sultanaস্বামীর অনুপস্থিতিতে ইউসুফ নবী বন্ধু হয়ে এসেছিল। প্রথম দিকে তাকে প্রশ্রয় না দিলেও শেষটায় গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। ধারণা ছিল একাকিত্ব থেকে মুক্তি পাব। পেয়েও ছিলাম। কিন্তু শেষটায় নানা কারণে সেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক অনেকটা তিক্ততায় পরিণত হয়। পরবর্তীতে জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে নবী। প্রচণ্ড মানসিক চাপে রীতিমত দিশেহারা হয়ে পড়ি। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতেই পরিকল্পিতভাবে নিজ হাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে গলা কেটে হত্যা করি। সহযোগীদের নিয়ে তার দেহ ফেলি নির্জন পাহাড়ি এলাকায়। আর মাথা পুঁতে রাখি মাটির নিচে। খুন করে ক্ষোভ মিটিয়েছি, তবে কয়েক ঘন্টা পর বুঝতে পারি কাজটা ঠিক হয়নি।’

আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে প্রবাস ফেরত যুবক ইউসুফ নবীকে (৩৫) হত্যার এভাবেই বর্ণনা দিলেন গৃহবধূ সুলতানা আক্তার (৩২)। সুলতানার স্বামী রেজাউল করিম গত সাত বছর ধরে ওমান প্রবাসী।

চট্টগ্রামের রাঙ্গু-নিয়ার পদুয়া ইউনিয়নের নারিশ্চা মরমের মুখ স্কুলপাড়া গ্রামের মৃত নুর আহমদের ছেলে ইউসুফ নবী। তিন বছর পর গত জানুয়ারি মাসে ওমান থেকে দেশে ফেরেন তিনি। গত ৯ মার্চ রবিবার পদুয়া ইউনিয়নের সুখবিলাস গ্রামের ধইল্ল্যার পাহাড়ি এলাকা থেকে পুলিশ তার মস্তকবিহীন লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনার পরের দিন ১০ মার্চ ভোরে ফেনীর ছাগলনাইয়ার অলিনগর এলাকা থেকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে সুলতানাসহ চারজনকে গ্রেফতার করে। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের দফতরে। সেখানে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে সুলতানা হত্যার কথা স্বীকার করেন। এরপর তার দেয়া তথ্য মতে পুলিশ একই এলাকার জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে নবীর খণ্ডিত মস্তক। এ ঘটনায় নিহত ইউসুফ নবীর স্ত্রী মনোয়ারা বেগম বাদি হয়ে সুলতানাসহ চারজনকে আসামি করে রাঙ্গুনিয়া থানায় মামলা করেন।

সুলতানা আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদকারী চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ বলেন, সুলতানা জানিয়েছে, তার স্বামী বিদেশে যাওয়ার পর থেকে একই এলাকার ইউসুফ নবীর সঙ্গে তার ‘বন্ধুত্বের’ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যা অনৈতিক সম্পর্কে গড়ায়। পরবর্তীতে নবীও বিদেশে যায়। আর নবী বিদেশ যাওয়ার পর থেকে একই এলাকার আরেক যুবক সুলতান আহমেদের (২৭) সঙ্গে একই ভাবে ‘বন্ধুত্ব’ হয় সুলতানার। এ অবস্থায় জানুয়ারি মাসে দেশে ফেরে নবী। আর নবী ফেরার পর বিষয়টি জানতে পারে। এ নিয়ে নবীর সঙ্গে মতবিরোধ তৈরী হয় সুলতানার। এক পর্যায় নবী বিষয়টি তার প্রবাসী স্বামীকে জানাবার হুমকি দেয়। এরই ফলশ্রুতিতে গত ৮ মার্চ রাতে সুলতানা নবীকে বাড়িতে ডেকে এনে হত্যা করে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি ওয়ালী উল্লাহ অলি বলেন, নবীর ব্যক্তিগত কোন শত্রু ছিল না। ফলে তার লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ পড়ে চরম বিপাকে। কোন ক্লু পাওয়া যাচ্ছিল না। পরবর্তীতে ব্যাপক অনুসন্ধানের পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। মামলার অপর আসামিরা হলেন, সুলতান আহমেদ, সুলতানার ভাই ইস্কান্দার হোসেন ও বাবা ফারুক শাহ। তবে হত্যাকাণ্ডে ফারুক ও ইস্কান্দার জড়িত ছিলেন না। তারা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সুলতানাকে রক্ষা করতে লাশ গুমে সহায়তা করে।

নিহত নবীর পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, নবীর কাছ থেকে এক লাখ টাকা ধার নিয়েছিল সুলতানা (ছোট ভাইকে বিদেশে পাঠাবার জন্য)। সুলতান আহমেদের সঙ্গে সম্পর্ক জানাজানির পর থেকে নবী টাকার জন্য সুলতানাকে চাপ দিচ্ছিল। এ কারণেই সুলতানের প্ররোচনায় নবীকে হত্যার পরিকল্পনা করে সুলতানা। আর হত্যাকাণ্ডের পর সুলতানা তার প্রবাসী স্বামীকে ফোন করে জানায়, নবী খারাপ উদ্দেশ্যে তার ঘরে প্রবেশ করেছিল। এ কারণে তাকে সে হত্যা করেছে।

ওসি জানান, গ্রেফতারের পর সুলতানাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন পড়েনি। সে নিজেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে গত ১১ মার্চ মঙ্গলবার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দি শেষে তাকেসহ আসামিদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here