জনতার নিউজঃ

তুফান আটকের পর বেরিয়ে আসছে মতিন ও কাউন্সিলর রুমকির অপকর্মের ফিরিস্তি

বগুড়ার আলোচিত ছাত্রী ধর্ষণের পর সালিশের নামে মা-মেয়েকে মাথা ন্যাড়া করার ঘটনায় বহিস্কৃত শ্রমিকলীগ নেতা   তুফান সরকার গ্রেফতার হবার পর থেকে বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তুফান আটক হওয়ার পর আলোচনায় উঠে আসে পৌরসভার কাউন্সিলর মারজিয়া হাসান রুমকিরও নানা অপকর্মের কাহিনী। সেইসাথে প্রকাশ হতে থাকে তুফানের বড়ভাই শহর যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক মতিন সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ডের ফিরিস্তি।

মতিনের উত্থান যেভাবে :বগুড়ার চকসূত্রাপুর কসাইপট্টির মজিবুর রহমান সরকারের ৭ ছেলের মধ্যে মেজ ছেলে (২য়) মতিন সরকার। মজিবর  মাংস ও চামড়া বিক্রি করে জীবিকা চালাতেন। তার মেজ ছেলে আবদুল মতিন সরকারকে  ১৮-২০ বছর প্রথমে একজন সাধারণ কর্মি হিসেবে যুবলীগে নিয়ে আসেন বগুড়া জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি বর্তমান জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক মন্জুরুল আলম মোহন ।  ধীরে ধীরে তার সবচেয়ে আস্থাভাজন কর্মি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন । সেই সুবাদে শহর যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদকের পদটিও পেয়ে যান সহজেই ।  তবে  যুবলীগ ক্যাডার হিসেবেই পরিচিত মতিন ।

বিভিন্ন চাঁদাবাজি, হত্যা ও মাদক মামলার আসামি। শহর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (বর্তমানে বহিস্কৃত) পদ ছাড়াও  বছর ৪ আগে বছর আগে তিনি জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হন । এক বছর আগে জেলা ট্রাকমালিক সমিতি ও উত্তরবঙ্গ ট্রাক, কাভার্ডভ্রান ও পিকআপ মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন । সাধারণ সম্পাদক হয়ে প্রভাব বিস্তার করেন।

বগুড়ার চকসূত্রাপুর কসাইপট্টির মজিবুর রহমান সরকারের ৭ ছেলের মধ্যে মেজ ছেলে (২য়) মতিন সরকার। মজিজবর  মাংস ও চামড়া বিক্রি করে জীবিকা চালাতেন। তার মেজ ছেলে আবদুল মতিন সরকার বিভিন্ন চাঁদাবাজি, হত্যা ও মাদক মালার আসামি।

জানা গেছে, আবদুল মতিন ১৮-২০ বছর আগে যুবলীগের সাধারণ কর্মী থেকেই হঠাত্ অস্ত্রধারী ক্যাডার বনে যান। ২০০০ সালের দিকে শহরের নুরানী মোড় এলাকায় সদর ফাঁড়ির টিএসআই তাকে গুলিভর্তি একটি নাইন এমএম পিস্তলসহ গ্রেফতার করেন। ২০০৪ সালের দিকে ওই মামলায় তার ২৭ বছর কারাদণ্ড হয়। কিছুদিন জেলে থাকার পর উচ্চ আদালতে মামলাটি স্থগিত হলে তিনি বেরিয়ে আসেন।  ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি ক্ষমতা ব্যবহার করে  ভারত থেকে চোরাপথে আসা জিরার চোরাচালন ব্যবসা শুরু করেন । গড়ে তোলেন সিন্ডিকেট । এভাবে খুব অল্প সময়ে কোটিপতি হয়ে যান মতিন সরকার’। বিলাসবহুল গাড়িতে চলাফেরা করেন। বগুড়া ও ঢাকায় রয়েছে একাধিক বাড়ি

ধর্ষণের গঠনায় প্রধান অভিযুক্ত  তুফান সরকারের বড় ভাই মতিন সরকার আবু নাসের উজ্জ্বল হত্যা মামলায় পাঁচ বছর আগে গ্রেফতার হলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি জামিনে মুক্তি পেয়ে যান। এরপর মামলায় হাজিরা না দেয়ায় তার বিরুদ্ধে জারি হয় গ্রেফতারি পরোয়ানা। এরপর থেকেই প্রায় ৫ বছর ধরে তিনি আদালতের ণথিতে ‘পলাতক’। কিন্তু পুলিশ ও আদালতের দৃষ্টিতে মতিন সরকার পলাতক হলেও এলাকায় তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়িয়েছেন। যুবলীগের এই নেতা প্রকাশ্যে ডিসি, এসপি ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে সভা-সমাবেশেও যোগ দিয়েছেন।

ধর্ষণের ঘটনায় রিমান্ডে থাকা তুফানের ভাই মতিন সরকারের এসব অপকর্ম এখন এলাকায় মানুষের মুখে মুখে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি কৌঁসুলিদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জানতে চাইলে বগুড়ার পিপি আবদুল মতিন জানান, মতিন সরকার প্রকাশ্যে ডিসি, এসপিসহ অনেকের সঙ্গে বৈঠক করছেন।

পুলিশ ও আদালতের তথ্য অনুসারে, মতিনের নামে ৩-৪টি হত্যা মামলা রয়েছে। ১৯৯৮ সালের দিকে শহরের নুরানী মোড় এলাকায় রসুল, ২০০১ সালে চকসূত্রাপুরে আবু নাসের উজ্জ্বল, ২০১১ সালে মাটিডালি বাণিজ্য মেলায় শফিক চৌধুরী এবং ২০১৫ সালে চকসূত্রাপুরে এমরান হত্যার অভিযোগ ওঠে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মমতাজ উদ্দিন বলেন, আমি সেখানে গিয়েছিলাম ব্যবসায়ী হিসেবে। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়। এতে আমার কোনো দোষ আছে বলে মনে করি না। বগুড়ার সাবেক ডিসি আশরাফ উদ্দিনের সঙ্গে মতিন সরকারকে সভায় যোগ দিতে দেখা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আইনজীবী জানান, মামলার তারিখেও মতিন সরকার আদালতে আসেন। সরকারি কৌঁসুলিদের মোটা অংকের টাকা ঘুষ দিয়ে পলাতক হিসেবে আছেন। আর সরকার অর্থ ব্যয় করে তার পক্ষে স্টেট ডিফেন্স রেখেছে।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, হত্যা মামলায় আবদুল মতিন সরকার পলাতক থাকা এবং ২০১২ সালে তার পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ করার বিষয়টি তার জানা নেই। তিনি বলেন, খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বগুড়া জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম ডাবলু জানান, ছাত্রী ধর্ষণ, নির্যাতন ও মাকেসহ তাকে ন্যাড়া করে দেয়ার ঘটনায় শহর যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক পদ আবদুল মতিন সরকারকে সংগঠন থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।

রুমকি ঃ

মার্জিয়া হাসান রুমকি বগুড়া শহরের বাদুড়তলা এলাকার চামড়া ব্যবসায়ী জামিলুর রহমান রুনুর মেয়ে। প্রেম করে বিয়ে করেন পাশ্ববর্তী এলাকার জাহিদ নামের যুবককে । পারিবারিকভাবে বিএনপি ঘরানার হলেও ( তুফানের বাবা জামিলুর রহমান রুনুর মামা বগুড়া জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক) তার ছোট বোন আশা প্রেম করে বছর ৭ আগে বাড়ি থেকেপালিয়ে বিয়ে করে তুফান সরকারকে । ্ ২০১৫ সালে পৌরসভার নির্বাচনে ভগ্নিপতি ‘তুফান বাহিনীর’ সহায়তায় ৪,৫,৬নং ওয়ার্ডের (২নং সংরক্ষিত) আসনের কাউন্সিলর হন রুমকি। এরপর থেকেই রুমকি বেপরোয়া হয়ে উঠেন। পৌরসভায় সেবা নিতে আসা জনগণের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা নেয়া এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করতে শুরু করেন।

অভিযোগ রয়েছে, ওয়ার্ডে কোনো নাগরিক তার বাড়ি নির্মাণ, সংস্কারসহ অন্যান্য কাজ করলে রুমকিকে বাধ্যতামূলক চাঁদা দিতে হয়। একসময় পৌরসভাতে ত্রাস হিসেবে পরিচিত পান তিনি।

ধর্ষণের পর সালিশের নামে মা-মেয়েকে মাথা ন্যাড়া করার ঘটনায় আলোচনায় উঠে আসার পর পৌরসভার কাউন্সিলর মারজিয়া হাসান রুমকির এসব কর্মকান্ডের  কথা প্রকাশ পাযে ।

তুফান সরকার

২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর চকসূত্রাপুর বেগম বাজার লেনএলাকার যুবদলকর্মী এমরান দিনের বেলায় খুন হন । আর এই খুনের পর তুফানের নাম ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।  দিনের বেলা খুন হওয়া এমরানের খণ্ডবিখণ্ড লাশ পাওয়া গিয়েছিল। তুফান ওই মামলার আসামি। এই হত্যাকাণ্ডের পর মাদক ব্যবসায়ী তুফান দখল, চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ে ।ভাই মতিনের চেয়েও ভয়ঙকর হয়ে ওঠে ।  শ্রমিক লীগের পদ পাবার পর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

রাজনৈতিক মর্যাদা পেয়ে বাইয়ের পরিচয়ে বিভিন্ন অপকর্শ কারী তুফান নিজেই একটি বাহিনী গড়ে তোলেন । সকলেই আড়ালে যে বাহিনীকে আখ্যায়িত করতো তুফাই মেইল বলে ।

স্থানীয়দের ক্ষোভ এবং অভিযোগ বিস্তর । কিন্তু কেউই নাম প্রকাশ করতে চায়না ।স্থানীয়রা জানান,  প্রাণের ভয়ে তুফানের বিরুদ্ধে কেউ মামলা করতে সাহস পায়নি। সব ঘটনায় মামলা হলে এতদিন মামলার সংখ্যা বেড়ে যেতো কয়েকগুন ।। মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে চরতো তুফানকে। এই বাহনীকে দেখলেই ভয় করতো সকলেই ।

সূত্র জানায় ,  টেকনাফের এক প্রভাবশালীর সঙ্গে তুফানের যোগাযোগ রয়েছে। সেখান থেকে আসা ইয়াবা, ফেন্সিডিলের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও করতো সে ।  কোটিপতি তুফান এখন দুটি প্রাইভেট কার নিয়ে ঘোরাফেরা করেন। তুফান বাহিনীকে কিনে দেওয়া হয়েছে ৫০টি মোটর সাইকেল। এছাড়া প্রতিদিন ক্যাডারদের ভাতাও দেওয়া হতো।

বগুড়া জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, “তুফানদের কার্যকলাপের বিষয়ে কথা বলতে ভয় লাগে। আমার মতো দলের অনেকেই তুফান সরকার ও তার ঘনিষ্ঠজনদের দেখে ভয় পায়।

বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তী জানান, তুফানকে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন মামলায় রিমান্ডে নেওয়া হলেও এর বাইরেও তার কর্মকাণ্ডের তথ্য নিতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, ধর্ষণ ও নির্যাতনের মামলার কার্যক্রম দ্রুত গতিতে চলছে। এর বাইরেও খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে।

এক শিক্ষার্থীকে  ভালো কলেজে ভর্তির প্রলোভন দেখিয়ে নিজ বাড়িতে ডেকে নিয়ে ১৭ জুলাই ধর্ষণ করেন শহর তুফান সরকার। বিষয়টি জানতে পেরে তুফানের স্ত্রী আশা ও তার বড় বোন বগুড়া পৌরসভার সংরক্ষিত মহিলা ওয়াডের্র কাউন্সিলর মার্জিয়া হাসান রুমকিসহ একদল সন্ত্রাসী’ শুক্রবার দুপুরে ওই কিশোরী এবং তার মাকে বর্বর  নির্যাতন  করে এবং নিজেরা চুল কেটে দিয়ে পরে  নাপিত দিয়ে মা ও মেয়ের মাথা ন্যাড়া করে দেন। এ ঘটনায় শিক্ষাথীৃর মা বাদী হয়ে শুক্রবার রাতে শ্রমিক লীগ নেতা তুফান সরকার, তার স্ত্রী আশা সরকার, আশা সরকারের বড় বোন বগুড়া পৌরসভার সংরক্ষিত ওয়াডের্র নারী কাউন্সিলর মার্জিয়া আক্তারসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগে দুটি মামলা করেন।

পুলিশ ঘটনার রাতেই তুফান সহ ৪ জনকে এবং একদিন পর অপর আসামদের গ্রেফতার করে ।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here