জনতার নিউজ 

টার্গেট কিলিংয়ের নেপথ্যে

  • এ পর্যন্ত ২৭ হত্যাকাণ্ড

  • আটক ব্যক্তিদের প্রত্যেকেই কোন না কোন সময় জামায়াত-শিবিরের সক্রিয় নেতাকর্মী ছিল বলে প্রমাণ মিলছে

  • অনেক খুনী শিবিরের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়কে কেন্দ্র করেই হচ্ছে একের পর ‘টার্গেট কিলিং।’ দেশকে অস্থিতিশীল করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের লক্ষ্যে রায়ের আগে ও পরে এ পর্যন্ত অন্তত ২৭টি টার্গেট কিলিং বা গুপ্ত হত্যার ঘটনা ঘটানো হয়েছে। হত্যার জন্য অধিকাংশ সময় এমন ব্যক্তিদের টার্গেট করা হয় যারা হয় যুদ্ধ্পারাধীদের বিচারে সক্রিয়, না হয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী কিংবা জামায়াত-শিবিরসহ উগ্রবাদীদের সমালোচনাকারী পীর দরবেশ ও ইসলামী চিন্তাবিদ। ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী রাজীব হায়দার হত্যাকা-ের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি গুপ্ত হত্যার কেন্দ্রে ছিল মূলত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কোন না কোন যুদ্ধ্পার্ধাীর রায়। সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাও সরকারকে এ বিষয়ে সতর্ক করে হত্যা বন্ধে পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করে দেশকে অস্থিতিশীল করা প্রগতিশীল ব্যক্তি, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর লোকজনকে হত্যার অন্যতম কারণ। আবার এ যুদ্ধাপরাধীরা জামায়াত ও বিএনপির নেতা হলেই কেবল ঘটছে এসব হত্যার ঘটনা। অন্য কোন দল কিংবা আঞ্চলিক কোন যুদ্ধাপরাধীর বিচার হলে নাশকতা হয় না। তবে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নাগরিকদের হত্যা করে ভারত ও পশ্চিমা দেশগুলোর নজর কাড়ার একটা কারণ। জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে উগ্রবাদীদের কর্মকা- সব সময়েই এক পথে চলে। তাদের লক্ষ্যও অভিন্ন। সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট বলছে, এ পর্যন্ত হত্যাকান্ডের ঘটনায় আটক অপরাধীদের তথ্য প্রমাণ দেয় যে, তারা প্রত্যেকেই কোন না কোন সময় জামায়াত-শিবিরের সক্রিয় নেতাকর্মী ছিল। সম্প্রতি আটক হওয়া অনেক খুনী সরাসরি শিবিরের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, তারা এ ধরনের অধিকাংশ হত্যাকান্ডে ই জামায়াত-শিবিরের সম্পৃক্ততা এবং অপরাধমূলক কর্মকা-ের প্রমাণ পাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিএনপির সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, জামায়াত-শিবির, হুজি (হরকত-উল-জিহাদ আল ইসলামী) এবং জেএমবি (জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ] একই জিনিস তারা এই অপরাধমূলক কার্যক্রম করে দেশে অস্থিরতা তৈরি করতে চায়। অপরাধের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচাল করা এবং দেশকে অস্থিতিশীল করা তাদের টার্গেট।

সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট ও আন্তর্জাতিক অপরাধী ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধীর রায়ের আগে ও পরের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রায়ের আগে ও পরে এ পর্যন্ত অন্তত ২৭টি টার্গেট কিলিং বা গুপ্ত হত্যার ঘটনা ঘটানো হয়েছে। হত্যার জন্য অধিকাংশ সময়ই এমন ব্যক্তিদের টার্গেট করা হয়েছে যারা হয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গণজারণ মঞ্চের সক্রিয় না হয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সদস্য কিংবা জামায়াত-শিবিরসহ উগ্রবাদীদের সমালোচনাকারী পীর দরবেশ ও ইসলামী চিন্তাবিদ। গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রগুলো বলছে, কিছুদিন আগে কেবল এ বিষয়েই একটা রিপোর্ট দিয়েছিল একটি গোয়েন্দা সংস্থা। ‘ট্রাইব্যুনালকে কেন্দ্র করে ট্রার্গেট কিলিং’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন দেয়ার পর আরও বেশ কয়েকটি প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে একই চিত্র।

দেখা গেছে, ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সক্রিয় গণজাগরণ মঞ্চের সক্রিয় কর্মী এবং ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যাকা- ঘটে। তার আগে ৫ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়। এর প্রতিবাদে একই দিন বিকেলে শাহবাগে বিক্ষোভ হয়, যা পরবর্তীতে গণজাগরণ মঞ্চে রূপ নেয়। গণদাবির মুখে ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে ১৯৭৩ সালের আইসিটি আইন সংশোধন করে রাষ্ট্রপক্ষকে আপিল করার সুযোগ দেয়। পরবর্তীতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ আইসিটি যুদ্ধাপরাধী দেলোয়ার হোসেন সাঈদিকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেয়।

এরপর ২০১৪ সালের ১ আগস্ট সাভারের একটি মেসে ব্লগার এবং যুদ্ধাপরাদীদের বিচারের দাবিতে সক্রিয় কর্মী আশরাফুল আলম হত্যার ঘটনা ঘটে। ২৭ আগস্ট রাজধানীতে নিজের বাসায় জঙ্গীবাদ বিরোদী ইসলামী নেতা নুরুল ইসলাম ফারুকীকে হত্যা করা হয়। যিনি ছিলেন ইসলামী ফ্রন্টের অন্যতম নেতা। দলটির পক্ষ থেকে তখন থেকেই জামায়াত-শিবিরসহ জঙ্গীবাদীদের দায়ী করে আন্দোলন চলছে। এই হত্যার কয়েকদিন পর ১৪ সেপ্টেম্বর সুপ্রীমকোর্ট দেলোয়ার হোসেন সাঈদির রায় দেয়।

২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল য্দ্ধুাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীকে মৃত্যুদ- প্রদান করে। একই বছরের ২ নবেম্বর মীর কাশেমকে মৃত্যুদ- প্রদান করে। এরপর ১৫ নবেম্বর নিজ বাড়ির সামনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম শফিউল ইসলামকে হত্যা করা হয়। ২০১৫ সালের ১৬ জুন সুপ্রীমকোর্ট কর্তৃক জামায়াতে ইসলামী নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদকে মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়। তার আগেই ১২ মে সিলেটে যুদ্ধপরাধের বিচারের দাবিতে সক্রিয় কর্মী এবং ব্লগার অনন্ত বিজয় দাসকে হত্যা করা হয়। ২০১৫ সালের ২৯ জুলাই সুপ্রীমকোর্ট বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদ- প্রদান করে। ৭ আগস্ট ঢাকায় নিজ বাসায় যুদ্ধপরাধের বিচারের দাবিতে সক্রিয় কর্মী এবং ব্লগার নীলাদ্রি চ্যাটার্জী নিলয় হত্যা করা হয়।

২০১৫ সালের ১৮ নবেম্বর সুপ্রীমকোর্ট সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের রিভিউ রায় প্রকাশ করে। দুটি গুরুত্বপূর্ণ রায় প্রকাশের আগে ও পরে বেশ কয়েকটি হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটে। ৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে এক ফকির (দরবেশ) এবং তার সহযোগীকে হত্যা করা হয়। ৫অক্টোবর পাবনার ঈশ্বরদীর ফেইথ বাইবেল যাজক লুক সরকারকে গলা কেটে হত্যা চেষ্টা হয়। একই দিনে রাধানীতে বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মুহম্মদ খিজির খানকে ঘরে ঢুকে গলা কেটে হত্যা, যাকে অনেকই ‘পীর’ বলে মান্য করত। ২২ অক্টোবর রাজধানীর গাবতলীতে পুলিশী তল্লাশি চলাকালে এক সাব-ইন্সপেক্টরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা। ৩১ অক্টোবর, জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সাল আরিফিন দিপনকে কুপিয়ে হত্যা। একই দিনে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ঢাকার লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর লেখক আহমেদুর রশিদ টুটুলসহ আরেকজন ব্লগার ও লেখকে হত্যা চেষ্টা।

ঢাকার গাবতলীতে তল্লাশি চৌকিতে ছুরিকাঘাতে পুলিশের এক এস আই নিহত হওয়ার ১৩ দিনের মাথায় ৪ নবেম্বর সাভারের আশুলিয়ায় পুলিশের একটি চেকপোস্টে তল্লাশির সময় ছুরি মেরে পুলিশের এক কনস্টেবলকে হত্যা ও চারজনকে জখম করা হয়।

১০ নবেম্বর রংপুরের কাউনিয়ায় একটি মঠের সেবককে গলা কেটে হত্যা করা হয়। ৮ নবেম্বর রংপুর শহর বাহাই সম্প্রদায়ের এক নেতাকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে মোটরসাইকেলে আসা তিন জন। রংপুরে দুই বিদেশীকে গুলি করে হত্যার দেড় মাসের মাথায় ১৮ নবেম্বর যুদ্ধাপরাধী সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী এবং আলী আহসান মোহাম্মদমুজাহিদের ফাঁসির দ- পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) রায়ের দিন দিনাজপুর শহরে একই কায়দায় পিয়েরো পাববোলারিকে (দিনাজপুরের সুইহারি ক্যাথলিক চার্চের ফাদার) গুলি করে হত্যার চেষ্টা চলে।

পুরান ঢাকার হোসাইনী দালানে ইমাম বাড়ায় শিয়া সমাবেশে হামলার ৩৪ দিনের মাথায় ২৬ নবেম্বর বগুড়া জেলায় একই সম্প্রদায়ের মসজিদে গুলি চালিয়ে মুয়াজ্জিনকে হত্যা করা হয়। চলতি বছর ৬ জানুয়ারি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের আমির ও সাবেক মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির দ- বহাল রাখে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। তার আগেই ৪ ডিসেম্বর দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী কান্তজি মন্দিরে বোমা হামলা, ১০জন আহত হয়। ১০ ডিসেম্বর দিনাজপুরে একটি ইসকন মন্দিরে হামলা হয়। ঘটনায় দুইজন আহত হন। একই দিনে চুয়াডাঙ্গায় লোকগান উৎসবের সংগঠককে হত্যা করা হয়। ২৫ ডিসেম্বর রাজশাহীর আহমেদীয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলা, একজন নিহত ও ১০জন আহত হয়।

চলতি বছর ৪ মার্চ সুপ্রীমকোর্ট যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর ফাঁসির আদেশ বহাল রাখে। ২৯ মার্চ সুপ্রীমকোর্টেও রায়ের বিপক্ষে রিভিউ আবেদন করে। ৮ এপ্রিল ঢাকার সূত্রাপুরে যুদ্ধপরাধীদের বিচারের দাবিতে সক্রিয় কর্মী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালযের ছাত্র নাজিমুদ্দিন সামাদকে হত্যা করা হয়। ২৩ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্বদ্যিালয়ের ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিককে হত্যা করা হয়।

২৫ এপ্রিল রাজধানীর কলাবাগানে মার্কিন দূতাবাসের সাবেক প্রটোকল অফিসার ও ইউএসএআইডি কর্মকর্তা জুলহাস মান্নান ও তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব তনয়কে হত্যা করা হয়। ১ মে টাঙ্গাইলে হিন্দু দর্জিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

৬ জুন দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রীমকোর্ট শীর্ষ জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর ফাঁসির আদেশের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে। ৭ জুন জেল কর্তৃপক্ষ তাকে মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনায়। তবে ৫ জুন সদরদফতরে কর্মরত পুলিশ সুপার ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ৭জুন ঝিনাইদহে একই কায়দায় হিন্দু ইলেকট্রিক মিস্ত্রি আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলিকে হত্যা করা হয়। এরপর দেশজুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযানের শুরুর দিনই হত্যা করা হয় পাবনায় অনুকূল ঠাকুরের আশ্রমের এক সেবায়েতকে। মাদারীপুরের সরকারী নাজিম উদ্দিন কলেজের শিক্ষককে কুপিয়ে হত্যা করতে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পরে শিবির ক্যাডার ওয়ালিউল্লাহ। পুশিরের কাছে সে জবানবন্দীও দেয় যে, এসব হত্যা জামায়াতের নির্দেশে হয়। জেএমবি, হিজবুত তাহরীরসহ বিভিন্ন জঙ্গী গোষ্ঠীর ব্যানারে হত্যাকা- চললেও তা চলে মূলত জামায়াত-শিবিরের নির্দেশেই। ওয়ালিউল্লাহ পরে অবশ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে।

লেখক সাংবাদিক ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নিমূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলছিলেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বাংলাদেশে আইএসআই প্রধান এজেন্ট ছিলেন। আইএসআই জামায়াতের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। অতএব, আইএসআই তার এজেন্টদের বিচার মেনে নিতে পারে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করা সব সময়েই তাদের অন্যতম লক্ষ্য। এজন্য জামায়াত তাদের অর্থে সক্রিয় সকল জঙ্গী গোষ্ঠীকে নিয়ে এক হয়ে কাজ করে। আমরা বহুবার বলেছি, জামায়াত নিষিদ্ধ করতে হবে। জামায়াত হচ্ছে সকল জঙ্গী গোষ্ঠীর ছায়া। জামায়াতকে সক্রিয় রেখে জঙ্গী নির্মূল করা সম্ভব নয়। সৌজন্য জনকন্ঠঃ-

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here