জনতার নিউজঃ

দুষ্কৃতিকারীর সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ, লজ্জায় নিচু হয় মাথা

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার ১৬২ পৃষ্ঠার রায়ে আদালত গুরুত্বপূর্ণ কিছু অভিমত দিয়েছেন। অভিমতে আদালত বলেছেন, এই ঘটনা সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য লজ্জাজনক। এটা জাতির জন্যও লজ্জাজনক।

রায়ে বলা হয়, অপহরণ, হত্যার জন্য নূর হোসেনের মতো দুষ্কৃতিকারীদের সঙ্গে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগাযোগ থাকে তখন আমাদের মাথা লজ্জায় নিচু হয়ে যায়। নূর হোসেন ও তার সহযোগীদের কাছ থেকে সশস্ত্রবাহিনীর কর্মকর্তাদের সুবিধা নেয়ার বিষয়টি অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।

নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন তার রায়ে বলেন, এই মামলায় মোট আসামি ৩৫ জন। যাদের মধ্যে ২৫ জনই সশস্ত্র ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্য। বাকিরা সাধারণ মানুষ। এই অপরাধ সাধারণ ও শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা মিলে করেছে। এটা একটি জাতির জন্য খুবই কলঙ্কজনক যে, সাধরণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এই জঘন্য অপহরণ, হত্যা এবং প্রমাণ গায়েব করার কাজ করেছে। তারা উভয় গ্রুপ লাভবান হওয়ার জন্য পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী এই হত্যাকাণ্ড ও অপরাধ সংগঠিত করেছে। এটা সকল সরকারি কর্মীর জন্য লজ্জার।

রায়ে বলা হয়েছে, র‌্যাব একটি প্রশংসিত এলিট ফোর্স। র‌্যাব-১১ তে প্রেষণে আসা কিছু উচ্ছৃখল এবং বিবেকবির্জত অপরাধীর কারণে র‌্যাবের সম্মান নষ্ট হতে পারে না। আমাদের কাছে র‌্যাব ‘দায়িত্বশীলতার’ প্রতীক। একই সঙ্গে র্যাব সক্ষমতা ও মঙ্গল সাধনের প্রতীক। যাত্রার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের অনেক জাতীয় সংকটে র‌্যাব অনেক সফলতা অর্জন করেছে। র‌্যাবের কর্মকর্তা ও সদস্যরা যারা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত এটা তাদের ব্যক্তিগত দায়। কোনো ব্যক্তি বিশেষের অপরাধের জন্য পুরো এলিট ফোর্স কোনো ভাবে সমালোচনার শিকার হতে পারে না। র‌্যাব আমাদের কাছে শক্তির প্রতীক বলে জনগণ বিশ্বাস করে। তাই প্রেষণে কোনো কর্মকর্তা ও সদস্যকে নিয়োগ দেওয়ার আগে কর্তৃপক্ষকে আরো বেশি সজাগ থাকা উচিত।

নারায়ণগঞ্জে হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জনমনে একটাই ধারণা হয় র‌্যাবই এই অপরাধ করেছে। যে কারণে এখনো র‌্যাবকে অপবাদ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। কিন্তু আমরা বলতে চাই র‌্যাব এ ধরনের কোনো অপরাধ করেনি। যারা করেছে এটা তাদের ব্যক্তিগত অপরাধ। সকল তথ্য-প্রমাণ বলছে, এটা দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের দ্বন্দ্ব। পুরো ক্ষমতা দখলের জন্য এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে। একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অনুসারী (অতীতে বিএনপির অনুসারী ছিলো) এবং অন্য গ্রুপটি বিএনপির অনুসারী। তবে এই সন্ত্রাসী চক্র কোনো রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করে না। তারা শুধু ক্ষমতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে।

রায়ে বিচারক বলেন, ঘটনা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং রেকর্ডের ভিত্তিতে আমি এই অবস্থান জানাচ্ছি যে, প্রসিকিউশন অভিযুক্ত নূর হোসেন, তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (অব:) আরিফ হোসেন, মোহাম্মাদ মাসুদ রানা, এসআই পুর্ণেন্দ্রবালা, নায়েক হিরা, সিপাহি আবু তৈয়ব, সৈনিক আলিম, কনস্টেবল শিহাব, সৈনিক মহিউদ্দিন, ল্যান্স নায়েক বেলাল, এবি আরিফ, সৈনিক আল-আমিন, মোহাম্মদ রুহুল আমিন, মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, সৈনিক নুরুজ্জামান, মোহাম্মদ বাবুল হাসান, মোকলেস, মোহাম্মাদ কামাল হোসেন এবং হাবিবুর রহমান ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা করে। একই উদ্দেশে সবাই একসঙ্গে মিলে (নিহত নজরুল, তাজুল, লিটন, স্বপন এবং জাহাঙ্গীর) অপহরণ করে নির্দিষ্ট তারিখ, সময় এবং স্থানে হত্যা করে। অভিযুক্তরা ফৌজদারি অপরাধের সেকশন ১২০বি এবং ৩৬৪/৩৪ অনুযায়ী অপরাধের সঙ্গে জড়িত।

এরপর অভিযুক্ত নূর হোসেন, তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (অব:) মোহাম্মদ আরিফ হোসেন, মোহাম্মদ মাসুদ রানা, নায়েক হিরা, এসআই পুর্নেন্দবালা, এবি আরিফ, আসাদুজ্জামান নূর, সার্জেন্ট এনামুল, হাবিলদার এমদাদ, মহিউদ্দিন, আল-আমিন, আলিম, সিপাহি আবু তৈয়ব, কনস্টেবল শিহাব, ল্যান্স নায়েক বেলাল, সৈনিক তাজুল, মরতুজা জামান চার্চিল, আলী মোহাম্মদ, মোহাম্মদ মিজানুর রহমান দীপু ওরফে মিজান, মোহাম্মদ রহম আলী, মোহাম্মদ আবুল বাসার, সেলিম, মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ ওরফে ছানা, ম্যানেজার শাজাহান এবং জামালউদ্দিন ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা করে এবং সবাই একই উদ্দেশে সংঘবন্ধ হয়ে হত্যা করে (নিহতরা হলেন, নজরুল, তাজুল, লিটন, স্বপন এবং জাহাঙ্গীর)।

এতে প্রতীয়মান হয়েছে যে, অভিযুক্তরা খুন করার উদ্দেশে অপহরণ করে। অভিযুক্ত নূর হোসেন, তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (অব:) মোহাম্মদ আরিফ হোসেন, মোহাম্মদ মাসুদ রানা, নায়েক হিরা, এসআই পুর্নেন্দবালা, এবি আরিফ, সার্জেন্ট এনামুল, হাবিলদার এমদাদ, আসাদুজ্জামান নূর, মহিউদ্দিন, আল-আমিন, আলিম, সিপাহি আবু তৈয়ব, কনস্টেবল শিহাব, ল্যান্স নায়েক বেলাল, সৈনিক তাজুল, মরতুজা জামান চার্চিল, আলী মোহাম্মদ, মোহাম্মদ মিজানুর রহমান দীপু ওরফে মিজান, মোহাম্মদ রহম আলী, মোহাম্মদ আবুল বাসার, সেলিম, মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ ওরফে ছানা, ম্যানেজার শাজাহান এবং জামালউদ্দিন ফৌজদারি অপরাধের সেকশন ১২০বি, ৩০২/৩৪, ১২০বি এবং ২০১/৩৪ অনুযায়ী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত। প্রসিকিউশন আরো প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছে যে, অভিযুক্ত এ.এস.আই মোহাম্মদ বজলুর রহমান এবং হাবিলদার নাসিরউদ্দিন ষড়যন্ত্র করে এবং একই উদ্দেশে হত্যাকান্ড ঘটায়। ফলে তারা ফৌজদারি অপরাধের সেকশন ১২০বি এবং ২০১/৩৪ অনুযায়ী অপরাধ করেছে।

রায়ে বলা হয়, উল্লিখিত আলোচনা, মৌখিক সাক্ষ্য প্রমাণ, ডকুমেন্টারি, আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটর, রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী এবং আসামি পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থাপিত তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায়, অভিযুক্ত তারিখ, সময় এবং স্থানে অভিযুক্তরা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী একসঙ্গে মিলে অপহরণ করে (নিহত নজরুল, লিটন, স্বপন এবং জাহাঙ্গীর)। অভিযুক্তরা পুলিশ হেফাজতে স্বীকার করেছে যে তারা তত্ক্ষণাত্ ৫ জনকে হত্যা করে এবং হত্যার সাক্ষ্য প্রমাণ গোপন করতে তারা লাশ গুম করে। এতে প্রমাণিত হয় যে তারা প্রতিটি মুহূর্তে অপরাধী মানসিকতার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ছিল। এর মাধ্যমে তারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে। ফলে এই মামলায় অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ছাড়া অন্য কোনো দণ্ড দেওয়ার সুযোগ নেই।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here