একসময় যাঁরা আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা করতেন, আওয়ামীবিরোধী রাজনীতি করতেন, সেই বিএনপি-জামায়াতের অনেকে নিজেদের স্বার্থে টার্গেট করে দলে দলে যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগে। অনেকে সরাসরি বিএনপি-জামায়াত থেকে আওয়ামী লীগে যেমন যোগ দিয়েছেন, আবার অনেকে জামায়াত থেকে বিএনপি হয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। শুধু যোগদান নয়, এই যোগ দেওয়া নেতাকর্মীদের অনেকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কমিটিতে পদ-পদবি বাগিয়ে নিচ্ছেন। আওয়ামী লীগে আগে যাঁরা বিভিন্ন কমিটির পদে ছিলেন, তাঁদের হটিয়ে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নিচ্ছেন। একদা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এই নেতাকর্মীরা টার্গেট করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে রাতারাতি হয়ে যাচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক। বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগদানকারীদের দলীয় পদ-পদবি দেওয়ার ক্ষেত্রে উদারতা দেখিয়েছে আওয়ামী লীগও। বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান ঘটেছে মূলত দুটি পর্যায়ে। প্রথম পর্যায় হলো ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর। আর দ্বিতীয় পর্যায় হলো ২০১৪ সালে চারদলীয় জোট যখন সরকারবিরোধী সহিংস আন্দোলনে ব্যর্থ হয় তার পর। বিভিন্ন গণমাধ্যম, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য ও কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে এই চিত্র।

বিএনপি থেকে ২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগে মোট যোগদানের ঘটনা ঘটেছে ৮৩টি। এর মধ্যে ৬২টি যোগদান হয়েছে একই সঙ্গে জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীদের সম্মিলিত। বাকি ২১টি যোগদান হয়েছে শুধু বিএনপি নেতাকর্মীদের। আর এই যোগদানের ঘটনাগুলোর মধ্যে ৬০টি হয়েছে ২০১৪ সালের পর।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মাদ নাসিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জামায়াত ও স্বাধীনতাবিরোধী বা জামায়াতপন্থী কাউকে আওয়ামী লীগে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের আগেই নেওয়া হয়েছে। তার পরও যদি দলের কোনো ইউনিট সিদ্ধান্ত অমান্য করে কাউকে দলে নিয়ে থাকে, পদ-পদবি দিয়ে থাকে, তাদের দল থেকে বের করে দেওয়া হবে। আওয়ামী লীগ একটি আদর্শভিত্তিক সংগঠন। এ দলে জামায়াত-শিবির, যুদ্ধাপরাধী বা জামায়াতপন্থী বিএনপি এমন কারো স্থান হতে পারে না।’   

আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্য যেসব নেতার হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে মূল দলসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে যোগদান করেছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, অর্থ প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান, জয়পুরহাটের এমপি সামছুল আলম দুদু, চাঁপাইনবাবগঞ্জের এমপি আব্দুল ওদুদ, রাজশাহীর গোদাগাড়ীর এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী, রাজশাহীর পুটিয়ার এমপি আ. ওয়াদুদ দারা, রাজশাহীর বাগমারার এমপি এনামুল হক, পাবনা সদরের এমপি ফারুক খন্দকার প্রিন্স প্রমুখ।

তৃণমূলে বিএনপি পরিচিত দুইভাবে। এক, বিএনপি ও দুই, জামায়াতপন্থী বিএনপি। তৃণমূলের রাজনৈতিক কর্মীরা বলছে, জামায়াতপন্থী বিএনপির বেশির ভাগ স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের। এরা  বিএনপি করলেও আত্মীয়স্বজনের অনেকে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এদের বড় একটি অংশ দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ হওয়ার পর সংঘটিত সহিংসতায় জড়িত। অনেকে ওই সহিংসতায় হওয়া মামলার আসামি। বিএনপির দুই ধারার নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগে যোগ দিলেও জামায়াতপন্থী অংশ দলীয় পদ-পদবি পেতে মরিয়া। এর জন্য তারা আওয়ামী লীগ নেতাদের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের যেসব জেলা-উপজেলা, ইউনিয়ন ও ইউনিট কমিটির সম্মেলন ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসের আগে শেষ হয়েছে আর অভ্যন্তরীণ বিরোধে যেখানে সম্মেলন হতে পারেনি সেসব এলাকায় যোগদানকারী জামায়াতপন্থী বিএনপি নেতারা অর্থের বিনিময়ে স্কুল-কলেজ পরিচালনা পর্ষদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপূর্ণ পদে বসেছেন।

যেসব এলাকায় দলীয় সম্মেলন হওয়ার আগে যোগ দিয়েছেন, সেসব এলাকার কমিটিতে স্থান করে নিয়েছেন তাঁরা। আওয়ামী লীগের স্থানীয় সূত্র, গণমাধ্যম ও কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৯ সালের পর শুধু বিএনপি থেকে প্রায় ২৫ হাজার নেতাকর্মীর অনুপ্রবেশ ঘটেছে আওয়ামী লীগে। যেসব নির্বাচনী এলাকায় বিএনপি-জামায়াত থেকে লোক এনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, সেসব এলাকায় অনুপ্রবেশের ঘটনা অন্য এলাকার চেয়ে বেশি হয়েছে। কক্সবাজারে এই অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে ‘আশ্রয় লীগ’ নামটি। অনুপ্রবেশকারী বিএনপি-জামায়াতের যেসব নেতাকর্মীকে এখনো দলে পদ-পদবি দেওয়া সম্ভব হয়নি তাঁরা নিজেরা নিজেদের পরিচয় দেন আওয়ামী আশ্রয় লীগের নেতা হিসেবে। বর্তমানে এই আশ্রয় লীগে আছেন কক্সবাজার জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য উখিয়ার খায়রুল আলম চৌধুরী, জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি নুর আহমেদ আনোয়ারী, পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউপি চেয়ারম্যান, যুদ্ধাপরাধ মামলায় ফাঁসিতে দণ্ডিত মীর কাসেম আলীর সাবেক বডিগার্ড শরাফাত উল্লাহ ওয়াসিম। চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ওয়াসিম সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে মগনামা ইউপি আওয়ামী লীগ নেতা ইউনুস আলীকে অপহরণ করার পরও জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয়েই বর্তমানে রয়েছেন তিনি।

কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার ঘোরককাটা পৌর মেয়র মাকসুদ আহমেদ ছিলেন মহেশখালী উপজেলা বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য। বর্তমানে তিনি কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এবং আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত পৌর মেয়র। তাঁর বড় ভাই কক্সবাজার জেলা বিএনপির সিনিয়র নেতা এবং মাকসুদ আহমেদের বাবা মাহমুদ আহমেদ ছিলেন রাজাকার। অভিযোগ রয়েছে, কক্সবাজার জেলার প্রথম শহীদ কালামেরছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মাদ শরীফকে তিনি হত্যা করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহেশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার পাশা চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁরা জন্মলগ্ন থেকে বিএনপি। এখন মাকসুদ আহমেদ কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য। তবে ১৯৭১ সালে কালামেরছাড়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান শরীফ হত্যার সঙ্গে তাঁর বাবা নন, তাঁর চাচা মৌলভি জাকারিয়া জড়িত।

ফরিদপুরের সালথা উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি শের আলী খান বর্তমানে আওয়ামী লীগ উপজেলা কমিটির সদস্য। স্বাধীনতাযুদ্ধে তিনি সরাসরি অস্ত্রধারী রাজাকার ছিলেন। শহিদুজ্জামান সালথা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক। বর্তমানে তিনি সালথা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর মাঝারদিয়া গ্রামের আওয়ামী লীগকর্মী হায়দার মোল্লার দুটি চোখ তুলে নেওয়া হয় এই শহিদুজ্জামান চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে। মাওলানা মেজবাউর রহমান খেলাফত মজলিশের কেন্দ্রীয় নেতা। তাঁকে সালথা উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য করা হয়েছে। মাওলানা হাবিবুর রহমান সাবেক বিএনপি নেতা। তিনি খায়েরদিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আবুল কালাম আজাদের (বাচ্চু রাজাকার) ভাই তিনি। তাঁকে দলে এনে যদুনন্দী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য করা হয়েছে।

সালথা উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে। সম্মেলনের পর আওয়ামী লীগে যোগদান করায় পদ-পদবি না পেলেও আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্য করা হয়েছে সালথা উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি হাবিবুর রহমান, জয়নাল আবেদীন, ফিরোজ চেয়ারম্যান ও রাজাকার পরিবারের সন্তান আবুল খায়ের, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওয়াহিদুজ্জামান, প্রচার সম্পাদক হাফিজুর রহমান লাবলু ও ভাওয়াল ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আবদুল মকিম মিয়াকে।

এ ব্যাপারে সালথা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই যোগদান ও পদ-পদবি দেওয়ার বিষয়ে একক ক্ষমতা খাটিয়েছেন সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরীর ছেলে আয়মন আকবর চৌধুরী বাবলু। বিএনপি থেকে দলে লোক আনা হয়েছে। প্রতিবাদ করে নাজেহাল হয়েছি।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলমগীর কবির একসময় ছিলেন নারায়ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য। তাঁর বাবা হুমায়ুন কবীর এলাকায় পরিচিত হুমায়ুন দারোগা নামে। তিনি একাত্তরে পাকিস্তানপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। হুমায়ুন কবীর আওয়ামী লীগে যোগ দেন ২০০৬ সালে সদর আসনের বর্তমান এমপি আবদুল ওদুদের সঙ্গে।

জাতীয়তাবাদী যুবদল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা কমিটির সহসভাপতি এজাবুল হক বুলি বর্তমানে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ। তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন ২০০৯ সালে।

রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সহপ্রচার সম্পাদক ইউসুফ হোসেন। একসময় তিনি ছিলেন একই উপজেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক। বর্তমানে কালুখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য মানিক মোল্লা। ২০১৪ সালের আগে ছিলেন কালুখালী উপজেলা যুবদল সভাপতি। অভিযোগ রয়েছে, ২০০১ সালে তিনি কালুখালী উপজেলা যুবদলের সভাপতি থাকাকালীন ১৫ আগস্ট স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীদের আয়োজিত গণভোজের খাবার নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন।

কালুখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আলীউজ্জামান চৌধুরী টিটো কালের  কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি থেকে লোক এনে আওয়ামী লীগে নেতা বানানো হচ্ছে। প্রতিবাদ করে লাভ হয়নি। উল্টো এখন আমাকেই বাদ দেওয়া হয়েছে। শুধু আমি একা নই, প্রতিবাদ করায় উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেনকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। এরপর বিএনপির এক নেতাকে দায়িত্বে বসানো হয়েছে।’

২০১৭ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন রেজাউল করিম। রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলা বিএনপির একসময়ের সহসভাপতি রেজাউল করিম বর্তমানে আওয়ামী লীগ উপজেলা কমিটির নির্বাহী সদস্য এবং নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত চেয়ারম্যান। ২০০১ সালে বালিয়াকান্দি উপজেলায় বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত্বার্ষিকীর অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করে আলোচিত হওয়া ইসলামপুর ইউনিয়ন যুবদল নেতা আহম্মদ মাস্টার বর্তমানে ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পেয়েও তিনি জিততে পারেননি। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তিনি যোগ দেন আওয়ামী লীগে।

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান হারুনার রশিদ মানিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দলে ঢালাওভাবে বিএনপি-জামায়াত থেকে লোক এনে পদ দেওয়া হচ্ছে। আমরা প্রতিবাদ করলেও এমপি তা শোনেন না। প্রতিবাদ হিসেবে আমি পদত্যাগ করেছি।’

২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগে যোগ দেন রাজশাহীর গোদাগাড়ীর কাঁকনহাট পৌর বিএনপির সভাপতি আবদুল মজিদ। বর্তমানে তিনি কাঁকনহাট পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি। একই সঙ্গে দলে যোগ দেওয়া গোদাগাড়ী উপজেলা যুবদলের সভাপতি রবিউল ইসলাম বর্তমানে গোদাগাড়ী পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

রাজশাহীর পুটিয়া উপজেলার শিলমবাড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি শুকুর মোল্লাকে করা হয়েছে ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এখনো বিএনপির কমিটি থেকে পদত্যাগ করেননি।

জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসব যোগদান ঘটেছে জেলার বর্তমান কমিটি গঠনের আগে। আশা করি বর্তমান নেতৃত্বে এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।’

নাটোরের লালপুর উপজেলার গোপালপুর পৌর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ আলম ভুইয়াকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য করা হয়েছে। একসময় তিনি ছিলেন ফজলুর রহমান পটলের প্রধান সিপাহসালার। দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ হওয়ার পর ব্যাপক সহিংস ঘটনা ঘটে লালপুরে। সেই সহিংসতা প্রতিরোধ করতে গিয়ে খুন হন কডিমসলিম ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল বাশার। ওই হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান। তাঁকে বর্তমানে লালপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য করা হয়েছে।

নাটোরের বাগাতিপাড়া থানা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলামের ছেলে উপজেলা যুবদলের সহসভাপতি লিটন ইসলামকে আওয়ামী লীগে পদ দেওয়া যায়নি কমিটির সম্মেলন আগে হয়ে যাওয়ার কারণে। ফলে লিটনকে বাগাতিপাড়া পাইলট স্কুলের প্রধান শিক্ষক করা হয়েছে। একইভাবে বাগাতিপাড়া উপজেলা বিএনপির মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সাবিহা রহমানকে দলের প্রাথমিক সদস্য পদ দিয়ে উপজেলার একটি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল করা হয়েছে।

লালপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সবুজ আহমেদ সাগর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লালপুর বাগাতিপাড়ায় আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাদের স্থান নেই। বিএনপি-জামায়াত থেকে ঢালাওভাবে লোক এনে দলে ও বিভিন্ন সমাজিক প্রতিষ্ঠানে পদ দিয়ে পুনর্বাসন করা হচ্ছে।’

দীর্ঘদিন অভ্যন্তরীণ কোন্দলে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন না হওয়ায় চারঘাটে বিএনপি থেকে যোগদানকারী জামায়াতপন্থী নেতাদের পুনর্বাসন করা হয়েছে ভিন্নভাবে। চারদলীয় জোটের সহিংস আন্দোলনের সময় একাধিক নাশকতা মামলার আসামি চারঘাট উপজেলার সুলুয়া ইউপি বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোকলেসুর রহমান বাচ্চুকে সলুয়া উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কিমিটির সভাপতি করা হয়েছে। বিএনপি নেতা বাবলুকে যোগদানের পর সলুয়া ডিগ্রি কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি, উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য ওয়াজ নবীকে নওপাড়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক করা হয়েছে। উপজেলার ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আলতাফ হোসেনকে বদিরহাট কলেজের প্রিন্সিপাল করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে চারঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য পদে কো-অপ্ট করা হয়েছে। ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেনকে বর্তমানে রায়পুর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে।

বিএনপি থেকে এভাবে ঢালাও যোগদানের বিষয়ে জানতে চাইলে চারঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘যোগদানের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে নাশকতা মামলার আসামিরাও রয়েছেন। তবে এসব আমার অজান্তে ঘটেছে। এ ধরনের যোগদান দলের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। যাঁরা যোগ দিয়েছেন তাঁদের দলের পদ দেওয়ার ব্যাপারে অপেক্ষা করা উচিত ছিল। সামাজিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দিয়েও কাউকে কাউকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।’

ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার আমুয়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি আমিরুল ইসলাম ফোরকান শিকদার আওয়ামী লীগে যোগ দেন ২০১০ সালে। তিনি আগে ছিলেন উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি। একাত্তরে কাঁঠালিয়া উপজেলা শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। তাঁর আপন ভাই নুরুল ইসলাম শিকদার বরিশাল অঞ্চলের কুখ্যাত রাজাকার।

পাটকেলঘাটা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সদস্য, জিয়াউর রহমানের ইয়ুথ কমপ্লেক্সের কাঁঠালিয়া উপজেলা প্রধান নুরুল ইসলাম নান্নু খানকে পাটকেলঘাটা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি করা হয়েছে। কাঁঠালিয়া ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম পঞ্চায়েতকে করা হয়েছে কাঁঠালিয়া উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক। কাঁঠালিয়া উপজেলা যুবদলের সহসভাপতি মিলন মাস্টার বর্তমানে উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। আমুয়া ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মুকুল সরদারকে করা হয়েছে আমুয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।

কাঁঠালিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তরুণ শিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের পোড় খাওয়া নেতাকর্মীরা দলে স্থান না পেলেও কাঁঠালিয়ায় জামায়াত ও জামায়াতপন্থী বিএনপি নেতাদের দলে ঢালাওভাবে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।’

যশোর শহর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে মেহবুব হাসান ম্যানচেলকে। তিনি ছিলেন যশোর শহর ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক।

জানতে চাইলে যশোর জেলা যুবলীগের সভাপতি মোস্তফা ফরিদ আহমেদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হ্যাঁ তিনি ছাত্রদলের নেতা ছিলেন এবং তাঁর বাবা আলমাছ মিয়াও বর্তমানে যশোর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহসভাপতি।’

পিরোজপুর জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক মনিরা সুলতানা এ্যানি ছিলেন জেলা জাসাসের দপ্তর সম্পাদক।

ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির অন্যতম সহসভাপতি হিসেবে রাখা হয়েছে বিত্তবান ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম শামীমকে। একসময় তিনি ছিলেন জামালপুর জেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি।

সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েছেন পংকি খান। একসময় ইলিয়াস আলীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত পংকি খান ছিলেন বিশ্বনাথ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন ২০০৯ সালে।

একসময় নোয়াখালী জেলা কৃষক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন আবদুল মমিন বিএসসি। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন সুন্দরপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি। বর্তমানে তিনি নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

জয়পুরহাট জেলাজুড়ে একটি পরিচিত নাম বেদারুল ইসলাম বেদীন। একসময় বহু মামলার আসামি বেদীন পালিয়ে ছিলেন ভারতে। ক্ষমতাসীন দলে যোগদানের পর হিমাগারে চলে যায় তাঁর মামলাগুলো। জয়পুরহাটে বেদীনের পরিচিতি যুদ্ধাপরাধ মামলায় দণ্ডিত আবদুল আলীমের দেহরক্ষী হিসেবে। বর্তমানে ক্ষমতার আশীর্বাদে বেদীন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি ও জেলা মোটর মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। বেদারুল ইসলাম বেদীনের দলে যোগদানের বিষয়টি স্বীকার করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুল আলম দুদু।

খুলনার মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুরের লাঠিয়াল রাজাকার বিশ্বাস পরিবারের সন্তান সিদ্দিকুর রহমান বুলু বিশ্বাস বর্তমানে খুলনার সোনাডাঙ্গা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মহানগরীর ঠিকাদারি বাণিজ্য।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহীর পুটিয়া-দুর্গাপুর আসনের এমপি আবদুল ওয়াদুদ দারা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ রকম ছিটেফোঁটা দু-একটি ঘটনা আছে, যাঁরা অনেক আগে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। তবে আমি এমন যোগদানের বিরোধী।’

জয়পুরহাট-১ আসনের এমপি শামসুল আলম দুদু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জামায়াতের একজন নেতার যোগদানের বিষয়ে গণমাধ্যমে আমার নাম বিভিন্ন সময় এসেছে। আসলে বাস্তবতা হলো, সেদিনের অনুষ্ঠানে ভিন্ন কথা বলে আমাকে ডেকে নিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়। দলীয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কোন্দলের শিকার আমি।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের লোকদের আওয়ামী লীগে আনার ঘোর বিরোধী আমি। আমি মনে করি অনুপ্রবেশ আমাদের জন্য ক্ষতিকারক।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগে পদ-পদবি পাওয়ার কিছু ঘটনা আমাদের গোচরে এসেছে। অচিরেই আমরা শুদ্ধি অভিযানে নামব।’

সুত্রঃ কালেরকন্ঠ

শেয়ার করুন
  • 8
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here