newজামায়াতে ইসলামী ও দৈনিক সংগ্রাম নিষিদ্ধ এবং এইসব প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আবেদন জানিয়েছে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী সংস্থা। মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত থাকার দায়ে ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে জামায়াতের বিরুদ্ধে সাত ধরনের অপরাধ আনা হয়েছে। এসব অপরাধ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইনের ৩ (২) ও ৪ এর (১) ও (২) ধারার আওতাভুক্ত বলে দাবি করা হয়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপনের জন্য রাষ্ট্রপক্ষের কাছে দাখিল করা হবে। তদন্ত সংস্থার ধানমন্ডির সেফ হোমের কার্যালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

গত বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিলের বিধান রেখে সংশ্লিষ্ট আইনের সংশোধনী সংসদে পাস হয়। ওই সময় আইনের ৩ ধারা সংশোধন করে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনেরও বিচারের বিধান করা হয়। কিন্তু ২০ ধারায় দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির সাজার পাশাপাশি সংগঠনের সাজা কী হবে, তা উল্লেখ করা হয়নি। আইনে শাস্তির বিধান না থাকলেও তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সানাউল হক দাবি করেছেন, জেনারেল ক্লজেজ অব এ্যাক্টের বিধান অনুযায়ী সংগঠনকেও বিচারের আওতায় আনা যাবে। তিনি বলেন, ১৮৯৭ সালের জেনারেল ক্লজেজ অ্যাক্টে ‘ব্যক্তি’র (পারসন) সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কোম্পানি, অ্যাসোসিয়েশন বা ব্যক্তিগোষ্ঠীও ‘ব্যক্তি’ বিবেচিত হবে। সে ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের আইনে ২০ ধারায় উল্লেখিত ‘ব্যক্তির’ মধ্যে সংগঠনও পড়বে। আর ট্রাইব্যুনালের যেকোনো সাজা দেয়ার ক্ষমতা আইনেই আছে। উল্লেখ্য, ট্রাইব্যুনাল আইনের ২০ (২) ধারায় বলা হয়েছে, অপরাধের তীব্রতা অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের কাছে মৃত্যুদণ্ড বা অন্য যেকোন শাস্তি যথাযথ মনে হলো দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে সেই দণ্ড দিতে পারবেন। আইনের ২০ ধারাটি মূলত দণ্ডাদেশ দেয়া সংক্রান্ত।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনকেও অভিযুক্ত করতে হবে। জার্মানীতে নাত্সী পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। এক্ষেত্রে আইন সংশোধন করে ট্রাইব্যুনালকে সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধের ক্ষমতা দেয়া উচিত। বর্তমান আইনে এ বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে।

সানাউল হক বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে নুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রায়েলের পরে এই প্রথম কোন সংগঠনের বিচার হতে যাচ্ছে। জামায়াতের বিরুদ্ধে একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে সারাদেশে সংঘটিত হত্যা, গণহত্যাসহ সকল অপরাধের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

জামায়াত ছাড়া অন্য দলের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সানাউল হক আরো বলেন, জামায়াত ছাড়াও একাত্তরে অপরাধের জন্য মুসলিম লীগ, কনভেনশন মুসলিম লীগ, পিডিপি, নেজামে ইসলামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করা হবে। কিন্ত একাত্তরে জামায়াত সবচেয়ে বেশি অপরাধ সংঘটন করেছিলো।

তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান বলেন, ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলো সিদ্ধান্ত নিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিলো। তদন্তকালে সেসব অপরাধের তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। জামায়াতের বিরুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জেনেভা কনভেনশন ও অন্য যেকোন আন্তর্জাতিক আইন-লঙ্ঘন, মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা ও ষড়যন্ত্র এবং এসব অপরাধ ঠেকাতে ব্যর্থতাসহ সাত ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাত্তরে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্র সংঘ, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল বদর ও আল শামস বাহিনী এবং জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম এসব সংগঠনের নীতিনির্ধারক ও সব নেতাকর্মী এসব অপরাধের জন্য দায়ী। এসব অভিযোগে জামায়াত ছাড়াও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে। শুধু নিষিদ্ধ নয়, ভবিষ্যতে জামায়াতে ইসলামীর ভাবাদর্শ নিয়ে যাতে কেউ রাজনীতি করতে না পারে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। সাংবাদিক সম্মেলনে প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ ও তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

গত বছরের ১৮ আগস্ট তদন্ত শুরু হয়। দীর্ঘ প্রায় সাত মাস পর চূড়ান্ত করা তদন্ত প্রতিবেদন আগামীকাল বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় বরাবর দাখিল করা হবে বলে জানান হান্নান খান। ৩৭৩ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের সঙ্গে জব্দ তালিকা ও দালিলিক প্রমাণপত্রসহ সাতটি খন্ডে মোট ২ হাজার ৩০৩ পৃষ্ঠা ও অন্যান্য ডকুমেন্টসহ ১০ খন্ডে ৩ হাজার ৭৬১ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট তৈরি করা হয়েছে। তদন্তকালে ৭০ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।

জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলা হলে সংগঠনের পক্ষে আইনি লড়াই কীভাবে হবে জানতে চাইলে হান্নান খান বলেন, অভিযোগপত্র দাখিলের পর জামায়াতে ইসলামী সংগঠন বরাবর নোটিস পাঠানো হবে। জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িতরা না আসলে আসামিপক্ষের অনুপস্থিতিতে বিচার হবে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here