শরীফুল ইসলাম ॥ দু’একদিনের মধ্যে দেশের রাজনীতিতে নাটকীয় কোন মোড় না নিলে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনই করবে বিএনপি। এ ব্যাপারে ইতোমধ্যেই দলের হাইকমান্ড মানবিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। সেই সঙ্গে তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে লাগাতার হরতাল-অবরোধ কর্মসূচী পালনেরও প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এদিকে দলটির তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতা নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে উন্মুখ হয়ে আছেন। এ পরিস্থিতিতে বিএনপি নির্বাচনে না গেলে দলের তৃণমূল পর্যায়ে অনেক নেতাকর্মী অন্য দলে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় দলের সর্বস্তরে হতাশা ও বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।
অনেক আগে থেকেই বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ দলের সিনিয়র নেতারা বলে আসছেন নির্দলীয় সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবেন না। আর বিএনপিকে বাদ দিয়ে একতরফা নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে তারা নির্বাচন বর্জনের পাশাপাশি সারাদেশে কেন্দ্র ভিত্তিক সংগ্রাম কমিটি করে সে নির্বাচন প্রতিহত করবে। তবে এ কথা বলার পাশাপাশি বিএনপি হাইকমান্ড আশা করেছিল শেষ পর্যন্ত সংলাপের মাধ্যমে সরকার কিছুটা ছাড় দিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে নির্বাচনে অংশ নেবে। কিন্তু তাদের সে আশা এখন গুড়েবালি হয়ে গেছে। বিএনপির সঙ্গে সংলাপের ব্যাপারে মুখে বললেও সরকারী দলের পক্ষ থেকে কার্যত কোন আগ্রহ প্রকাশ করছে না। এ অবস্থায় বিএনপিও আগ বাড়িয়ে আওয়ামী লীগকে কিছু বলতে চাচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক নেতা জানান, বিভিন্ন জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতারা দশম জাতীয় সংসদে নির্বাচন করার ব্যাপারে পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলেন। এ জন্য তারা কয়েক বছর ধরে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় প্রচুর অর্থকড়িও খরচ করেছিলেন। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা অনেক এলাকায় জনবিচ্ছিন্ন থাকায় বিএনপি নেতাদের অবস্থানও সুদৃঢ় ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে নির্বাচন বর্জনের পথে যাওয়ায় ওইসব নেতারা এখন হতাশ হয়ে পড়ছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে অন্য দলে যোগ দিয়ে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত এক রিপোর্টেও বলা হয়েছে বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মীই নির্বাচনে অংশ নিতে চান। এ পরিস্থিতিতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিএনপি কিভাবে কঠোর আন্দোলন সফল করবে তা নিয়েও দলের হাইকমান্ড চিন্তিত হয়ে পড়েছে। তবে জামায়াতসহ ১৮ দলীয় জোটের অন্য শরিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে তারা আন্দোলন সফল করতে যা যা করা দরকার সে ব্যাপারে একটি ছক কষছে বলে জানা গেছে। এই ছক অনুসারে তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দেশব্যাপী লাগাতার হরতাল-অবরোধ কর্মসূচী পালন করবে তারা। লাগাতার আন্দোলন কর্মসূচী শুরু হলে সারাদেশের সকল স্তরের নেতাকর্মীরা যাতে একযোগে রাস্তায় নেমে আসে সে জন্য ভেতরে ভেতরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করা হয়। এরপর থেকে এ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে বিএনপি। ১৮ দলীয় জোটের প্রতিটি শরিক দলকে এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা হয়। এ দাবি আদায়ে ১৮ দলীয় জোটের ব্যানারে সারাদেশে রোডমার্চ কর্মসূচী পালন করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এ ছাড়া এ দাবি আদায়ে গণঅবস্থান, গণঅনশন ও সমাবেশ মিছিল করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। ঢাকায় সমাবেশ করে দফায় দফায় সরকারকে আল্টিমেটামও দেন খালেদা জিয়া। কিন্তু সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করা সম্ভব হয়নি।
১৮ নবেম্বর রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে সর্বদলীয় সরকারের মন্ত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করান। এতে বিএনপির দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় ১৯ নবেম্বর সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে গিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোটের ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার ব্যাপারে সংলাপের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা করার প্রস্তাব দেন। সেই সঙ্গে নির্দলীয় সরকার ছাড়া তাঁরা নির্বাচনে যাবেন না বলে রাষ্ট্রপতিকে জানান। রাষ্ট্রপতি তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতার মধ্যে থেকে সমঝোতার চেষ্টা করবেন বলে তাদের আশ্বাস দেন। সেই সঙ্গে খালেদা জিয়ার দেয়া লিখিত প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু বিএনপি অপেক্ষায় থাকলেও রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে এখনও কিছু জানানো হয়নি। তাই বিএনপি মনে করছে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সংলাপ বা সমঝোতার ব্যাপারে কোন আশ্বাস না পেলে এবং এর মধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলে তাদের রাজপথে কঠোর আন্দোলনের পথই বেছে নিতে হবে।
নির্দলীয় সরকারের ব্যাপারে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এর আগে প্রথম দফায় ২৭ অক্টোবর থেকে টানা ৬০ ঘণ্টা, দ্বিতীয় দফায় ৪ নবেম্বর থেকে আবার টানা ৬০ ঘণ্টা এবং ১০ নবেম্বর থেকে টানা ৮৪ ঘণ্টা হরতালের সময় দেশের কোন কোন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজপথে নেমে এলেও রাজধানীতে দলের নেতাকর্মীরা ছিলেন নিষ্ক্রিয়। এ কারণে হরতালে তেমন সফলতা আসেনি। আর এই ৩ দফা হরতালে অনেক প্রাণহানি ও জ্বালাও-পোড়াওয়ের ঘটনা ঘটায় জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এ কারণে বিএনপিকে কিছুটা বেকায়দায় পড়তে হয়।
২৫ অক্টোবর সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে ১৮ দলীয় জোটের সমাবেশ থেকে খালেদা জিয়া ২৭ অক্টোবর থেকে টানা ৬০ ঘণ্টা হরতাল পালনের ঘোষণা দেন। ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় দুই নেত্রীর আলাপন হয় মোবাইল ফোনে। প্রায় ৩৭ মিনিটের আলাপে তখন প্রধানমন্ত্রী হরতাল প্রত্যাহার করে বিরোধীদলীয় নেতাকে আলোচনার জন্য গণভবনে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান। তবে সে ডাকে সাড়া না দিয়ে দলের নেতার পক্ষ থেকে আর সংলাপের ব্যাপারে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
১৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সর্বদলীয় সরকারের অধীনে হবে বলে ঘোষণা দেয়ার কয়েকদিন পর ২১ অক্টোবর রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া নির্বাচনকালীন নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি ৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে বিএনপির দেয়া তালিকায় ৫ জন এবং আওয়ামী লীগের দেয়া তালিকা থেকে ৫ জনকে নিয়ে ১০ জন এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজনকে প্রধান করে ১১ সদস্যের সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। এই সরকার গঠনের ব্যাপারে তিনি যত দ্রুত সম্ভব সরকারকে সংলাপের আয়োজন করার আহ্বান জানান। খালেদা জিয়া জানান, হরতাল কর্মসূচী শেষ করে আলোচনা হবে।
এর পর ২২ অক্টোবর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে সংলাপের আয়োজন করার ব্যাপারে একটি চিঠি লেখেন। চিঠি পাওয়ার পর সৈয়দ আশরাফ মির্জা ফখরুলকে টেলিফোন করে ধন্যবাদ জানান। এ সময় মির্জা ফখরুল বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছিলেন। সংবাদ সম্মেলন চলাকালে দুই মহাসচিবের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলার দৃশ্য বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে লাইভ প্রচার করা হয়। পরে অবশ্য দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়ীরাও প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে সাক্ষাত করে দুই দলের মহাসচিব পর্যায়ে সংলাপ করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত মহাসচিব পর্যায়ে সংলাপের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা নির্বাচনে যেতে চাই। এ জন্যই আমরা নির্দলীয় সরকারের অধীনে ও সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন চাই। জনগণ ও গণতন্ত্রের স্বার্থেই আমরা তা চাচ্ছি। কিন্তু সরকার আমাদের দাবি উপেক্ষা করে একদলীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করায় সে নির্বাচনে আমাদের পক্ষে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে এখনও আমরা আশা করি সংলাপ-সমঝোতা করে সকল দলের অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন করা উচিত। তা না হলে আমরা রাজপথে হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর আন্দোলন কর্মসূচী পালন করতে বাধ্য হব।
শনিবার নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সরকার বিএনপিকে বাদ দিয়ে একতরফা নির্বাচন করতে চাচ্ছে। আমরা এভাবে দেশে নির্বাচন হতে দেব না। রাজপথে দুর্বার আন্দোলন করে এ নির্বাচন প্রতিহত করা হবে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here