ec logoদশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আগামী শুক্রবার সকাল ৮টা থেকেই বন্ধ হচ্ছে সব ধরনের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। গণ-প্রতিনিধিত্ব আদেশ ও আচরণ-বিধি অনুযায়ী নির্বাচন শুরুর ৪৮ ঘণ্টা পূর্বে নির্বাচনী প্রচারণা বন্ধ করতে হবে। এরই মধ্যে নির্বাচনের সব প্রস্তুতিই শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনী মালামাল নিরাপদে জেলা-পর্যায়ে পাঠিয়েছে কমিশন। ভোটের সার্বিক প্রস্তুতি জানাতে আগামীকাল রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করতে যাচ্ছে পুরো কমিশন। এখন বাকি শুধু ভোট গ্রহণ। বিরোধী জোটের প্রতিরোধের মুখে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন শেষ করতে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে সশস্ত্র বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। এর আগে সারা দেশে সেনা মোতায়েনের পর এবার র্যাব ও আর্মড পুলিশ নামানো হয়েছে।

এ বিষয়ে আজ প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘শুক্রবার সকাল ৮টার পরে আর নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালানো যাবে না। আইন অনুযায়ী ভোট গ্রহণ শুরুর আগের ৪৮ ঘণ্টা আগে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা বন্ধ করতে হবে। এ নিয়ে আমরা বিজ্ঞপ্তিও দেব।’

ইসি সূত্র জানিয়েছে—৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৯ জেলায় ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এ সব জেলায় নির্বাচনের দিন ছুটি ঘোষণার পাশাপাশি সব যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ জন প্রার্থী বিনা-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। অন্য ১৪৭ আসনে ভোট হচ্ছে। এ সব আসনে ১২টি রাজনৈতিক দলের ৩৮৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ সব আসনে ভোটগ্রহণের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে প্রশিক্ষিত আড়াই লাখ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা। এবার ভোটগ্রহণের জন্য ১৮ হাজার ২০৯টি ভোট-কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেক ভোট-কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে ইসি। ঝুঁকিপূর্ণ ভোট-কেন্দ্রে প্রয়োজনে মেটাল ডিটেক্টর ব্যবহারেরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ভোট-কক্ষের সংখ্যা ৯১ হাজার ২১৩। ভোটপ্রদানের পরিবেশ সৃষ্টি করতে ভোট-কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজও এরই মধ্যে শেষ করা হয়েছে। নির্বাচনী আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ গত ২৬ ডিসেম্বর থেকে সরা দেশে সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে। আগামী ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের টহল থাকছে। র্যাব ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নকে গতকাল থেকে নামানো হয়েছে। তারা থাকবেন ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত। এ ছাড়া, বিজিবি ও কোস্টগার্ড ৩ জানুয়ারি থেকে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিয়োজিত থাকবে। দুটি গোয়েন্দা সংস্থা নির্বাচনে কয়েক স্থানে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা করে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে কারা কোন কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা করতে পারে, তার সম্ভাব্য তালিকা দেয়া হয়েছে। ওই সব ব্যক্তিকে ধরতে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে। বিজিবি-র্যাবের নিরাপত্তায় দেশের ৫৯ জেলায় রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনী মালামাল পাঠানোর কাজও শেষ হয়েছে। ভোটের দিন সকালে বিশেষ নিরাপত্তায় তা ভোট-কেন্দ্রে পাঠানো হবে। ৫ জানুয়ারি সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোট নেয়ার সব প্রস্তুতিও শেষ হয়েছে।

এ বিষয়ে ইসির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, ‘কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই সারা দেশে ব্যালট পেপার সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছেছে। ৫ জানুয়ারি সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোট নেয়ার প্রস্তুতি অবহিত করে রিটার্নিং কর্মকর্তারা ইসি সচিবালয়ে ফ্যাক্সবার্তাও পাঠিয়েছেন।

ইসি সংশ্লিষ্ঠরা বলছেন—ভোট গ্র্রহণের প্রস্তুতিতে কোনো ধরনের ঘাটতি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রায় তিন লাখ ভোট গ্রহণ (প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং) কর্মকর্তার প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজ চলছে। এরই মধ্যে ঢাকার ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কেন্দ্র প্রস্তুতে তাদের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তারা জানান—প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৮টি ব্যালট মুদ্রণের কাজ শেষ করেছে কমিশন। এ সব ব্যালট পেপার সারা দেশের নির্বাচনী কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া, নির্বাচনী সরঞ্জামাদি (স্ট্যাম্প প্যাড, মার্কিং সিল, ব্রাশ সিল, গালা, অমোচনীয় কালি) নিরাপদে মাঠ-পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে কমিশন। ওই সব মালামাল কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে রাখতে মাঠপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ২৪ জানুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আইন অনুযায়ী নির্বাচনের সব কাজ চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। কমিশন জাতিকে সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে সক্ষম।

অংশ নিচ্ছে ১২টি দল:

আগামী ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে এরই মধ্যে ১৫৩ জন প্রার্থী বিনা-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এখন ১৪৭ আসনে নির্বাচন হবে। এ সব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ১২টি দলের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ১২০, জাতীয় পার্টি (জাপা) ৬৫, জাতীয় পার্টি-জেপি ২৭, জাসদ ২১, ওর্য়াকার্স পার্টি ১৬, বিএনএফ ২২, গণতন্ত্রী পার্টি ১, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ৬, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ৩, গণফ্রন্ট ১, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ১ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এ ছাড়া ১০৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

সশস্ত্র বাহিনী ও র্যাবের জন্য হেলিকপ্টার:

আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে র্যাব হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে পারবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ইসি সচিবালয় ও বাহিনীগুলোর অনুরোধে বিমানবাহিনী প্রয়োজনীয় সংখ্যক হেলিকপ্টার, পরিবহনে সহায়তা দেবে। নিজ নিজ বাহিনীর সদরের নির্দেশনা অনুযায়ী রোগী বা হতাহতদের জরুরি চিকিত্সা, স্থানান্তরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক হেলিকপ্টার সুবিধাজনক স্থানে মোতায়েন করবে বিমানবাহিনী। সেনা সদরের বিবেচনায় প্রতিটি স্তরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনা-সদস্য রিজার্ভ হিসেবে মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া, দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্বাচন কর্মকর্তা, নির্বাচনী মালামাল পাঠাতেও হেলিকপ্টার প্রয়োজন হয়। এ লক্ষ্যে নির্বাচনের কয়েক দিন আগে থেকে নির্বাচনের পরের দিন পর্যন্ত হেলিকপ্টার সার্ভিস দিতে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

ভোট-কেন্দ্রে নিরাপত্তা বেষ্টনী:

দশম সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আগামী শনিবার থেকেই সব ভোট-কেন্দ্রের চারদিকে নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তুলতে বলেছে নির্বাচন কমিশন। আজ রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক নির্দেশনায় ইসির উপ-সচিব মিহির সারওয়ার মোর্শেদ জানান—ভোট-কেন্দ্রের চারদিকে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে সব ধরনের যানবাহন ও জনসাধারণের চলাচল সীমিত করতে হবে। ভোট-কেন্দ্রের চারপাশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্সের টহল জোরদার করতে হবে। এ সব এলাকায় এরই মধ্যে নির্বাচনী সরঞ্জাম ও ব্যালট পেপার পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে বলেও কমিশনের কর্মকর্তারা জানান।

ইসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে—ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনী মালামাল সংরক্ষণ, সহকারী রিটার্নিং কার্যালয়ে পাঠানো ও কেন্দ্র-ভিত্তিক বণ্টনের কাজ সর্বোচ্চ নিরাপত্তার সঙ্গে শেষ করতে হবে। ভোটের আগের দিন শনিবার প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা ব্যালট পেপারসহ মালামাল গ্রহণ করে কেন্দ্রে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ অবস্থান করবেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করবেন।

দুই থেকে সাত বছরের দণ্ড

নিয়ম অনুযায়ী ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে শুক্রবার সকাল ৮টার মধ্যে নির্বাচনী প্রচার শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছে ইসি। কেউ বিধান লঙ্ঘন করলে ন্যূনতম দুই বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দেয়া হবে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here