Report

নেপাল ও ভারতে ফের শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশংকা

নেপাল ও ভারতে আবারও বড়মাপের শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। নেপালের পশ্চিমে এবং ভারতের উত্তরে সম্ভাব্য এই ভূমিকম্পের বিষয়ে আগাম সতর্কবাণী দিয়েছেন তারা। বিজ্ঞানবিষয়ক বিখ্যাত সাময়িকী ‘নেচার জিওসায়েন্স’-এ সম্ভাব্য এ ভূমিকম্পের ভয়াবহতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, যে মাত্রায় ভূমিকম্পের আশংকা করা হয়েছে তাতে তিন থেকে চার লাখ লোকের প্রাণহানি হতে পারে।

সাময়িকীর খবরে বলা হয়েছে, ওই এলাকার ভূগর্ভে যে বিপুল পরিমাণ শক্তি জমা হয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিলের শক্তিশালী ভূমিকম্পে সেই শক্তির সবটা ক্ষয় হয়নি। এর ফলে জমে থাকা শক্তি নিজেকে নিঃশেষ করার জন্য বেছে নিতে পারে ভূমিকম্পের মতো ভয়াল পথ। এটা হতে পারে পশ্চিম নেপালের পোখারাতে ও ভারতের উত্তরাঞ্চলে। আর এ ভূমিকম্পের মাত্রা হতে পারে এপ্রিলের ভূমিকম্পের চেয়েও বেশি। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের একটি দল গত কয়েকমাস গবেষণা করে ‘নেচার জিওসায়েন্স’ সাময়িকীতে ওই নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। তবে বিজ্ঞানীরা নেপালী ও ভারতীয়দের উদ্বিগ্ন বা বিচলিত না হয়ে আরো সাবধান হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প সহনশীলতার বিষয়টিতে কোনোরকম ছাড় না দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। পাশাপাশি সম্ভাব্য এলাকায় নজরদারী বাড়ানোর পরামর্শ তাদের। তবে ভূমিকম্প কবে আঘাত হানবে তা বলা মুশকিল বলেও জানিয়েছেন তারা।

নেপাল ও ভারতে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানলে বাংলাদেশেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশংকা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহদী হাসান আনসারী ইত্তেফাককে বলেন, অতীতে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমানায় যে ভূমিকম্পগুলো হয়েছিলো সেগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত পাঁচশ’ বছরে এ অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়নি। তিনি বলেন, নেপালেও যদি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয় তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। এজন্য তিনি ভূমিকম্প সহনীয় ভবন তৈরির পরামর্শ দেন। বাংলাদেশ সরকার এ খাতে তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বলেও তিনি জানান।

গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক জ্যাঁ-ফিলিপ অভুয়াক   বলেছেন, ‘এই অঞ্চলটি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণের দাবি রাখে। আজই যদি সেখানে একটা ভূমিকম্প হয়, তবে তার ভয়াবহতা হবে ব্যাপক। কেননা গাঙ্গেয় সমভূমিতে শুধু পশ্চিম নেপাল নয়, উত্তর ভারতও অধিক জনঘনত্বের অঞ্চল।’ তিনি আরো বলেন, নেপালের অনেকে বাড়িঘর তৈরিতে তেমন সাবধানতা অবলম্বন করে না। আমি তাদের পরামর্শ দেবো ছোট ছোট বাড়ি তৈরি করতে, যাতে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি এড়ানো যায়। আর স্কুলে স্কুলে শিশু-কিশোরদের ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতনতা ও ভূমিকম্পে জীবন বাঁচাতে করণীয় সম্পর্কে শিক্ষাদানের পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজের আর্থ সায়েন্সের অধ্যাপক জ্যাঁ-ফিলিপ অভুয়াক আরো বলেন, ‘গত ২৫ এপ্রিল আমি যখন শুনলাম নেপালে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে তখন সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো তিন থেকে চার লাখ নেপালি জনসাধারণের মুখচ্ছবি। যে মাত্রায় ভূমিকম্প হয়েছে তাতে তিন থেকে চার লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটার কথা ছিলো। কিন্তু ওই ভূমিকম্প তেমন কম্পন সৃষ্টি করতে পারেনি।’

প্রসঙ্গত, ওইদিন ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল হিমালয় কন্যা নেপালে। এতে প্রায় নয় হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আহত হন হাজার হাজার মানুষ। হাজার হাজার মানুষ হন গৃহহীন। ওই ভূমিকম্পটা হয়েছিল এমন এক ভূতাত্ত্বিকভাবে সংঘর্ষপ্রবণ এলাকায়, যেখানে ইন্ডিয়ান টেকটোনিক প্লেট প্রতিবছর ২ সেন্টিমিটার করে উত্তরভাগকে ঠেলে দিচ্ছে ইউরেশিয়া প্লেটের দিকে। ১৫০৫ সালের পর থেকেই এই হারে দুই প্লেটের মধ্যে ব্যবধান কমছে। বাড়ছে সম্ভাব্য সংঘর্ষের আশংকা। ঘর্ষণের ফলে বাড়ছে চ্যুতিরেখায় জমাট শক্তির পরিমাণ, যার উদ্গীরণ ঘটতে পারে কেবল বড়মাপের একটা ভূমিকম্পের মাধ্যমে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২৫ এপ্রিলের ভূমিকম্পে সেই শক্তির সামান্যই নষ্ট হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জ্যাঁ-ফিলিপ অভুয়াক বলেছেন, ‘ভূমিকম্পটা যদি হিমালয়ের সবদিক থেকেই চালিত হতো, তাহলে এর মাত্রা আরও বেশি হতে পারত।’ তবে জনগণকে বিচলিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অভুয়াক। তার ভাষায়, ‘আমরা জনগণকে উদ্বিগ্ন করতে চাই না। কিন্তু তারা যে জায়গায় বাস করছে তার নিচে বিশাল শক্তি জমে রয়েছে, আমরা মনে করি সে বিষয়টা তাদের জানিয়ে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ।’

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here