4 Leaders
মোস্তফা কামাল, কিশোরগঞ্জ

সেদিন ঢাকার গোপীবাগের ভাড়া বাসা থেকে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের স্ত্রী সৈয়দা নাফিসা ইসলাম বারবার রান্না করা খাবার পাঠাচ্ছিলেন কারাগারে। আর প্রতিবারই খাবার ফেরত পাঠান কারা কর্তৃপক্ষ। তখনই তারা আঁচ করতে পারেন, হয়তো ভয়াবহ কোন দুঃসংবাদ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সেই আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো।

গতকাল সকালে কিশোরগঞ্জ শহরের খরমপট্টির বাসায় এ প্রতিনিধির কথা হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের একমাত্র ছোট ভাই জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ ওয়াহিদুল ইসলামের সঙ্গে। একন্ত আলাপচারিতায় তিনি এসব কথা জানান। বাকরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি জানান, ১৯৭৫-এর পর থেকে দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবস পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু তার কাছে সেদিনের স্মৃতি কখনই পুরনো

হওয়ার নয়। আজো তার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভাসছে তার ভাইয়ের ক্ষতবিক্ষত লাশের তাজা ছবি। একমাত্র ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি সেদিন ডুকরে ডুকরে কেঁদেছেন। ভাইয়ের বীভৎস মৃত্যু আর শূন্যতা আজো স্মৃতিকাতর ছোটভাই ওয়াহিদুল ইসলামকে কাঁদায়।

ঘটনার দিন তিনি ঢাকায় ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জাতীয় চার নেতাসহ সৈয়দ নজরুলকে যখন গ্রেফতার করা হয় তখন তার স্ত্রী সৈয়দা নাফিসা ইসলাম সরকারি বাসভবন ছেড়ে গোপীবাগে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে ওঠেন। সেই বাসা থেকেই প্রতিদিন রান্না করে কেন্দ্রীয় কারগারে খাবার পাঠাতেন। কিন্তু ৩ নভেম্বর তিনি বারবার খাবার পাঠাচ্ছেন, আর প্রতিবারই কারা কর্তৃপক্ষ খাবার ফেরত পাঠাচ্ছেন। তখনই তাদের সন্দেহ হয়, হয়তো ভয়ানক কিছু একটা ঘটেছে। শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পর সৈয়দ নজরুলের তখনকার নিরাপত্তা কর্মকর্তা এসএম করিম ঢাকার জেলা প্রশাসককে ঘটনা অবহিত করেন। তখন জেলা প্রশাসক চরম এই দুঃসংবাদটি জানান ঢাকার আর্মানিটোলায় সৈয়দ নজরুলের সম্বন্ধি আসাদুজ্জামানের বাসায়। খবর শুনেই সৈয়দ ওয়াহিদুল ইসলামসহ উপস্থিত সবাই বিলাপ করে কাঁদতে থাকেন। এদিনই বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আসাদুজ্জামানের বাসায় সৈয়দ নজরুলের ক্ষতবিক্ষত লাশ নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আর্মানিটোলা মাঠে জানাজা পড়িয়ে সরকারি উদ্যোগে বনানীর গোরস্তানে লাশ দাফন করা হয়। তবে তখনকার ভীতিকর পরিস্থিতির কারণে জানাজায় খুব বেশি মানুষ যেতে সাহস করেনি বলে সৈয়দ ওয়াহিদুল ইসলাম জানান।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের পর থেকেই সারাদেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ধরপাকড় চলতে থাকে। জেলহত্যার পর সেই অভিযান আরও জোরদার হয়। তখন সৈয়দ নজরুলের ছোটভাই সৈয়দ ওয়াহিদুল ইসলাম পালিয়ে বেড়াতেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ১৯৭৬ সালের জুন মাসের এক গভীর রাতে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের এক মেজরের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বীরদামপাড়ার বাড়ি থেকে সৈয়দ ওয়াহিদুল ইসলামকে আটক করা হয়। এর পর শহরের সরকারি বালক বিদ্যালয়ের হোস্টেলে স্থাপিত সেনাক্যাম্পে নিয়ে তাকে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। এরপর তাকে প্রায় ৩ বছর বন্দী রাখা হয় ময়মনসিংহ কারাগারে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদকেও সে সময় একই কারাগারে দেড় বছর আটক রাখা হয়। তাকেও অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন করা হয়। তখন ময়মনসিংহ কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ, ময়মনসিংহের এমপি অধ্যক্ষ মতিউর রহমান এবং হালুয়াঘাটের তৎকালীন এমপি মরহুম কুদরত উল্লাহকেও বন্দী রাখা হয়।

সৈয়দ ওয়াহিদুল ইসলাম জানান, কারাগারে তাকে জিয়াউর রহমান প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন মন্ত্রী করার। সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জানান, এরপরও জিয়া সরকারের চক্রান্ত থামেনি। তখন তাদের বীরদামপাড়া গ্রামের বাড়িটি বাজেয়াপ্ত করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে আপিল করে বাড়িটি রক্ষা করা হয় বলে তিনি জানান।

তিনি আরও জানান, মুক্তিযুদ্ধকালে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম তার স্ত্রী সৈয়দা নাফিসা ইসলাম ও ছোটভাই সৈয়দ ওয়াহিদুল ইসলামকে নিয়ে কলকাতার ৩৯, সিআইটি রোডে আশুতোষ ঘোষের বাড়িতে থাকতেন। এই বাড়িতেই ছিল অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির কার্যালয়। তখন ছোটভাই সৈয়দ ওয়াহিদুল ইসলাম রাষ্ট্রপতির এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। সেসব স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে তার কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার হলেও সেদিনের জেলহত্যার সঙ্গে জড়িতদের আজো বিচার হয়নি। যতদিন জেলহত্যার বিচার সম্পন্ন না হবে, ততদিন বাংলাদেশ পুরোপুরি কলঙ্কমুক্ত হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here