image_84412
রাজধানীর মতিঝিলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগের নেতা ও পরিবহন ব্যবসায়ী খায়রুল আলম মোল্লাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়ছে। তার পরিবারের অভিযোগ, সায়েদাবাদ আন্ত:জেলা বাস টার্মিনালের টোল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জের ধরে তাকে হত্যা করা হয়েছে। আর শ্রমিক সংগঠনের সূত্রগুলো বলছে, কিশোরগঞ্জের শ্রমিক কমিটি বাতিলের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গতকাল পরিবহন ধর্মঘট ডেকে ছিল পরিবহন মালিক সমিতি। তিনদিনের টানা হরতালের পর একদিন শুধু অফিস খোলা ছিল। তার পরের দিন আবার পরিবহন ধর্মঘট। যদিও শেষ পর্যন্ত দুপুর ১২টার পর হরতাল প্রত্যাহার করা হয়। তারপরও দিনের শুরুটা ছিল চরম ভোগান্তির।

পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষার কথা বিবেচনা করে মালিক পক্ষ দুপুর ১২টার পর ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয়। যদিও এই পরীক্ষা দু’টি ছিল দুপুর সোয়া ২টার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সকাল থেকেই ছিল গোটা রাজধানীতে প্রায় অর্ধডজন পরীক্ষা। সেইসব পরীক্ষার পরীক্ষার্থীরা অন্তহীন দুর্ভোগের মধ্যে পড়েন। পাশাপাশি হরতালের কারণে অনেক অফিস এখন শুক্রবারও খোলা থাকে। ফলে অফিসের উদ্দেশে বের হওয়া মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন। দুপুরের পর যানবাহন চলাচল শুরু হলে দেখা দেয় দীর্ঘ যানজট।

অভিভাবকরা বলেছেন, পরিবহন ধর্মঘটের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়ে শিক্ষার্থীরা। যানবাহন না থাকায় অনেকেই যথাসময়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হতে পারেনি। এমনকি অনেকে পরীক্ষায়ও অংশ নিতে পারেনি।

পরীক্ষার্থীরা বলেন, পরিবহন ধর্মঘটের বিষয়টি তারা আগে থেকে জানতো না। তাই এ বিষয়ে বিকল্প কোন প্রস্তুতি ছিল না। সকালে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য বাসের অপেক্ষা করেও কোন লাভ হয়নি। ফলে বিলম্বে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে। অনেকে পুনরায় পরীক্ষা নেয়ার দাবিও জানান। গতকাল জেএসসির ‘বাংলা প্রথম পত্র’ এবং জেডিসির ‘কোরআন মাজীদ ও তাজবিদ’ বিষয়ের পরীক্ষা দুপুর সোয়া ২টা থেকে শুরু হয়। এই পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৯ লাখ দুই হাজার ৭৪৬ জন শিক্ষার্থী। এর আগে সকালে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা সকাল ১০ টায় শুরু হয়। এই পরীক্ষায় অংশ নেন ৯ লাখ ৬৮ হাজার ১২৭ জন।

এর বাইরেও গতকাল দেশের পাঁচটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ টেক্সাইল বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সি’ ইউনিট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খ’ ইউনিট ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ টেক্সাইল বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরাও চরম ভোগান্তিতে পড়েন। ফার্মগেট থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেও কোন যানবাহন না পাওয়ায় অনেকে পায়ে হেঁটে পরীক্ষা কেন্দ্রে রওনা হন। মিরপুর থেকে অনেকে রিকশা চড়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে উপস্থিত হন। কেউ কেউ যথসময়ে গিয়ে পৌঁছাতে পারলেও অনেকে পারেননি। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই পরীক্ষার্থীদের একটি অংশ পুনরায় পরীক্ষা নেয়ার দাবি জানান।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির এই ধর্মঘটের কারণে সকাল থেকে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে বাস চলাচল প্রায় বন্ধ ছিল। দুপুর ১২টা পর্যন্ত হাতে গোনা কিছু বাস চলাচল করতে দেখা গেছে। ধর্মঘটের সুযোগে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির দখলে ছিল রাজপথ। তবে বাস চলাচল না করায় দুর্ভোগে পড়ে সাধারণ মানুষ। মোড়ে মোড়ে সাধারণ যাত্রীদের জটলা দেখা যায়। দু-একটি খালি বাস দেখলেই যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে উঠতে গেলেও বাসগুলো যাত্রী না নিয়েই চলে যায়। আবার যে কয়েকটি বাস চলাচল করেছে, সেগুলোতে ছিল উপচেপড়া ভিড়। আর এ সুযোগে অটোরিকশার চালকেরা হাঁকিয়েছেন চড়া ভাড়া। অনেক যাত্রী গন্তব্যে পৌঁছেছেন ট্রাক বা পিকআপে করে। এমনকি নারী যাত্রীদেরও ট্রাক ও পিকআপে উঠতে দেখা গেছে। অনেককে আবার গন্তব্যের উদ্দেশে হেঁটে রওনা হতে দেখা গেছে।

মিরপুর-১০ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষারত আমিনুর রহমান সকাল সাড়ে নয়টার দিকে জানান, ১০টার দিকে তার টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরীক্ষা হওয়ার কথা। তেজগাঁও কলেজে তার সিট পড়েছে। তখনো পর্যন্ত তিনি কোনো পরিবহন পাননি। রিকশা ভাড়াও দ্বিগুণ চাচ্ছে। রিকশাচালক বলেন, রিকশা নেমেছে প্রচুর। যাত্রী যেহেতু বেশি, তাই ভাড়া একটু বেশি তো চাইবেই। জুরাইন থেকে কাওরান বাজার এসেছেন রহিম নামের একজন। তিনি জানান, নয়টায় বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় কোনো বাস না পেয়ে লেগুনায় চড়ে তিনি দয়াগঞ্জে আসেন। এরপর হেঁটে পল্টন মোড় পর্যন্ত আসতে হয় তাকে। সেখান থেকে পিকআপ ভ্যানে করে বাংলামোটর। এরপর আবার হেঁটে কাওরান বাজার। মোহাম্মদপুর থেকে গুলশানের দিকে যাওয়া যাত্রী রোকন উদ্দিন জানান, হরতালে অফিসে কাজ হয়নি। তাই আজ তাদের গুলশানের অফিসে যেতে বলা হয়েছিল। সকালে বাস স্টপেজে গিয়ে জানতে পারেন পরিবহন ধর্মঘট। কিছু না পেয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া জানতে চাইলে দাম হাঁকা হয় ৩০০ টাকা। শেষ পর্যন্ত তিনি বাসস্ট্যান্ডে লেগুনা বা অন্য কিছুর জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

মতিঝিল-মোহাম্মদপুর রুটের মৈত্রী পরিবহনের পরিচালক বেলায়েত হোসেন বলেন, মালিক খুনের প্রতিবাদে এই কর্মসূচিতে তারাও একাত্ম। তাই রাজধানীতে কোনো বাস চলাচল করছে না। তিন দিনের হরতাল শেষে দূরপাল্লার গাড়ি চলাচল শুরুর একদিনের মাথায় এই ধর্মঘট আহ্বানের ফলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। কেরানীগঞ্জের মমতাজ বেগম মহাখালীতে যাওয়ার জন্য সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে কদমতলী বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে জানতে পারেন গাড়ি চলছে না। অন্য কোনোভাবে মহাখালী যাওয়ার তেমন সামর্থ্যও নেই তার। সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন টার্মিনালগুলোর সামনে পরিবহন শ্রমিকদের লাঠিহাতে অবস্থান দেখা যায়। অন্যদিকে বাস না পেয়ে ভিড় করে ছিল সাধারণ মানুষ। সকাল পৌনে ৯টার দিকে ৬ নম্বর রুটের একটি বাস গুলশান থেকে মহাখালীতে পৌঁছালেই ধর্মঘটকারীরা এর ওপর চড়াও হয়। বাস বের করায় তারা চালককে লাঠি দিয়ে বেদম পেটায়।

মোহাম্মদপুরে পরিবহন শ্রমিকদের বাসের পাশাপাশি টেম্পো ও লেগুনা চালাতেও বাধা দিতে দেখা যায়। গাবতলী ও মহাখালী আন্ত:জেলা বাস টার্মিনালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দূরপাল্লার কোনো বাসই ছেড়ে যায়নি। তবে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বাস ওই টার্মিনালগুলোতে সকালে প্রবেশ করেছে। এদিকে বিভিন্ন কাউন্টার থেকে জানানো হয়, যারা আজকের জন্য দূরপাল্লার অগ্রিম টিকিট কেটেছেন, তাদের ফোন করে টাকা ফেরত দেয়া হচ্ছে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here