দেড় বছর ধরে শামীম সরদার নামে চট্টগ্রামের এক পরিবহণ ব্যবসায়ীর কোনো হদিস পাচ্ছে না তার পরিবার। পরিবারের অভিযোগ, ২০১৬ সালের ৩১ জুলাই চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার ফকিরহাট এলাকায় নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শামীম ও তার স্ত্রীসহ নয়জনকে তুলে নিয়ে যায় ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম। সেখানে ১০ দিন আটক রাখার পর শামীমের স্ত্রী চম্পা বেগম ও গৃহকর্মী মিনারা বেগমকে ছেড়ে দেয়া হয়। ডিবি’র একটি টিম এই দু’জনকে মাইক্রোবাসে করে পুনরায় সীতাকুন্ডে তাদের বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে যায়। বাকি সাতজনের মধ্যে ছয়জনকে ঢাকার সবুজবাগ ও খিলক্ষেত থানায় দায়ের হওয়া ইয়াবা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু আটক শামীম সরদারের ভাগ্যে কী ঘটেছে কিংবা আদৌ বেঁচে আছে কিনা, সে ব্যাপারে কিছুই জানে না পরিবার।

চম্পা বেগম গতকাল রবিবার ইত্তেফাককে জানান, গত দেড় বছরে তিনি দফায় দফায় ঢাকার মিন্টো রোডে ডিবি অফিসে গিয়ে তার স্বামীর অবস্থান জানতে চেয়েছেন। তারা বরাবরই বলেছে শামীম তাদের হেফাজতেই রয়েছে। স্বামীর মুক্তির জন্য এ পর্যন্ত কয়েক দফায় ডিবিকে ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন বলেও দাবি করেন চম্পা। তবে আজও তার হদিস পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ ডিবি তাকে জানিয়েছে যে তারা কখনো শামীমকে গ্রেফতারই করেনি। ডিবি’র টিম বাসা তল্লাশির নামে তাকে হয়রানি করছে বলেও অভিযোগ করে চম্পা জানান, গতকাল (রবিবার) ৬/৭ জন ডিবি সদস্য চট্টগ্রাম নগরীর সিটি গেট এলাকায় তার বাসায় এসে তল্লাশির চেষ্টা করে। তবে তিনি তাদেরকে তল্লাশির অনুমতি দেননি। চম্পা বলেন, ডিবি সদস্যরা তল্লাশির সময় বাসায় ইয়াবা রেখে আমাকে গ্রেফতার করতে পারে। এই ভয়ে আমি তল্লাশিতে বাধা দিয়েছি। তাদেরকে বলেছি, আগে আমার স্বামীর সন্ধান দিতে। কিন্তু তারা বলেছে সে (স্বামী) কোথায় আছে তা তারা জানে না। চম্পা বেগমের ধারণা, তার স্বামীকে গুম করে ফেলা হয়েছে। তিনি বলেন, আমার স্বামীকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে অভিযুক্ত করে তুলে নিয়েছিল ডিবির ওই টিম। তারা আমাকেও একইভাবে ফাঁসিয়ে দিতে পারে।

এদিকে, ডিবি’র ওই টিমের সদস্যদের বিরুদ্ধে গত বছর ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছেন চম্পা বেগম। মামলায় আসামি করা হয়েছে- বিপ্লব কুমার শীল (পরিদর্শক নিরস্ত্র) বর্তমানে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট, এসআই অহিদুর রহমান, এসআই মো. আবদুর রউফ তালুকদার, এসআই অহিদুর রহমান, এসআই নৃপেন কুমার ভৌমিক, এএসআই মো. মোতাহের হোসেন, এএসআই মোহাম্মদ জহুরুল হক, মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, কনস্টেবল বিনয় বিকাশ চাকমা, কনস্টেবল আফজাল হোসেন ও কনস্টেবল আবদুর রশীদ। আসামিদের সবাই ঢাকা ডিবি ও কাউন্টার টেরোজিম ইউনিটে কর্মরত বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। আদালত অভিযোগটি গুরুতর বিবেচনায় নিয়ে তদন্তের জন্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মর্যাদার একজন কর্মকর্তা নিয়োগ এবং এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দিয়েছেন। পিবিআই, চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মঈন উদ্দীন ইত্তেফাককে বলেন, আদালতের নির্দেশের কপি এখনও আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। আশা করি দ্রুত পেয়ে যাব। তদন্তে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

চম্পা বেগম ইত্তেফাককে বলেন, তাঁর স্বামী একজন পরিবহণ ব্যবসায়ী। তাকে টাকার জন্য ইয়াবা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। ইয়াবার মূল ব্যবসায়ী কক্সবাজারের সালাহউদ্দিন। আমার স্বামীর কাছ থেকে সে গাড়ি ভাড়া করত। কিন্তু ইয়াবা ব্যবসায় আমার স্বামী জড়িত ছিল না। চম্পা বেগম বলেন, তার স্বামীর সঙ্গে ডিবি সালাহউদ্দিনকেও আটক করেছিল। একবছর আগে সে (সালাহউদ্দিন) জামিনে বের হয়ে গেছে। মামলার বাকি ৬ আসামি আমার পরিবারের সদস্য। তাদের ৫জনই এখনো কারাগারে আটক। আর আমার স্বামীর কোনো খোঁজই পাচ্ছি না। তিনি বলেন, স্বামী বেঁচে আছে না মেরে ফেলা হয়েছে দেড় বছর পরও নিশ্চিত হতে পারছি না। মেরে ফেলা হলে লাশটি পাওয়ারতো অধিকার রাখি। তিন অবোধ সন্তান তাদের বাবার জন্য কান্নাকাটি করে। তাদের কোনো জবাব দিতে পারি না। তাদের মুখের দিকে তাকাতে পারি না।

 

সুত্রঃ ইত্তেফাক

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here