের এমন অপচেষ্টা তাদের নির্বাচন বিরোধী অবস্থানের প্রমাণই তুলে ধরেছে। তবে তাদের সরকার পতনের হুমকি দেশবাসী অনেকবারই দেখেছে। নির্বাচনে না এসে এমন হুমকি-ধমকি দিয়ে কোন লাভ হবে না।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত পাঁচ সিটি নির্বাচনের পর রাজনীতির মাঠের চিত্র ছিল অনেকটাই বিপরীত। ক্ষমতায় থাকার পরও এই পাঁচ সিটিতে শোচনীয় পরাজয়ের পর সারাদেশেই শাসক দলটির নেতাকর্মীরা হতাশ ও বিব্রতকর অবস্থায় ছিল। জোটের শরিকরাও সরকারের কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি মহাজোট থেকে বেরিয়ে আসারও হুমকি দিয়ে আসছিল। এমনকি জোটের প্রধান শরিক জাতীয় পার্টির বিরোধী দলের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ‘নির্বাচন বয়কট’-এর হুমকি বেকায়দায় পড়তে হয় শাসক দলটিকে।
বিপরীতে উজ্জীবিত ছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। সিটি নির্বাচন পরবর্তী মাঠের জনমত জরিপেও নির্বাচনী হিসাব-নিকাশে অনেক দূর এগিয়ে যায় বিরোধী পক্ষ। নির্বাচন হলেই বিএনপির বিজয় অবশ্যম্ভাবী- এমন আত্মবিশ্বাসে বিরোধী দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা চাঙ্গা হয়ে ওঠে। ক্ষমতার হালুয়া-রুটির ভাগ পেতে প্রায় সাড়ে চার বছর পর্যবেক্ষণে থাকা কিছু সুযোগসন্ধানী দল, সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গরাও ভিড় জমায় বিএনপির পক্ষে।
কিন্তু সরকারের শেষ নির্বাচনী খেলায় কার্যত হেরে যাওয়া বিরোধী দলের মাঠের চিত্র এখন ঠিক বিপরীত। বিএনপি নয়, আওয়ামী লীগই আবার ক্ষমতায় আসছে- এমন আশঙ্কায় সিটি নির্বাচনের পর জমজমাট বিরোধী দলের রাজনৈতিক কার্যালয়গুলো এখন কার্যত নেতাকর্মী শূন্য। হালুয়া-রুটির ভাগের আশায় ভিড় জমানো ওইসব ব্যক্তিবর্গরাও এখন প্রকাশ্য পাশে নেই বিএনপির।
দু’মাসের ব্যবধানে কেন রাজনীতির মাঠে এমন বিপরীত চিত্র? এর অনুসন্ধান করে জানা গেছে, মূলত দু’নেত্রীর মধ্যে প্রায় ৩৫ মিনিটের ফোনালাপের পরই পাল্টে গেছে নির্বাচনের হিসাব নিকাশ। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে বিরোধী দলীয় নেত্রীর ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ আচরণ, সমঝোতার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে হরতালের নামে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, শিশুসহ ক’জন মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা, লাখ লাখ ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়া এবং প্রকাশ্য যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থানে দেশবাসীর মনে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
বিশেষ করে বিএনপির মদদে সন্ত্রাসী দল জামায়াতের দেশব্যাপী নাশকতামূলক তৎপরতা ও ধ্বংসযজ্ঞ বিক্ষুব্ধ করে তোলে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়সহ দেশের শ্রেণী-পেশার মানুষকে। আরও জানা গেছে, হেফাজতের ঘটনা নিয়ে বিরোধী দল সুকৌশলে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে শাসক দলটির সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করতে পারলেও তা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেনি। সময়ের ব্যবধানে জনগণের সামনে শাসক দলটি ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র, বিরোধী দলের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে দালিলিক প্রমাণ তুলে ধরে জনসমর্থন আদায়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়। সর্বশেষ হেফাজতের আমীর আল্লামা শফী হুজুরের ‘তেঁতুল তত্ত্ব’ ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে দেশের নারী সমাজের মধ্যে।
অন্যদিকে জামায়াত-হেফাজতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ধ্বংসাত্মক তৎপরতায় এতদিন মান-অভিমানে দূরে থাকা স্বাধীনতার পক্ষ শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সর্বশেষ জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বহুদলীয় অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর রাজনীতির চিত্রই পাল্টে যায়। শুধু তাই নয়, বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বর্জন করলে দলটি এবং ১৮ দলীয় জোটের অনেক নেতারই সরকারের সঙ্গে গোপণ যোগাযোগের ঘটনা দৃশ্যপট বদলে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচন হলে এখন আওয়ামী লীগই আবার ক্ষমতায় আসবে, এমন দৃশ্যপট ফুটে ওঠায় সারাদেশেই দলটির নেতাকর্র্মীরা দ্বিগুণ হারে চাঙ্গা হয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েছে। দিন যতই গড়াচ্ছে নির্বাচনের পক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন ততই বাড়ছে। সর্বশেষ একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত জরিপেও উঠে এসেছে, মাত্র দু’মাসের ব্যবধানে বিরোধী দলের জনপ্রিয়তায় মারাত্মক ধস নেমেছে, অন্যদিকে সরকারের পক্ষে সমর্থন বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ সমমনা দলগুলোর নেতারা এখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারণ করছেন- বিরোধী দল নির্বাচনে আসলেও বিপুল ভোটে মহাজোটই ফের ক্ষমতায় আসবে। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই নির্বাচন বানচালের জন্য বিরোধী দল ষড়যন্ত্র করছে বলেও অভিযোগ তাদের।
বর্তমান রাজনীতির নির্বাচনী মাঠের প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠেছে লন্ডনভিত্তিক বিশ্বখ্যাত ‘দ্য ইকোনোমিস্ট’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখায়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বিএনপি সাধারণ নির্বাচন বয়কট করলে দলটির নেত্রী খালেদা জিয়ার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। দলের বেশিরভাগ নেতা নির্বাচনে অংশ নিতে ব্যাকুল। নির্বাচন বয়কট করলে দল ভাঙ্গনের ঝুঁকিতে পড়বে বিএনপি। আর বিএনপি নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।
ইকোনোমিস্টের মতোই বর্তমানে দেশের রাজনীতির মাঠের অবস্থা বলে স্বীকার করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরাও। তাঁদের মতে, একদিকে জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ আর অন্যদিকে দল ভাঙ্গনের ঝুঁকি এড়াতে শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। সবাই আশাবাদী, শেষ পর্যন্ত সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা হবে। সবার অংশগ্রহণেই একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর নির্বাচনে না আসলে ভুলের মাশুল বিএনপিকেই গুণতে হবে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here