image_100437জাতীয় পার্টিতে (জাপা) দলীয় চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের ‘কর্তৃত্ব’ বা ‘নিয়ন্ত্রণ’ এখন অনেকটাই প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আর এজন্য দলের ভেতরের-বাইরের লোকজন প্রধানত দায়ী করছেন তাকেই। তাদের মতে, দশম সংসদ নির্বাচন প্রশ্নে এরশাদের অতি কৌশল এখন তার জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কারণে তিনি নিজেই নিজের ফাঁদে আটকে পড়ছেন। দলের সংসদ সদস্যরাও সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তাকে বাদ রেখেই। এমনকি শেষ পর্যন্ত রওশন এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা ও জাপার সংসদীয় দলের প্রধান মেনেই তাকে এমপি হিসেবে শপথও নিতে হবে। সবমিলিয়ে জাপায় এরশাদ এখন ‘কোণঠাসা’ বা ‘একা’ হয়ে পড়েছেন।

জাপার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এরশাদ গত ছয় মাস ধরে দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের উপর্যুপরি একের পর এক বিভ্রান্তিতে ফেলেছেন। প্রথমে তিনি বলেছেন, বিএনপিসহ সব দল না এলে জাপাও নির্বাচনে যাবে না। পরে বলেছেন, সবাই নির্বাচনে অংশ না নিলে তারা নির্বাচনেও যাবেন না এবং নির্বাচনকালীন সরকারেও যোগ দেবেন না। অথচ আকস্মিক ইউটার্ন নিয়ে তিনিই আবার নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিলেন। এমনকি দলীয় নেতাদের নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রীও বানালেন। দলের নেতা-কর্মীরা সবাই মনোনয়নপত্র দাখিলের পর এরশাদই আবার অবস্থান বদলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। তার নির্দেশ মেনে দলের ১৮৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। এ রকম দোদুল্যমান পরিস্থিতিতে ১২ ডিসেম্বর রাতে র্যাবের গাড়িতে তিনি ঢাকা সেনানিবাসে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চলে যান। এরপর তার বরাত দিয়ে বলা হচ্ছিল—নির্বাচনে অংশ না নেয়ার প্রশ্নে তিনি অনড়। অথচ তার স্ত্রী রওশনসহ অনেকেই নির্বাচনে সক্রিয় থেকে যান। নির্বাচনের পর তিনি ছাড়া দলের সকল এমপি শপথও নিলেন। এ অবস্থায় দলের সাধারণ নেতা-কর্মীরাই এখন এরশাদের ওপর বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ। সংক্ষুব্ধ কর্মী-সমর্থকদের মতে, এরশাদের এই পরিণতির জন্য তিনি নিজেই দায়ী। বেশি খেলতে গিয়ে তিনি নিজেই এখন ধরাশায়ী হয়েছেন।

এরশাদ ও নাসিম ওসমান ছাড়া জাপার বাকি ৩১ জন সংসদ সদস্য বৃহস্পতিবার শপথ নিয়েছেন। বিদেশে থাকায় নাসিম ওসমান ওইদিন শপথ নিতে পারেননি। মঙ্গলবার সংসদ ভবনে জাপা এমপিদের নিয়ে বৈঠক শেষে রওশন এরশাদ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, এরশাদও শপথ নেবেন। বৃহস্পতিবার অন্যরা শপথ নিলেও যাননি এরশাদ। শপথ গ্রহণ শেষে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও কাজী ফিরোজ রশীদ জানান, এরশাদ শুক্রবার শপথ নেবেন। কিন্তু গতকালও তিনি শপথ নেননি। তিনি ঠিক কোনদিন শপথ নেবেন তা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। জাপার একাধিক সূত্র মতে, কয়েকটি বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় এরশাদের শপথ গ্রহণ বিলম্বিত হচ্ছে।

তবে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ে ঘনিষ্ঠ, জাপার এ রকম কয়েকজন সংসদ সদস্য  জানান, বৃহস্পতিবার দলের অন্য এমপিদের নিয়ে একসঙ্গেই শপথ নিতে চেয়েছিলেন এরশাদ। তার পরিকল্পনা ছিল- শপথের পর এমপিদের নিয়ে তিনি বৈঠকে বসবেন। তার উপস্থিতিতে কেউ তার বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস করবে না। এর মধ্য দিয়ে তিনিই বিরোধী দলীয় নেতা ও জাপার সংসদীয় দলের প্রধান নির্বাচিত হতে চেয়েছিলেন। বিষয়টি নিশ্চিত হতে পেরে পাল্টা কৌশল নিয়ে দলের এমপিরা এরশাদকে সিএমএইচে রেখেই শপথ নেন। শপথের পরপরই তারা বৈঠকে বসে রওশনকে বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত করেন। সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত সিদ্ধান্ত হিসেবে লিখিতভাবে তা জানিয়ে দেন জাতীয় সংসদের স্পিকারকেও। আর শপথের আগেই, মঙ্গলবারের বৈঠকে রওশনকে দলের সংসদীয় নেতা নির্বাচিত করে নেন জাপা এমপিরা। এভাবে এরশাদকে কার্যত জাপার সংসদীয় দলে কর্তৃত্বহীন করে ফেলা হয়েছে।

জানা গেছে, এরশাদের সঙ্গে গতকাল শুক্রবার সকালে সিএমএইচে দেখা করেছেন জাপা মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার। তিনি জানান, এরশাদ কয়েকদিনের মধ্যেই শপথ নেবেন। এছাড়া উদ্ভূত বিষয়গুলো নিয়ে এরশাদ গণমাধ্যমের সঙ্গেও কথা বলবেন। দলের অপর একটি সূত্র  জানায়, আগামীকাল রবিবার নতুন মন্ত্রিসভার শপথের আগে আজ শনিবার যে কোনো সময় এরশাদ শপথ নিতে পারেন। তবে সিএমএইচ থেকে সরাসরি সংসদ ভবনে গিয়ে শপথ নেবেন, নাকি হাসপাতাল থেকে বাসায় আসার পর সংসদ ভবনে যাবেন এবং শপথ শেষে তার গন্তব্য কোথায় হবে—এসব বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বেশিরভাগ সূত্র বলেছে, হাসপাতাল থেকে সংসদ ভবনে গিয়ে শপথ নেয়ার পর আবার হাসপাতালেই ফিরতে পারেন এরশাদ।

এদিকে জাপার নবনির্বাচিত পাঁচজন এমপি  জানান, বৃহস্পতিবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত জাপার সংসদীয় দলের প্রথম বৈঠকেও রওশন এরশাদসহ উপস্থিত থাকা ৩১ এমপির ২৮ জনই তাদের বক্তব্যে এরশাদের কড়া সমালোচনা করেছেন। তাদের বক্তব্য ছিল—এরশাদের নানারকম বক্তব্য, ঘনঘন অবস্থান পরিবর্তনের কারণে দলের নেতা-কর্মীরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তার কারণেই সম্ভাবনাময় আরও অনেকে সংসদ সদস্য হতে পারেননি। তার একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে জনগণের সামনে জাপা হাসির বস্তুতে পরিণত হয়েছে। শুধু সংসদেই নয়, প্রয়োজনে দলীয় রাজনীতির নেতৃত্ব গ্রহণের জন্যও তারা রওশনের প্রতি আহ্বান জানান। এ সময় রওশন বলেন, ‘আমি তো কিছুই হতে চাইনি। উনিই (এরশাদ) আমাকে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রী হতে বলেছেন, উনিই বলেছেন নির্বাচন করতে। আবার কাউকে কিছু না জানিয়ে উনিই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। এতে আমাদেরও মানসম্মান নষ্ট হয়েছে।’

সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে বৃহস্পতিবার রাতে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন জাপার রওশন এরশাদ, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, কাজী ফিরোজ রশীদ ও তাজুল ইসলাম চৌধুরী। জানা গেছে, এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীও এরশাদের ভূমিকা নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এরশাদ সাহেব যদি এভাবে হঠাত্ সরে না যেতেন এবং জাপার অনেক প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করতেন তাহলে নির্বাচনটি আরও ভালো হতো। এতোগুলো লোক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতেন না, নির্বাচন নিয়ে এতো বেশি বিতর্কও সৃষ্টি হতো না।

এ ব্যাপারে জাপার এমপি তাজুল ইসলাম চৌধুরী  বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জাপার এতোগুলো প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করলে আমরা সুন্দর একটি নির্বাচন করতে পারতাম।’

অন্যদিকে, জাপার যেসব প্রার্থী এরশাদের নির্দেশ মেনে তার প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, তারাও এরশাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। ক্ষুব্ধদের কয়েকজন  বলেন, যদি শেষ পর্যন্ত দলের ৩৩ জন সংসদ সদস্য হবেন এবং তারা শপথও নেবেন, তাহলে তাদেরকে দিয়ে কেন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করানো হলো। যেখানে দলের চেয়ারম্যান এরশাদ, তার স্ত্রী রওশন, দলের মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দিন বাবলু, কাজী ফিরোজ রশীদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মুজিবুল হক চুন্নু ও সালমা ইসলামসহ কেন্দ্রীয় প্রায় সব নেতাই এমপি হয়ে গেছেন; সেখানে এরশাদের কথা রাখতে গিয়ে এখন তারাই বরং লোকসানের কাতারে পড়েছেন। এরশাদের নির্দেশ মেনে জিএম কাদেরও নির্বাচনে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন গৃহীত না হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি প্রার্থী ছিলেন। তবে তিনি জয়ী হতে পারেননি। ফলে তিনিও সংসদ থেকে ছিটকে পড়ছেন।

ফেনী জেলার একটি আসনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারকারী জাপার এক নেতা বলেন, ‘এখন বিষয়টি এমন দাঁড়ালো যে, যারা এরশাদের কথা শুনেছেন তারাই বিপদে, আর যারা এরশাদের কথা রাখেননি কিংবা দ্বৈত ভূমিকায় ছিলেন তারাই এখন লাভবান।’

প্রসঙ্গত, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২৪৮টি সংসদীয় আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন জাপা নেতা-কর্মীরা। এর মধ্যে এরশাদের নির্দেশ মেনে ১৮৩ জনই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। এরশাদ ও জিএম কাদেরসহ ৬৫ জন থেকে যান নির্বাচনে। এর মধ্যে ২১ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হন আরও ১২ জন। এ নিয়ে জাপার আসন দাঁড়ায় ৩৩-এ।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here