Report

নিখোঁজ সালাহউদ্দিন ভারতে গ্রেফতার
দুই মাসের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকা বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের খোঁজ পেয়েছেন তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাসতোর হিলসে অবস্থিত মেঘালয় ইস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরো সায়েন্স (মিমহানস) হাসপাতালে থাকা স্বামীর সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার টেলিফোনে কথা বলেন মিসেস হাসিনা আহমেদ। সালাহউদ্দিন টেলিফোনে স্ত্রীকে জানান, আল্লাহর রহমতে তিনি বেঁচে আছেন। সুস্থ আছেন সবাইকে খবরটা জানিয়ে দিতে তিনি স্ত্রীকে পরামর্শ দেন। দেশবাসী, বিএনপি ও ২০ দলের সবাইকে তার জন্য দোয়া করতে বলেন। হাসিনা আহমদ বলেন, আল্ল­াহ আমার দোয়া কবুল করেছে। আমার বিশ্বাস ছিল তিনি ফিরে আসবেন। আল্ল­াহ আমার কাছে তাকে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছে।
শিলং টাইমসের সম্পাদক মানস চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, সোমবার মেঘালয়ের গলফ লিংক এলাকায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরার সময় সালাহউদ্দিনকে শিলং পুলিশ আটক করে। প্রথমে তার কথা শুনে পুলিশের মনে  হয়েছে, তিনি অপ্রকৃতিস্থ। এরপর তাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিত্সা শেষে তিনি সুস্থ বলে চিকিত্?সকেরা জানান। সালাহউদ্দিন চিকিত্সকদের জানিয়েছেন,তার হার্টের সমস্যা আছে। এদিকে ফোনে সালাহউদ্দিনের সঙ্গে কথা বলার পর পরই বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসা ফিরোজা’য় যান হাসিনা আহমেদ। প্রায় ঘণ্টাখানেক তিনি সেখানে অবস্থান করেন। এসময় বেগম খালেদা জিয়াও সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন বলে জানা যায়। ফিরোজা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় হাসিনা আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, আমার স্বামী বেঁচে আছেন। তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।
এদিকে সালাহউদ্দিন আহমেদকে দেশে আনতে স্ত্রী হাসিনা আহমেদের গতকাল রাতেই ভারতের মেঘালয়ে রওনা হওয়ার কথা। রাতে ছোট বোন জামাই মাহবুবুল কবির মুনমুন ও এক নিকট আত্মীয়কে নিয়ে রওনার প্রস্তুতি নেন তিনি। বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইংয়ের কর্মকর্তারা  জানান, ‘ভিসা প্রসেসিংয়ের জন্য বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবিহ উদ্দিন আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে বিকালে সালাহউদ্দিনের ছোট ভায়রা ভারতীয় হাইকমিশনে গেছেন।’

অনুপ্রবেশের মামলা

মেঘালয়ের ‘দ্য নর্থইস্ট টুডে’ পত্রিকায় এ সংক্রান্ত খবরে পুলিশের মেঘালয়ের পূর্ব খাসি পাহাড় সুপারিনটেনডেন্ট এম খড়করাঙ জানিয়েছেন, “অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের জন্য আহমেদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সালাউদ্দিন আহমেদ বিএনপির নেতা হিসেবে নিজের  পরিচয় দিয়েছেন। এর সত্যতা যাচাই করছি আমরা। তিনি শিলং-এ কিভাবে আসলেন জিজ্ঞাসা করা হলে সালাহ উদ্দিন আহমদ জবাব দেন, ’আমি জানি না’।” পুলিশ কর্মকতা বলেন, তার অসুস্থতার কারনে আমরা তাকে আদালতে সোপর্দ করতে পারছি না। উন্নত চিকিত্সার জন্য মি. আহমেদকে শিলং সিভিল হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে।

হাসিনা আহমেদ-সালাহউদ্দিন ফোনালাপ

হাসিনা আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মেঘালয় ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ এন্ড নিউরো সায়েন্স (মিমহানস) হাসপাতালের একজন আমাকে ফোন করেন। তিনি ইংরেজিতে আমাকে বলেন, আপনার স্বামী আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। এরপর সালাহউদ্দিনকে ধরিয়ে দেন তিনি। অপর পক্ষ থেকে আওয়াজ আসে, আমি সালাহউদ্দিন আহমেদ বলছি। আমি একটি মানসিক হাসপাতালে আছি। সুস্থ আছি, জীবিত আছি। তুমি সবাইকে এ খবরটা জানিয়ে দাও। সবাই যেন আমার জন্য দোয়া করেন। আমি আল্ল­াহর কাছে অশেষ কৃতজ্ঞ। সালাহউদ্দিন বলেন, আমার প্রচণ্ড ঠাণ্ডা লেগেছে, আমাকে তাড়াতাড়ি দেশে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করো। ম্যাডামকে (খালেদা জিয়া) আমার সালাম দিও। তিনি বলেন, খুব দ্রুত চেষ্টা করছি ওনার (সালাহউদ্দিন) কাছে পৌঁছাতে। খালেদা জিয়া তার (সালাহউদ্দিন) সন্ধান পাওয়ার খবর জানার পর শুকরিয়া আদায় করেছেন। সালাহউদ্দিন আহমদ মেঘালয়ে কিভাবে গেলেন? এই প্রশ্নের জবাব দিতে অপারগতা জানান হাসিনা আহমেদ। তিনি বলেন, আগে উনাকে দেশে ফিরিয়ে আনি। তারপর কি হয়েছে জানাতে পারবো।
এদিকে গতকাল বেলা পৌনে ৩টার দিকে গুলশান-২ এর ৭৭ নম্বর রোডের ৭ নম্বর বাসার সামনে হাসিনা আহমেদ সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, আমি শতভাগ নিশ্চিত, আমি আমার স্বামীর সঙ্গে কথা বলেছি। ১০০ বছর পরে কথা হলেও আমার স্বামীর কণ্ঠ চিনতে পারবো।’ স্বামীর সন্ধান পাওয়ায় আল­্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে হাসিনা আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, এখন মানসিক শান্তি পাচ্ছি। আমার বিশ্বাস ছিল তিনি বেঁচে আছেন।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যতো দ্রুত সম্ভব আমি শিলংয়ে যাবো। আমার স্বামীকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করবো। এ জন্য  ভিসা প্রসেসিংসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরিতে সরকার ও সংশ্লি­ষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করছি। দেশের সবার সহযোগিতা চাই। দুই থেকে তিন মিনিট স্থায়ী সংবাদ সম্মেলন শুরুর আগে সালাহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন কোনো প্রশ্ন না করার জন্য। সংক্ষিপ্ত সাংবাদিক সম্মেলন শেষে দ্রুত নিজের ফ্লাটে চলে যান।

শিলংয়ে গ্রেপ্তার, অতঃপর হাসপাতালে

মেঘালয় রাজ্যের শিলং নগর পুলিশের সুপার বিবেক শ্যাম সাংবাদিকদের জানান, সোমবার রাতে শহরের গলফ লিংক এলাকা থেকে ৫৪ বছর বয়সী এক বাংলাদেশিকে তারা গ্রেপ্তার করেন। ওই ব্যক্তি পুলিশকে বলেন, তার নাম সালাহউদ্দিন আহমেদ; তিনি বাংলাদেশি। কিন্তু ভ্রমণের কাগজপত্র দেখাতে না পারায় পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যায়।“তাকে খুবই বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। কথা-বার্তাও স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছিল না। এ কারণে আমরা তাকে মেঘালয় ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেই।” পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ নামে এক বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করার কথা গতকাল মঙ্গলবার সকালে মেঘালয়ের ইংরেজি দৈনিক শিলং টাইমসেও প্রকাশিত হয়।

অচেনা লোকজন তুলে নিয়েছিল

ভারতের মেঘালয়ে গ্রেপ্তার সালাহ উদ্দিন আহমেদ দাবি করেছেন, তাকে দুই মাস আগে ঢাকার উত্তরা থেকে অপহরণ করা হয়েছিল। তবে কারা অপহরণ করেছেন তা তিনি বলতে পারেন না। মেঘালয়ে সালাহ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাকে উত্তরা থেকে অচেনা লোকজন তুলে নিয়েছিল। আমি জানি না আমি কিভাবে এখানে এলাম।’

নিখোঁজের পূর্বাপর ঘটনা প্রবাহ

বিএনপির টানা অবরোধ কর্মসূচির ৬৪ দিনের মাথায় গত ১০ মার্চ উত্তরার একটি বাসা থেকে ‘নিখোঁজ’ হন সালাহউদ্দিন আহমেদ। নিখোঁজ হওয়ার আগ পর্যন্ত ওই বাসা থেকেই দাফতরিক দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। মূলত: গণমাধ্যমে বিবৃতি আকারে প্রেস রিলিজ পাঠাতেন তিনি। স্বামীর খোঁজ চেয়ে পরদিন রাতে গুলশান থানা ও উত্তরা থানায় জিডি করতে চাইলেও পুলিশ তা নেয়নি বলে সে সময় অভিযোগ করেন তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ। তারপর থেকেই বিএনপি অভিযোগ করছে যে, সরকারের ‘নির্দেশে’ আইন-শৃংখলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই সালাহউদ্দিনকে ‘নিয়ে গেছে’। সর্বশেষ ৯ মে খালেদা জিয়া তার বিবৃতিতে বলেছেন, সালাহউদ্দিন আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আছে। তাকে দ্রুত ফিরিয়ে না দিলে পরিণতি শুভ হবে না।’ তবে সরকারের পক্ষ থেকে বিএনপির অভিযোগ নাকচ করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সালাহউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তবে তাকে আটক করতে খুঁজছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। সালাহউদ্দিনের অন্তর্ধানে তার দলের ‘হাত রয়েছে’। গত ১২ মার্চ সালাহউদ্দিন আহমেদকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন সালাহউদ্দিনের স্ত্রী। শুনানি শেষে সালাহউদ্দিন আহমেদকে ১৫ মার্চের মধ্যে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করতে কেন নির্দেশনা দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে হাইকোর্ট। সালাহউদ্দিনকে খুঁজে পাওয়া গেল কি-না সে বিষয়ে নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্ট গত ১২ এপ্রিল আবেদনটি নিষ্পত্তি করে দেয়। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতকে বলা হয়, তারাও এই বিএনপি নেতার কোনো খোঁজ জানে না। এর মধ্যে ১৯ মার্চ ও ৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে দুই দফা স্মারকলিপি দিয়ে আসেন হাসিনা আহমেদ। এর মধ্যে গত ২৯ মার্চ নিখোঁজ সালাহউদ্দিন আহমদের সন্ধানে গাইবান্ধার ফুলছড়ি থানার খাটিয়ামারির দুর্গম চরাঞ্চলে সন্ধান পাওয়ার গুজবে অভিযান চালানো হয়।
শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here