Report

এই ঢাকা জানা অজানার দেড় হাজার বছর আগে ছিল এক প্রহরা চৌকি। স্থানীয়রা তাকে বলত ঢক্কা। ধীরে ধীরে গড়ে উঠল ‘বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির’ এক শহর। মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁ ১৬১২ সালে সেই শহরকেই করলেন তার রাজধানী। সেই থেকে যাত্রা হল নগরী ঢাকার। এরপর কত ভাঙা গড়া, কত হাসি কান্নার ইতিহাস এই ঢাকা ঘিরে…….


দাস কেনাবেচা হত চকবাজারে

সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ বাংলায় এলেন বিদ্রোহ দমন করতে। বাংলার বারো ভুঁইয়া মোগলদের বশ্যতা স্বীকার করতে চাইছিলেন না। তারা মনে করতেন, মোগলরা কখনো বাংলার সুহূদ নয় বরং আফগানিস্তান থেকে আসা সুলতানরাই বাংলার মঙ্গল চায়। একারণে তারা বরাবরই মোগলদের বিরোধিতা করে আসছিলেন। তাদের দমন করতেই মোগল সেনাপতি মানসিংহের বাংলায় আগমন। ভাওয়াল থেকে সদর দফতর সরিয়ে তিনি ঢাকাতে নিয়ে এলেন ১৬০২ সালে। এখন যেখানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, সেখানেই দুর্গ স্থাপন করেছিলেন তিনি। সে আমলে কোথাও সেনা ছাউনি বা দুর্গ স্থাপন করলে সাধারণত তার পাশেই গড়ে উঠত বাজার, প্রয়োজনের তাগিদেই। এখানেও একটা বাজার গড়ে উঠেছিল, যেটাকে এখন আমরা চকবাজার নামে চিনি। অবশ্য তখন লোকে এটাকে ভিন্ন নামে চিনত। চার্লস ড’য়লি লিখেছেন, বাজারটি আগে ‘নাখাস’ নামে পরিচিত ছিল। এটি ছিল নিচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ২শ’ ফুটের একটি চৌকোণা চত্বর। আরবিতে ‘নাখাস’ কথাটির অর্থ দাস-বিক্রেতা। ধারণা করা যায়, মোগল আমলে এখানে দাস কেনা-বেচা হত।

মানসিংহ দুর্গ স্থাপনের একশ’ বছর পর ১৭০২ সালে মুর্শিদকুলি খাঁ এই বাজারটির নাম দেন ‘পাদোশা’ বা ‘বাদশাহি বাজার’। ১৭৩৩-৩৪ সালে মুর্শিদকুলি খাঁর জামাতা দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খাঁ বাজারটি সংস্কার করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ বাজার হিসাবে চকবাজারের যাত্রা শুরু সেখান থেকেই। সে আমলে এটাই ছিল ঢাকা শহরের ধনী ও অভিজাত বাসিন্দাদের কেনা-কাটার প্রধান কেন্দ্র।

১৯০৬ সালে প্রকাশিত ব্রাডলে বার্টের ‘রোমান্স অব অ্যান ইস্টার্ন ক্যাপিটাল’-এ উল্লেখ করা হয়েছে, মোগল আমলে চক বাজারের যে শান-শওকত ছিল, তা হারিয়ে গেছে। তবে চকের মসজিদটি তার পুরানো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এখনো। মসজিদের গোটা বাইরের দিক আলোকমালায় সাজানো। এর খানদানি আমেজ এখনো বজায় রেখেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রকৃতপক্ষে এটাই নগরীর কেন্দ্রীয় মসজিদের ভূমিকা পালন করে চলেছে। আযান বা খুদবার জন্য এ মসজিদে কোন লাউডস্পিকারের ব্যবস্থা নেই। মুয়াজ্জিন মসজিদ মিনার থেকে উচ্চৈস্বরে আযান দিয়ে থাকেন। জুমার দিন এখানে এত লোক সমাবেত হয় যে, তখন তাকে মনে হয় যেন ঈদের জামাত। চকবাজারের পশ্চিম প্রান্তে তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটি নির্মাণ করেন শায়েস্তা খান ১৬৭৬ সালে। তিনি নিজেও এই মসজিদে নামাজ আদায় করতেন বলে জানা যায়। এই চকবাজারেই ইসলাম খাঁ একটা দুর্গ নির্মাণ করেন সপ্তদশ শতাব্দীতে। ইসলাম খাঁ’র এই দুর্গটাই এখনকার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। ধারণা করা হয়, সে আমলে অপরাধী বা বিদ্রোহীদের ধরে এনে চকবাজার চত্বরে ফাঁসি দেয়া হত। এই চত্বরেই হত তাদের বিচারের আয়োজন।

১৮২০-এর দশকে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট ড’স ও ওয়াল্টার্স চকবাজার ও এর আশেপাশের সমস্ত অননুমোদিত দোকানপাট তুলে দিয়ে গোটা চত্বরকে চারশ’ ফুট লম্বা, চার ফুট উঁচু ও আধা ফুট পুরু পাচিল দিয়ে ঘিরে দিয়েছিলেন। বাজারে ঢোকার জন্য ১৬টি গেট বানিয়েছিলেন। আমরা এখন যেটাকে গুলিস্তানের কামান বলে চিনি, সেই ‘বিবি মরিয়মকে’ তিনি সওয়ারি ঘাট থেকে তুলে এনে চকবাজারে স্থাপন করেন। এভাবে বাজারটি সংস্কার করার পর এখানে আবার বাজার বসতে শুরু করে। প্রথমদিকে এই বাজার বসত শুধু বিকাল বেলা। সে আমলে গভর্নর ভবনও ছিল এখনকার কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর। এ থেকে ধারণা করা যায়, নগরীতে চকবাজারের গুরুত্ব কতটা ছিল। যখন কোন শাহজাদা অথবা আমীর-ওমারাহ্ বা রাজকীয় ব্যক্তি এখানে কেনাকাটা করতে আসতেন, তখন নকিব হাঁক দিয়ে সে কথা সবাইকে জানিয়ে দিত আর চোপদাররা রাস্তার ভিড় সরিয়ে দিত। সাধারণ লোকজন তখন রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে সেই ব্যক্তিকে সম্মান জানাত।

চার্লস ড’য়লির তুলিতে চকবাজার। ১৮১৪ সালে আঁকা

শেয়ার করুন

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here